শিরোনাম
চট্টগ্রাম যন্ত্রশিল্পী সংস্থার সদস্যদের জন্য শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফের শুভেচ্ছা উপহার চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের সমন্বয় সভায় ট্রেনে যাত্রী সেবা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ নিংশ্বাসের বন্ধু’র প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন চট্টগ্রামে ১৬-১৭ জুন থিয়েটার থেরাপি প্রয়োগ বিষয়ক রিফ্রেশার্স ট্রেনিং চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জরুরী রোগী ব্যবস্থাপনার দুই দিনের প্রশিক্ষণ শুরু চা শ্রমিক নেতা বাবুল বিশ্বাসের মৃত্যুতে চা শ্রমিক নেতাদের শোক প্রকাশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর ভ্যাট চায় না চট্টগ্রাম সিটি ছাত্রদল বিডার কাছে ব্যবসায় সহজীকরণের উদ্যোগ চায় বিজিএমইএ মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে বেপজার প্লট পেল বঙ্গ প্লাস্টিকসহ দেশি বিদেশি দশ প্রতিষ্ঠান ভারতীয় ভেরিয়েন্ট দেশে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে
মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১, ০১:৫৬ অপরাহ্ন

শিক্ষা থেকে শিশু যতই ঝড়বে, ততই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বাড়বে

চন্দন কুমার বড়ুয়া / ১৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ৯ জুন, ২০২১
চন্দন কুমার বড়ুয়া

চন্দন কুমার বড়ুয়া: ‘এখনই আইন করুন, শিশুশ্রম বন্ধ করুন’- এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রতি বছরের ন্যায় বিশ্বের অন্য দেশের মত বাংলাদেশেও ১২ জুন পালিত হবে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আইএলও, সেইভ দ্য চিলড্রেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সহযোগিতায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এ জন্য ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের প্রত্যাহারের লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সরকারের এ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা-শ্রম সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী জায়গায় অবস্থান করে থাকে, সেহেতু মহামারী পরবর্তী শিশুশ্রম হ্রাসকরণে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।

অদৃশ্য প্রাণঘাতী করোনার আঘাতে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হল শিক্ষা। করোনায় বিধ্বস্ত শিল্প, বাণিজ্য ও অন্য খাতের ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেয়া যাবে, কিন্তু শিক্ষাজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া মোটেও সহজ নয়। কোমলমতি শিশুদের জীবন সুরক্ষায় গত বছরের ১৭ মার্চ হতে বন্ধ আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা গ্রহণের যতগুলো বিকল্প থাকুক না কেন, স্কুল ব্যতীত তা পূরণ হবার নয়। শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরতে উন্মুখ হয়ে আছে। শিক্ষক-অভিভাবকরাও চান সেই আগের মত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কলরবে ক্যাম্পাস মুখরিত হোক।

সম্প্রতি সংক্রমণ কমে আসায় সরকারের পক্ষ হতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির দিকে সবাইকে মুখিয়ে থাকতেই হচ্ছে। দীর্ঘ দিন স্কুলের বাইরে থাকা পরিস্থিতির অনিবার্য কারণে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়া শিশুরা স্কুল খোজে পাবে তো?

বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (এপিএসসি) ২০১৮ অনুযায়ী বর্তমানে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ, বিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার হার প্রায় ২ শতাংশ। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া মানেই শিশুশ্রমে য্ক্তু হওয়া। বিশ্লেষকদের ধারণা, যে কোন সময়ের তুলনায় এ বছর ঝরে পড়ার হার নিশ্চিতভাবে বাড়বে।

করোনাকালীন যে সব শিশু কাজে যুক্ত হয়েছে, তাদের অনেককেই স্কুলে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে এখনো ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। করোনার কারণে এ সংখ্যা আরো দ্বিগুণ হতে পারে। এত দিন দারিদ্রতা ও বাল্য বিয়ে কাজ করলেও ঝরে পড়ার পেছনে এখন করোনা যেন একমাত্র কারণ হয়ে উঠেছে। দেশে প্রায় ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রায় ৮০ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে থাকে। প্রতি বছর স্কুলগুলো শিশুদের পদচারণায় জমজমাট থাকলেও এ বছর এক পঞ্চমাংশ ভর্তিই হয়নি। কেননা করোনা সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির ফলে শহরাঞ্চলে বসবাসরত নিম্নবিত্ত এসব পরিবার আয় হারিয়েছে নতুবা কর্মহীন হয়ে স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে, ওসব শিশু কোন না কোন শ্রমে যুক্ত হয়ে গেছে। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

সরকার ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে শ্রম মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনে সম্প্রতি নতুন করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী জাতীয় পর্যায় হতে জেলা পর্যায়ে কমিটিগুলো শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১৭ লাখ, তার মধ্যে ১৩ লাখের অধিক অতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এরা সবাই শিক্ষা হতে ঝরে পড়া শিশু। দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে কম পারিশ্রমিকে শিশুদের দিয়ে বেশি কাজ করানো যায় বলেই এক শ্রেণির চাকুরীদাতাদের কাছে শ্রমজীবী শিশুদের চাহিদা থেকেই যায়।

এ সংখ্যার শিশুদেরকে শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনে দ্রুত শিশুশ্রম হ্রাস করার অংশ হিসাবে সরকার চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) সাব কম্পোনেন্ট ২ দশমিক ৫ এর আওতায় ৮-১৪ বছর বয়সী বিদ্যালয় বহির্ভূত ১০ লাখ শিশুকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যা আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম নামে দেশের ৬১টি জেলায় বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। ৮-১৪ বছর বয়েসী শিশুদের এই কর্মসূচি সফল বাস্তবায়ন হলে ঝরে পড়া বন্ধ হবে পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের প্রবেশ পথ বন্ধ হবে। যাদের বড় একটি অংশ কোন না কোন শিশুশ্রমে জড়িত। কিন্তু ২০২০ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া কর্মসূচি করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে থেমে আছে। সংক্রমণ কমে আসলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ কর্মসূচির কার্যক্রম পূর্ণ উদ্যমে চলবে বলে আশা করা যায়। এ কর্মসূচি সফল হলে বিশাল সংখ্যক শিশু শিশুশ্রম হতে মুক্ত হতে পারবে নি:সন্দেহে।

দেশে শিশুশ্রম নিরসনে সরকারের সাফল্য কম নয়, ইতিপূর্বে তৈরি পোশাক শিল্প ও চিংড়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে শতভাগ শিশুশ্রমমুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের রেশম, ট্যানারি, সিরামিক, গ্লাস, জাহাজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পাদুকা শিল্পসহ ছয়টি সেক্টরকে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণা করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। গত ৪ জুন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতি মন্ত্রী মন্নুজান সুফীয়ান শ্রম ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। এভাবে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট খাতকে শিশুশ্রম মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে যদি এগুনো যায়, তাতে সফলতা আসবেই। এ ক্ষেত্রে শিশুশ্রমে নিয়োগদাতা এবং অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া দরকার। যাতে কোন অজুহাতেই অভিভাবকরা শিশুদের শিশুশ্রমে না দেয়। সেই সাথে শিশুশ্রম নিরসনে শক্তিশালী জাতীয় মনিটরিং কোর কমিটি যথাযথ পর্যবেক্ষণ, মাঠ পর্যায়ে তদারক বৃদ্ধি করলে দেশ থেকে পর্যায়ক্রমে শিশুশ্রম হ্রাস করা সম্ভব হবে। দীর্ঘ সময় শিশুশ্রমে যুক্ত থাকা শিশুদের শিশুশ্রম হতে মুক্ত করা কঠিন। করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষাখাতকে আরো ঢেলে সাজানো উচিত। তাই চলতি বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্ধ আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

কর্মহীন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি মানুষদের পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানদের আর্থিক প্রণোদনার আওতায় অন্তভূক্তি করা প্রয়োজন। যাতে করে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক উভয়েরই সামর্থ সহনীয় থাকে। ফলে স্কুল খোলার পর শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনতে অনেক সুবিধা হবে। এতে করে ঝরে পড়া রোধ হবে, শিশুশ্রমের সংখ্যাও হ্রাস পাবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে সরকারী প্রণোদনায় সরকারী স্কুলগুলোর পাশাপাশি বেসরকারী স্কুলগুলোতেও ঝরে পড়া রোধে শতভাগ মিড ডে মিল চালু করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে ‘শিক্ষা থেকে শিশু যতই ঝড়বে, ততই ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বাড়বে।’

লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন সংগঠক

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ