মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:২৬ পূর্বাহ্ন

শুধু একটি জীবনী গ্রন্থই নয়, এটি একটি জাতি, একটি ভূখণ্ডের ভূমিষ্ঠ হওয়ার দলিল

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০
  • ২৪৫ Time View

নুরুন্নবী নুর: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু একটি জীবনী গ্রন্থই নয়, এটি একটি জাতি, একটি ভূখণ্ডের ভূমিষ্ঠ হওয়ার দলিল। পৃথিবীর খুব অল্প দেশই আছে, যারা শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে নিজের দেশকে বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলেছে। যে সমস্ত দেশ বহির্শত্রুর কবজা থেকে নিজের মা, মাটি ও দেশকে রক্ষা করতে পেরেছে, সে সমস্ত দেশের পিছনে সিংহের মতো আবির্ভূত হয়েছেন কিছু নেতার। যাঁদের দুঃসাহসিক নেতৃত্বের ফলে মাতৃভূমি রক্ষা পেয়েছে।

পাশ্চাত্য দেশের সংগ্রাম ও অবদানে নিজ নিজ জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে মানুষের মধ্যে আছেন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন মেন্ডেলা, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো প্রমুখ নেতা। তন্মধ্যে আছে বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসের বরপুত্র হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁর জীবনাদর্শে আমরা নতুন প্রজন্ম সংগ্রামী চেতনা ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় পাই।

জাতির পিতার জীবনের চরম বাস্তবতা তুলে ধরতে, তিনি নিজেই কিছু লেখা লিখে গিয়েছিলেন, যা পাণ্ডুলিপি আকারে পরবর্তী পাওয়া যায়। বর্তমানে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুইটি তারই সাক্ষ্য বহন করে। তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে খুব সুন্দর করে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবন সুচারুরূপে তুলে ধরেছেন। ব্যক্তি জীবনে কার কার সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং রাজনীতিতে কার কার সাহচর্যে ছিলেন এবং সব প্রকার হাসি- কান্না, দুঃখ-সুখের কথা বলেছেন।

এছাড়াও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আত্মজীবনী লেখার প্রেক্ষাপট, লেখকের বংশ পরিচয়, জন্ম, শৈশব, স্কুল ও কলেজের শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, কলকাতাকেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ এবং এ সব বিষয়ে লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। আছে লেখকের কারাজীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সর্বোপরি সর্বংসহা সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসার কথা, যিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সকল দুঃসময়ে অবিচল পাশে ছিলেন। একই সঙ্গে লেখকের চীন, ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের বর্ণনাও বইটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি পড়তে পড়তে অনেকগুলো বাস্তব সত্য ও কিছু নিঁখুত নেতার পরিচয় পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শহীদ সাহেবের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। শহীদ সাহেবের কোন প্রকার অবমাননা বা অসম্মান সহ্য করতে পারতেন না বঙ্গবন্ধু। শেষে এসে একটু ভুল বুঝাবুঝি হলেও রাজনীতির মাঠে আবার একত্রিত হয়েছিলেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু রাজনীতির মাঠে ছিলেন একজন ট্র্যাজিক নায়কের মতো। সবকিছু ইতিবাচক অর্থে দেখলেও কারাগার নামক বন্দীশালার কারণে সে সময়ের রাজনীতির কর্তাব্যক্তি থেকে দূরে থাকতে হয়েছে, যা তাঁকে খুব পীড়া দিত।

তিনি চাইতেন, সবাই মিলেমিশে থাকুক। কোন প্রকার দ্বন্দ্বমূলক কাজ পছন্দ করতেন না। তিনি খুব অল্প সময়ে কুখ্যাত ও স্বার্থবাদী মানুষকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। ক্ষমতার লোভে জনপ্রিয় নেতারাও যে প্রভুভক্ত কুকুরের মতো আচরণ করতে পারে, তিনি তা নিজ চোখে অবলোকন করেছেন। জাতির পিতার আত্মজীবনী না পড়লে, আমি হয়তো বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের ইতিহাস সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জানতামই না। কিছু মনগড়া ইতিহাস আমাদের চক্ষুযুগলকে চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছে।

একটা দেশ সম্পর্কে জানতে হলে, সে দেশ প্রতিষ্ঠার পিছনের ইতিহাস অবশ্যই জানতে হবে। জানতে হবে ক্ষমতায় থাকা মানুষগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো। বিচার বিশ্লেষণ করে বের করে আনতে হবে প্রকৃত দেশপ্রেমিককে। সে জন্য পড়তে হবে তাঁদের সৃষ্টিকে, জানতে হবে অভিজ্ঞতা অর্জনকারীদের, তাহলেই প্রকৃত ইতিহাস জানা হবে, তা নাহলে ভুল ব্যক্তিদেরকে ভুল উপাধি দিয়ে ভুলের উপর থেকে যেতে হবে।

কিছু কথা: ‘অসামাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি যদি ষষ্ঠ-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তকরূপে গৃহীত হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম জাতির পিতা সম্পর্কে অনেক বেশি অবগত হতে পারবে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পিছনে বঙ্গবন্ধু অবদানকে স্বীকৃতি দিতে চাইলে এধরনের উদ্যোগ, খুবই কার্যকর হবে বলে মনে করি। তাছাড়া গ্রন্থটির লাইব্রেরি মূল্য অনেক বেশি, যার কারণে শিক্ষার্থীরা বা সাধারণ পাঠকরা চাইলে পড়তে পারে না। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি লাইব্রেরিতে পাওয়া গেলে, বঙ্গবন্ধুকে জানতে আগ্রহী মানুষের কিছুটা হলেও উপকার হবে।

২০১২ সালে জুন মাসে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড প্রকাশিত ৩৩০ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক রচিত গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, প্রচ্ছদে ছিলেন সমর মজুমদার, গ্রন্থস্বত্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ২০১২, ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং সম্পাদনায় শামনুজ্জামান খান।

Share This Post

আরও পড়ুন