মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০১:১৩ পূর্বাহ্ন

সুবর্ণ-রেখা’: কাহিনীর মোড়ে মোড়ে অন্তর্নিহিত দাবার চাল

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩৫০ Time View

‘সুবর্ণ-রেখা’ ঋত্বিক ঘটকের সাতচল্লিশের দেশভাগ নিয়ে নির্মিত ত্রয়ীর শেষ সিনেমা।চলচ্চিত্রের মহাপরিচালকের ট্রিলজী খ্যাত সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমলগান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণ-রেখা (১৯৬২) অন্যতম।

ত্রয়ীর মাধ্যমে কলকাতার তৎকালীন অবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। সমালোচনা এবং বিশেষ করে কোমল গান্ধার এবং ‘সুবর্ণ-রেখা’র ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণে এই দশকে আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

আলোচ্য ‘সুবর্ণ-রেখা’ সে সময়ের বাংলার উদ্ভাস্তু মানুষের জীবনের নির্মম প্রতিচ্ছবি তুলে আনার গল্প হলেও, কাহিনীর মোড়ে মোড়ে অন্তর্নিহিত একটা দাবার চাল অর্থাৎ রাজনীতি বিরাজমান যে ছিলো, তা সাধারণ মানুষের কাছে অদৃশ্য থাকেনি। চলচ্চিত্রটি ১৯৬২ সালে নির্মাণ হলেও ১৯৬৫ সালে মুক্তি দেয়া হয়।

কাহিনী সংক্ষেপ: ‘১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলো। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজের দেশ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে অনিশ্চিতে। সে সব উদ্বাস্তুর একটাই চিন্তা ছিলো-নিজস্ব আশ্রয় খুঁজে পাওয়া। সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, কলোনিতে আশ্রয় নিচ্ছে উদ্বাস্তু মানুষেরা আর সেটা দখল রাখার জন্য রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে অনেকেই। অনেকেই আবার কলোনি থেকেই ভালো আশ্রয়ের খোঁজে।

ঈশ্বর নামে এক চরিত্র যিনি চাকরি নিয়ে একটা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। অবশেষে পেয়ে যান। বন্ধু হর প্রসাদ ভর্ৎসনা করে তাকে, কিন্তু সে পিছু ফেরে না। ঘরহীন জীবনের যন্ত্রণা যেন তার ছোট বোনের, সীতার জীবনকে অনিশ্চয়তার করে না দেয়, তাই সে কলোনি ছেড়ে চলে গিয়েছে। এই চলচ্চিত্রে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা খুঁজেছে সবাই; কিন্তু একে একে সবাই ব্যর্থ হয়েছে।’

‘সুবর্ণ-রেখা’ চলচ্চিত্রটি দেখার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে একটি পোস্ট করেছিলাম, সেটি হল: ‘চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণ-রেখা’ চলচ্চিত্রটা দেখলাম। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় সত্যিই অসাধারণ। সত্যজিতের সিনেমাতেও দেখেছি, আজ ঋত্বিকের সিনেমাতে দেখলাম। বিজন ভট্টাচার্য একজন কমেডি ধাঁচের অভিনেতা হলেও, তবে কমেডিয়ান না, কিন্তু চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে থাকেন। সুবর্ণ-রেখাতেও অসামান্য অভিনয়, মনে রাখার মতো। তার রচিত ‘নবান্ন’ নাটক পড়ার মাধ্যমে ভদ্রলোককে কিঞ্চিৎ জানাশোনা। এতো ভালো অভিনয় করে জানতাম না। রীতিমত আদর্শিক চরিত্র। মাধবী-বিজন-সুপ্রিয়া দেবীদের মতো চরিত্রগুলো সত্যই কালজয়ী। যতই দেখি, স্বাদ মিটে না।ভারতীয় চলচ্চিত্রে এদের ঘাটতি কখনোই পূরণযোগ্য নয়। মাঝে-মাঝে অনেক মূল্যবান মানুষদের হারিয়েছি মনে হয়। সত্যজিৎ ও ঋত্বিকের চলচ্চিত্রগুলো দেখার সুবাদে গুণী ব্যক্তিগুলোর সাথে পরিচয়। উনাদের অনুপস্থিতি, ভাবতেই শুন্যতা কাজ করে। চরিত্রগুলোকে প্রচন্ডরকম ভালবেসে ফেলেছি। কখনও ভুলতে পারব না।’

১২২ মিনিটের ঋত্বিক ঘটক ও রাধেশ্বম জন্থুনওয়ালার গল্প অবলম্বনে ‘সুবর্ণরেখা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন- অভি ভট্টাচার্য্য-ঈশ্বর চক্রবর্তী, ইন্দ্রানী চক্রবর্তী-ছোট সীতা, মাতের তরুণ-ছোট অভি, গীতা দে-কৌশল্যা (বাগদী বউ), বিজন ভট্টাচার্য-হর প্রসাদ, অবনীশ বন্দোপাধ্যায়-হরি বাবু, রনেন রায়চৌধুরী-বাউল, রাধা গোবিন্দ ঘোষ-ম্যানেজার, ঋত্বিক ঘটক-মিউজিক টিচার, মাধবী মুখোপাধ্যায়- সীতা, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য্য-অভিরাম, জহর রায়-মুখার্জী (ফোরম্যান), উমানাথ ভট্টাচার্য্য-আখিল বাবু, সীতা মুখোপাধ্যায়-কাজল দিদি, পীতম্বর-রাম বিলাস এবং অন্যান্য।

সিনেমাটোগ্রাফার বা চিত্রগ্রাহক-দিলীপ রাজন মুখার্জী, সম্পাদনায়-রমেশ যোগী, শব্দে-সত্যেন চট্টোপাধ্যায়, শিল্প নির্দেশনায়-রবি চট্টোপাধ্যায়, সুরকার বা সংগীতে- ওস্তাদ বাহাদুর খানসহ বিভিন্নজন কারিগরি সহায়তায় থেকে সাহায্য করেছেন।

সর্বশেষ, ‘সুবর্ণ-রেখা’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক।

Share This Post

আরও পড়ুন