ঢাকামঙ্গলবার, ৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা স্বাধীনতা প্রেমী মানুষগুলো তার অপেক্ষায় থাকব

নুরুন্নবী নুর
জানুয়ারি ৩০, ২০২১ ২:৩৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জহির রায়হান আজকের (৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২) দিনে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। কোনভাবেই আমি মানুষটা ভাবতে পারি না, জহির রায়হান আমাদের মাঝে নেই! জহির রায়হানকে চিনি, তার কালজয়ী সাহিত্যকর্ম আমাদের বেড়ে উঠার সময়ে পাঠ্য উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ দিয়ে। সে হিসেবে শুরুর দিকে জহির রায়হান আমার কাছে ‘চলচ্চিত্র নির্মাতা’ হিসেবে নয়, একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে অধিক পরিচিত।

‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসটি পড়ার পাশাপাশি, সেটি যখন টিভির পর্দায়ও দেখতে পাচ্ছি, তখন মানুষটাকে নিয়ে আরও কৌতূহল বেড়ে গেল। আস্তে আস্তে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম, তখন ভদ্রলোকটি সম্পর্কে জানার আগ্রহটা একটু একটু করে বাড়তে লাগল। সত্য কথা বলতে কি, কলেজে তেমন সাহিত্য পাঠ হতো না। শুধু বিদ্যায়তনিক সিলেবাসটি গলধকরণ করেছি বেশি।

তবে কলেজ জীবনে জহির রায়হানের অনন্য সৃষ্টি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত ‘একুশের গল্প’টি যখন পড়লাম, তখন তাঁর প্রতি ভক্তিটি আরেকটু বেড়ে গেল। সে সময় গল্পটি অনেকবার পড়েছি। গল্পটির অন্যতম চরিত্র রেণু ও তপুর কথা এখনও মনে পড়ে। মনে পড়ে, তারা দু’জন যখন একাকী পথে হাঁটছিল, সে সময়ের একটি উক্তি ছিল বোধহয় এমন, ‘অনন্তকাল ধরে যদি এমনি চলতে পারতাম আমরা’।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়লাম, তার প্রথম উপন্যাস, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’। উপন্যাসটি নিয়ে বর্তমান মিডিয়া পাড়ায়ও বেশ কাজ হচ্ছে। আমার জানামতে, হাসান রেজাউল নামের একজন টিভি নাটক নির্মাতা, ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ নাম ভূমিকায় একটি টেলিফিল্ম বানিয়েছেন।

এছাড়াও তার বেশ কিছু চলচ্চিত্র দেখার পাশাপাশি, চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে লেখার সুযোগও হয়েছে। তার মধ্যে দেখা ও লেখা বিষয়ক চলচ্চিত্রগুলো হলো- ‘কখনো আসেনি’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘সঙ্গম’ ও ‘জীবন থেকে নেয়া’ অন্যতম। অন্যদিকে ‘হাজার বছর ধরে’ সিনেমাটি দেখা হলেও সেটা সম্পর্কে লিখিনি কখনো। সুতরাং সহজে বলতে পারি, জহির রায়হান কৈশোরের দিকে আমার কাছে একজন সাহিত্যের মানুষ হিসেবে আবিস্কৃত হলেও বর্তমান যৌবনে আমার কাছে তিনি হারিয়ে ফেলা চলচ্চিত্রশিল্পের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র ও পুরোধা ব্যক্তিত্বও বটে।

আজ ৩০ জানুয়ারি, তাকে হারানোর দিন। মৃত্যবরণ করেননি, শুধু অদৃশ্য হয়েছিলেন। তার জীবন ও কর্ম, একজন থিয়েটার শিল্পী হিসেবে আমাকে এমনভাবে আকৃষ্ট করেছে যে, কোন দিনই ব্যক্তিটিকে মৃত বলে ভাবতে পারব না। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা স্বাধীনতা প্রেমী মানুষগুলো, তার অপেক্ষায় থাকব। জহির রায়হান আমাদের মতো শিল্পমনা মানুষদের হৃদয়ে খোদাই করা ভাস্কর্যের মতোন গেঁথে থাকবেন। তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, সেখানে ভালো থাকুন, সৃষ্টিকর্তার কাছে এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করি।

পুনশ্চ- জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন এবং তার নিখোজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন, যিনি স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানি আর্মির এদেশীয় দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। জহির রায়হান ভাইয়ের সন্ধানে মিরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেন নি। ১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারির পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। মিরপুর ছিল ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন কথা প্রচলিত আছে যে, সে দিন বিহারীরা ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box