ঢাকাশনিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সভ্যতায় অস্তিত্বের লড়াইয়ে মানুষ

তৌহিদুল ইসলাম
মে ১৯, ২০২১ ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

তৌহিদুল ইসলাম: বিদগ্ধ পৃথিবীর এক কোণে বসে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার আদিমসত্ত্বায় মগ্ন সৃষ্টির প্রথম মানব আর আমাদের ভাবনার মাঝে খুব একটা তফাৎ নেই। প্রজন্মান্তরবাদের নিয়মে সভ্যতায় বসবাসকারী প্রত্যেকটি মানুষ নাটাই ছাড়া ঘুড়ির মত পতপত করে উড়ে চলেছে মুক্ত আকাশে।

মানুষ পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত যতগুলো সভ্যতা সৃষ্টি করেছে, সবগুলোই একটির পর একটি বিলুপ্ত হয়েছে। পৃথিবীতে সে সবের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রয়ে গিয়েছে শুধুমাত্র কিছু ধ্বংসাবশেষ। তবে কি যুগে যুগে মানুষ আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছি? এ একটি প্রশ্নের উওর খুঁজতে গেলে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতাগুলোর বিলুপ্তির কারণকেও অনুসন্ধান করতে হবে আমাদের।

সভ্যতার বিকাশে প্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক সভ্য সমাজে পা রেখেছি আমরা। বেশভূষায় ফ্যাশনের ছোঁয়া লেগেছে। কখন কিভাবে সভ্যতার কাটাকুটি খেলার জালে নিজেরাই নিজেদের আবদ্ধ করেছি, বইয়ের প্রতিটি পাতায় লেখা ইতিহাস তার নীরব সাক্ষী।

খুব সহজ করে বললে এমনটা বলা যায়- সভ্যতাকে আমরা নিজেরাই বিলুপ্তপ্রায় ঘোষণা করেছি নিজেদের স্বার্থে, নতুনত্বের স্বাদ গ্রহণের তীব্র বাসনায়। তবুও সামাজিকীকরণ সূত্রের ভাগশেষে ভগ্নাংশের অবসান ঘটাতে পারিনি। মানুষ হিসেবে এর দায় আমাদের উপরেই বর্তায় বৈকি!

আমরা সভ্যতা বানিয়েছি আধুনিকীকরণ কামনার প্রতিফলনস্বরুপ। যখন যেভাবে প্রয়োজন সেটিকে রঙের প্রলেপনীয় তুলিতে রাঙিয়ে তুলেছি। সভ্যতার নতুন ইমারত নির্মাণ করেছি। কিন্তু ভুল করেও পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে থাকার বাসনাকে লালন করিনি। সাজানো সভ্যতায় আমাদের বাসনা এক সময় পূর্ণতালাভ করেছে; ধীরে ধীরে সেই রঙের প্রলেপও এক দিন ফিকে হয়ে গিয়েছে।

আসলে সভ্যতাগুলোর বিলুপ্তির পিছনে রয়েছে মানবের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। নিজেদের অস্তিত্বকে বিকেন্দ্রীকরণ করার আদিম প্রবৃত্তি আমাদেরকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই সভ্যতায় বিচরণ করিয়েছে। এর পরে আবারো নতুন সভ্য সমাজ সাজিয়েছি যুগের আবর্তে নিজেদের মনোমত করে।

ঠিক এ জায়গাতেই আমরা আমাদের আদিমসত্ত্বাগুলোকে দমন করতে পারিনি বা করতে চাইনি। সভ্যতার ভাঙ্গাগড়ার অমোঘ খেলায় মেতে আছি সকলেই। আর এভাবেই নিজেদেরকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা নিজেদের পরিচয় করিয়েছি সভ্যতা বিকাশের ধারক হিসেবে।

সভ্যতা বিকাশের ধারায় প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিপথকে সচল রাখার ব্যত্যয়ে সেই ক্ষমতা হয়তো আমাদের দেননি। এক দিন বর্তমান সভ্যতাও ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদেরই কারণে। নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ আমরা আবারো গড়ে তুলব নতুন সভ্যতা।

ধরিত্রীর বুকে প্রথম পদধূলি দেয়া সেই আদিম মানুষটির নিজের অস্তিত্বের টিকে থাকার লড়াইয়ের মতই কামনাবাসনার এ খেলাই সব সভ্যতায় আমাদের অস্তিত্বকেও টিকিয়ে রেখেছে আদিঅন্ত। সভ্যতার বিকাশে আমরা আমাদের আদিম রিপুকে দমন করতে শিখতে পারিনি। পূর্বেও কেউ পারেনি আগত ভবিষ্যতেও কেউ পারবে না। কারণ যে দিন মানুষের আদিম প্রবৃত্তি বন্ধ হয়ে যাবে, সে দিনই সভ্যতার বিকাশও স্তব্ধ হয়ে যাবে। প্রকৃতি এ শক্তি আমাদের দেননি।

আর এ কারণেই নিত্য নতুন সভ্যরা এলেও সৃষ্টির প্রথম মানুষের থেকে যুগ যুগান্তরে আমাদের অস্তিত্ব এখনো সেই আদিম যুগের মতই টিকে আছে আর থাকবে। এ একটি জায়গায় আমরা আধুনিক হতে পারব না কখনো। দেহের ক্ষুদ্র আকারের মধ্যে, দেশ-কাল-পাত্রের নির্দিষ্টতার দ্বারা চিহ্নিত হয়ে যে মানবাত্মা বাস করে, মৃত্যুর পরে তা অনন্ত জীবনের মধ্যে মিশে গিয়ে অনন্ত কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রাখে। এ বিশ্বাস থেকেই আমরা নতুন সভ্যতায় নতুন করে নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছি সব সময়।

এ পৃথিবীর খন্ড, ক্ষণিক জীবনে কোন পরিপূর্ণতা নেই, কোন স্বার্থকতা নেই। মৃত্যু জীবনকে অখন্ড করে, ক্ষণিক জীবনকে অনন্ত করে এবং প্রকৃত সস্বার্থকতা দান করে। খন্ডিত জীবনে নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্তপ্রায় হবার আগেই আমরা নিজেকে আবারো প্রকাশ করতে চেয়েছি নতুন করে। শুধুমাত্র এ একটি কারণেই শত জর্জরিত আঘাত সহ্য করেও আমরা পুরনো সভ্যতাকে ভেঙ্গে নতুন সভ্যতা গড়ছি। পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত এর সমাপ্তি নেই। সভ্যতা বিকাশের ধারাবাহিকতা এভাবে চলতেই থাকবে।

ইসরাইল এবং প্যালেস্টাইন যুদ্ধের দামামা বন্ধ হোক। সভ্যতায় নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে গিয়ে পৃথিবী থেকে সভ্যরা ধ্বংস হয়ে যাক এটি আমরা চাই না। অস্তিত্বের এ লড়াইয়ে আবহমান সভ্যতা বিকশিত হোক শান্তির বার্তা নিয়ে।

লেখক: স্বাস্থ্য কর্মী ও কলাম লেখক

Facebook Comments Box