ঢাকাশনিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিল্পের কদর বুঝতে নবীন শিল্পীর সহায়ক তারেক মাসুদের তথ্যচিত্র ‘আদম সুরত’

নুরুন্নবী নুর
মে ৬, ২০২১ ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নুরুন্নবী নুর: প্রয়াত গুণী নির্মাতা তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘আদম সুরত’ মূলত চিত্রশিল্পী বাংলাদেশী প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত তথ্যচিত্র। ১৯৮২-৮৯ সাল, দীর্ঘ সাত বছর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নির্মাতা তথ্যচিত্রটি বানাতে সক্ষম হোন। এটি ছিল তারেক মাসুদ নির্মিত প্রথম তথ্যচিত্র।

তথ্যচিত্রে সুলতানের দৈনন্দিন কর্ম ও শিল্পজীবন চিত্রায়নের পাশাপাশি বাংলার সংস্কৃতি এবং কৃষি চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে শিল্পসম্মতভাবে, যা একজন নবীন শিল্পীকে শিল্পের কদর বুঝতে সহায়ক বলে বিবেচিত হবে। মূলত শিল্পী এসএম সুলতান বিষয়ক ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য সুলতানের সাধনা’ নামক আহমদ ছফা রচিত লেখাটি ১৯৮২ সালে তারেক মাসুদকে এ তথ্যচিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে।

প্রাথমিক অবস্থায় শিল্পী এসএম সুলতান স্বভাববশত গণমাধ্যম বা ক্যামেরার সামনে আসতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বরং নিমিত্ত, আমাকে উপলক্ষ করে আপনারা বাংলার কৃষকের ওপর ছবি বানান। আমি আপনাদের সঙ্গে ক্যাটালিস্ট হিসেবে থাকব।” কথাটি বলার পিছনে মা, মাটি, মানুষকে তিনি কতটা ভালবাসতেন, সেটা সহজে ফুটে উঠে। তিনি চাইলে শহুরে আরামজাত জীবনযাপন কাটাতে পারতেন, সেটা তিনি করেননি, গ্রামে থেকে গেছেন। মনে করতেন, তিনি যা-ই আঁকতেন, সেটা গ্রামের মানুষ খুব সহজে বুঝতে পারতেন। গ্রামের মানুষের চিন্তা ভাবনার কথা, গ্রামের সৌন্দর্যের বর্ণনা ও কৃষকের কথা প্রভৃতি তিনি প্রাকৃতিক উপাদান মিশ্রিত রং-তুলির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতেন, সাথে গ্রামের মানুষ সহজে তা বুঝে ফেলতেন। ইট কাটের শহর, তার ভাল লাগত না, তার সৃষ্টিকৃত শিল্প বুঝার মত মানুষ তিনি গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ মনে করতেন। সে জন্য তিনি শহরের চেয়ে গ্রামে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ অনুভব করতেন।

এছাড়াও সুলতান গ্রামের পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের চিত্র আঁকাআঁকি শেখানোতে আগ্রহী ছিলেন। তখনকার ছেলেমেয়েদের জন্য একটু আহারের ব্যবস্থা করলেই, সহজেই চিত্র আঁকা শিখতে মন দিত। তিনি বলতেন, আমি কিছু শেখাতাম না, তারা জন্ম থেকে যে শিক্ষাটা গ্রহণ করে এসেছে, সেটাকে বের করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করতাম। গ্রামের পশুপাখি, গাছপালার বৈচিত্র্য প্রভৃতি ছেলেমেয়েদের আঁকার বিষয়বস্তু হিসেবে ধরিয়ে দিতেন। চিত্রকলার উপকরণ ব্যয়সাপেক্ষ বিধায় তিনি কেনার পক্ষে ছিলেন না, প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে রং, কালি তৈরি করে সুলতান ছবি আঁকতেন। বড় ক্যানভাসের ছবি আঁকতে বেশি পছন্দ করতেন।

তথ্যচিত্রে সংগীত ও আবহসংগীতের ব্যবহার অসাধারণ। প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো ছিলো মনোরম। গ্রামের দৃশ্যগুলোকে চিত্রগ্রাহক অনেক সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন। যদি মনে পড়ে সে দিনের কথা, যাদু ভারে নায়না, নবীজির খাস মহলে, সৃজন ছন্দে নাচে আনন্দে প্রভৃতি গানের সংযোজন তথ্যচিত্রটিকে খুবই নান্দনিক করে গড়ে তুলেছে। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন পুলক গুপ্ত। এছাড়াও বাঁশি ও দোতরায় ছিলেন কিরণ চন্দ্র রায়।

১৯৮৯ সালে ‘আদম সুরত’ তথ্যচিত্রের প্রথম প্রদর্শনী হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বাণিজ্যিকভাবে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন না করা হলেও ১৯৮০ এর দশকে দেশে এবং দেশের বাইরে টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। সে সময়ে ১৬ মিলিমিটার প্রযুক্তিতে তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এর ফলে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন কারণেই তা প্রদর্শন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

২০১৪ সালের বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত “তারেক মাসুদ উৎসবে” আদম সুরত তথ্যচিত্রের ডিভিডি সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। এ ডিভিডি সুলতানের ওপর নির্মিত এক সমৃদ্ধ দলিল। দুটি ডিস্ক ও একটি বই সমৃদ্ধ এ সংকলনে অর্ন্তভূক্ত রয়েছে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার, শিল্পী সুলতানের আঁকা চিত্রসমগ্র, অডিও সম্মেলন, চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের আলোকচিত্র এবং সুলতানকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন লেখা। ১৬ মিলিমিটার প্রযুক্তিতে নির্মিত তথ্যচিত্রটি ২০০৯ সালে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হয়।

চলচ্চিত্র শিক্ষক ও ফিল্ম মেকার আলমগীর কবিরের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গকৃত নির্মাতা তারেক মাসুদ ও স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের যৌথ প্রযোজনায় ৪৭ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের ‘আদম সুরত’ তথ্যচিত্রের চিত্রগ্রাহক প্রয়াত মিশুক মনির, বাংলা ও ইংরেজী ধারাবর্ণনায় যথাক্রমে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ও আলমগীর কবির, পরিস্ফুটন-মুদ্রণ-কারিগরি সহায়তায় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, সর্বশেষ চিত্রনাট্য পরিচালনায় ছিলেন তারেক মাসুদ

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

Facebook Comments Box