ঢাকাশুক্রবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হাজার বছরের বাংলা নাটক ও নাট্যতত্ত্ব

আবু সাঈদ তুলু
জানুয়ারি ১৬, ২০২১ ১:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলা নাটকের ইতিহাস হাজার বছরের পুরানো। প্রাচীন ভরত নাট্যশাস্ত্রে উল্লেখিত ‘ওড্রমাগধী’ আঞ্চলিক রীতি হিসেবে বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলের নাট্য প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধন সংগীত ‘চর্যাপদ’ এর মধ্যেও বাংলা নাটকের উপাদান লক্ষণীয়। চর্যাপদে ১৭ সংখ্যক চর্যায় উল্লেখ আছে- ‘নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী/ বুদ্ধনাটক বিসমা হোই।’ অর্থাৎ বজ্রধর নৃত্যপর এবং দেবী সঙ্গীত পরিবেশন করছেন। বুদ্ধনাটকের পরিবেশনা এ জন্য কষ্টসাধ্য। বাংলা নাট্যতাত্ত্বিক সেলিম আল দীন এ ‘বুদ্ধনাটক’ তথ্য থেকে প্রমাণ করেন, এ চর্যাপদকালীন বাঙালি জীবনে নাট্য অস্তিত্ব বিরাজমান ছিল। প্রচলিত ‘থিয়েটার’ শব্দ তখন আমাদের বাঙালি জীবনে প্রচলিত ছিল না। আমাদের নাট্যচিন্তা ছিল ভিন্নরূপ পরিবেশন কেন্দ্রিক। ‘থিয়েটার’ শব্দটি উপনিবেশকালীন আমাদের শব্দভাণ্ডারে যোগ হয়েছে।

বাংলা সাহিত্য-শিল্পের মধ্যযুগ অধ্যায়ে ‘সেখ শুভোদয়া’ ‘শূন্যপুরাণ’ ‘গীতগোবিন্দম’ প্রভৃতি ছিল নাট্যমূলক পরিবেশনা। সেলিম আল দীন মনে করেন- বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগে আসর-দর্শক-গায়েন-দোহার অধ্যুষিত আখ্যান মাত্রই নাট্যরূপে বিবেচ্য। মধ্যযুগের রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতি পাঁচালির আঙ্গিকে পরিবেশিত।

এ মধ্যযুগের পাঁচালি আঙ্গিকে অধূনা থিয়েটার উপাদানের সমস্তই লক্ষণীয়। এছাড়াও সে সময়ের শ্রী কৃষ্ণ বিজয়, কৃষ্ণ মঙ্গল, শ্রী চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত প্রভৃতিও নাট্যমূলক পরিবেশনা। মঙ্গল কাব্য, চৈতন্য ধারা ছাড়াও প্রণয়মূলক ও পীরমাহাত্ম পাঁচালি নাট্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

তার মধ্যে- ইউসুফ জোলেখা, বিদ্যাসুন্দর, লাইলী মজনু, পদ্মাবতী, খোয়াজখিজিরের জারি, মাদারপীরের জারি উল্লেখযোগ্য। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকেও সমস্ত বৃহৎ বঙ্গে নানা ধরনের নাট্য পরিবেশনা আঙ্গিক ও রীতি বিদ্যমান ছিল। সে সময়ের মহুয়া, মলুয়া, কাঞ্চন কন্যা, দেওয়ানা মদিনা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দিতে সমস্ত বঙ্গে ‘যাত্রা’ নাট্যাঙ্গিকের অসম্ভব জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। বাংলা সংস্কৃতির মধ্যযুগে সাহিত্য-শিল্পের উপস্থাপনে পাঁচালি, কীর্তন, কথকতা, জারি, লীলা, হাস্তর প্রভৃতি রীতি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।

বাঙলায় ইউরোপীয় রীতির নাট্যচর্চা শুরু হয় ১৭৯৫ সালে লেবেদেফের ‘ডিসগাইজ’ ও ‘লাভ ইস দ্যা বেস্ট ডক্টর’ নাটক অনুবাদ ও মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। ১৮৩১ সালে হিন্দু থিয়েটার, ১৮৩৫ সালে শ্যামবাজারে বিলাতি থিয়েটার চর্চা, নবীন চন্দ্র বসু, নন্দ কুমার, রামনারায়ণ তর্করত্ব, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখসহ নানা প্রচেষ্টায় আধুনিকতার নিরীখে ইউরোপীয় ধারার নাট্যচর্চা বেগমান হয় এদেশে। দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশারফ হোসেন, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজন ভট্টাচার্য, তুলসী লাহিড়ী, উৎপল দত্ত প্রভৃতি জনের মধ্য দিয়ে নানা মাত্রায় বিকশিত হয়।

বর্তমান বাংলাদেশে হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে গ্রাম পর্যায়ে নানা আঙ্গিকে ‘পালা’ ‘জারি’ ‘যাত্রা’ ‘কীর্তন’ প্রভৃতি আঙ্গিকের নাট্যগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে। শহর পর্যায়েও ঐতিহ্যকে বহন করে নাট্য চর্চা বেগবান। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হচ্ছে- ঢাকা থিয়েটারের ‘বন পাংশুল’ ‘ধাবমান’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কমলারানীর সাগরদিঘি’ ‘বেহুলার ভাসান’ ‘শাজাহান’ ‘সং ভং চং’ নাট্যকেন্দ্রের ‘আরজচরিতামৃত’ দেশ নাটকের ‘নিত্যপুরাণ’ পদাতিকের ‘বিষাদ সিন্ধু’ মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ‘নিশিমন বিসর্জন’ পালাকারের ‘নারীগণ’ বটতলার ‘খনা’, স্বপ্নদলের ‘চিত্রাঙ্গদা’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মহররমের জারি’ ‘তোতাকাহিনি’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পদ্মাবতী’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উত্তর খনা’ লোকনাট্যদলের ‘লীলাবতী আখ্যান’ সুবচন নাট্য সংসদের ‘মহাজনের নাও’ কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’, আরণ্যকের ‘রাঢাঙ’ সিএটির ‘ভেলুয়া’ প্রভৃতি। এ ধারায় প্রায় শতাধিক নাট্য প্রযোজনা গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশে মঞ্চে সবচেয়ে আলোচিত ও দর্শক প্রিয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় লুপ্ত হওয়া নাট্য ইতিহাস ও বাঙলা নাট্যতত্ত্বকে সেলিম আল দীনই সম্ভবত প্রথম তুলে ধরেন। সেলিম আল দীন বলেন, ‘বাঙলা নাটকের প্রাচীন ও মধ্য যুগে নাটক কথাটি প্রায় দুর্লভ। বুদ্ধ নাটককে নাটক বলা হলেও তা নৃত্য গীতেরই আঙ্গিক। আমাদের নাটক পাশ্চাত্যের মতো ন্যারেটিভ’ ও রিচুয়্যাল থেকে পৃথকীকৃত সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয়। তা গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে।’ (মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-০৪)

সেলিম আল দীন তার ‘নাট্যকোষ’ গ্রন্থে মধ্য যুগের বাঙলা নাট্য সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি প্রামাণ দেখান যে, বাঙলার নাট্য প্রাচীন ও মধ্যযুগে সংস্কৃত বা পাশ্চাত্য নাট্যের মতো কোন শাস্ত্রসূত্রের অধীনে গড়ে উঠে নাই। নাট্য ও নাট্যমূলক গীতনৃত্য, কথাকৃত্য ও হাবভাবের মধ্য দিয়ে আখ্যান ও পরিবেশনায় দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পরীতি রূপে এর উদ্ভব, ব্যাপ্তি ও বিস্তার। (বাঙলা নাট্যকোষ, ভূমিকা অংশ)

হাজার বছরের বাংলা নাটক বর্ণনা ও উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে হাজার বছরের বাঙালির জারিত রসের ধারায় অদ্বৈত শিল্পবন্ধনে উপস্থাপিত। এখানে গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক সবই একীভূত। এ নাটকগুলো বর্ণনা প্রাধান্য দিয়ে রচিত, উপস্থাপিত বলে বর্ণনাত্মক বাঙলা নাট্যরীতি নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। বাঙলা নাট্যকোষ গ্রন্থে সেলিম আল দীন সংজ্ঞায় এ নাট্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন, ‘বর্ণনা ও উক্তি-প্রত্যুক্তি প্রাধ্যান্যে মধ্যযুগের পাঁচালি ও কথকতা ধারায় আধুনিক কালের উপন্যাস বা কথা সাহিত্যের ধাঁচে রচিত নাট্যই বর্ণনাত্মক নাট্য। আবহমান বাংলার অভিনয় রীতিও বর্ণনা ও উক্তি-প্রত্যুক্তির অদ্বৈত মিলনে অভিনয় ক্রিয়ার বর্ণনাত্মক অভিনয় বৈশিষ্ট্য। পাশ্চাত্য নাট্যরীতি সংলাপ নির্ভর কিংবা বাঙলার নাট্যরীতি বর্ণনা বা ব্যাখ্যা নির্ভর।

সেলিম আল দীন গবেষণায় প্রমাণ করেন যে, হাজার বছরের বাঙলা নাটক বৈশিষ্ট্যে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’। শিল্পের সব মাধ্যমগুলো এখানে একীভূত। বাঙালি জাতির মহাজাগরণকারী শ্রী চৈতন্য দেবের ‘অচিন্ত্যদ্বৈতবাদ’ ধর্মচেতনার নিরিখে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামক শিল্পচেতনার উদ্ধার এবং তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলা পরিবেশনা শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্য হলো: দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অর্থাৎ একের মধ্যে বহুত্বের অবস্থান। একই আঙ্গিকের শিল্পের মধ্যে বহুবিধ আঙ্গিকের শিল্পের সমন্বয়। পাশ্চাত্যের মতো সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয় বাঙলার শিল্প।

আবহমান কাল ধরেই বাঙালি জাতির সংস্কৃতিতে নাট্য উপাদান সমৃদ্ধ হাজারো পরিবেশনা শিল্প পর্যবেক্ষণ করলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট্য, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান- এসব পরিবেশনায় শিল্পের সব মাধ্যমই একে লুপ্ত। এ পরিবেশনাগুলোতে বর্ণনা, নৃত্য, গীত ও অভিনয়ে অদ্বৈত। পাশ্চাত্যের মতো চরিত্রাভিনয়ে নয়। এ একের মধ্যে বহুত্বের বৈশিষ্ট্যই আমাদের শিল্প বৈশিষ্ট্য।

পাশ্চত্যের প্রসেনিয়াম পরিবেশনা পদ্ধতির বিপরীতে বাঙলার পরিবেশনা রীতি ছিল আসর কেন্দ্রিক। এখনো গ্রাম বাংলায় আসর কেন্দ্রিক নাট্য উপস্থাপন হতে দেখা যায়। কখনো কৃত্রিম মঞ্চ বা প্যান্ডেল বানিয়ে উপস্থাপন হয়। হাজার বছরের বাংলায় নাট্য উপস্থাপনে চার দিকে দর্শক বেষ্টিত মধ্যমঞ্চে নাট্যক্রিয়া সংঘটিত হতো।

পরিশেষে বলা যায়, বাঙলা নাট্য মূলত বাংলা ভাষা-ভাষীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে। বাঙলা নাট্যের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। কিন্তু ঔপনিবেশিক শিল্প-সাহিত্যতত্ত্ব বাঙালিকে স্বকীয় না রেখে পাশ্চাত্যমুখী করে রেখেছে। উপনিবেশ জ্ঞানতত্ত্ব প্রত্যাখ্যাত হয়ে বাঙলার নিজস্ব জ্ঞানতত্ত্ব ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটুক। হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের পুনঃর্জাগরণে বাংলার নিজস্ব শিল্প সংস্কৃতি পরিপুষ্ট হয়ে উঠুক। আত্মমর্যাদাবোধ ও নিজস্বতার পরিচয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববুকে মাথা উঁচু করে বলিষ্ঠতার আসন গ্রহণ করুক- এটা আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: কবি, গবেষক ও শিক্ষাবিদ

Facebook Comments Box