মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

লাকিংমে চাকমার হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে চট্টগ্রামে সমাবেশ

পরম বাংলাদেশ ডেস্ক
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৩৩৬ Time View

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের যৌথ আয়োজনে ‘লাকিংমের স্মরণে ভালোবাসার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সমাবেশ থেকে দ্রুত লাকিংমে চাকমার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানানো হয়।

চট্টগ্রাম সিটির চেরাগী চত্বরে বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাশেদ হাসান।

পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা শ্রাবণ চাকমার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডাক্তার মাহফুজুর রহমান, নাট্যজন সাংবাদিক প্রদীপ দেওয়ানজী, ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শুকলাল দাশ, ন্যাপ সাংগঠনিক সম্পাদক মিটুল দাশগুপ্ত, সাংস্কৃতিক সংগঠক সুনীল ধর, সাংবাদিক প্রীতম দাশ।

সভাপতির বক্তব্যে রাশেদ হাসান বলেন, ‘যদি দেশের সংবিধান সব জাতিগোষ্ঠীর অধিকার স্বীকার করে তাহলে কেন কিছু দিন পরপর অধিকারের দাবিতে আদিবাসীদের পথে নামতে হয়? সবার রক্তে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী লাকিংমেকে অপহরণ করা হয়। কখনোই তা আইনসম্মত নয়। এটি দীর্ঘ চক্রান্ত, নারীর প্রতি অবিচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারলে আরো অন্যায় হবে। লাকিংমে চাকমার ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করছি।’

ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রতি অবিচার হবে আর প্রশাসন এসে তার প্রতিকার করবে এ ব্যবস্থা পাল্টাতে হবে। নতুন প্রজন্মের উচিত এ জন্য সংগ্রাম করা। যাতে প্রতিকারের জন্য কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।’

শরীফ চৌহান বলেন, ‘আমরা লাকিংমে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই। দোষীদের গ্রেপ্তার করা হোক। লাকিংমের জন্য আমাদের ভালোবাসা অব্যাহত থাকবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী লাকিংমেকে জোরপূর্বক ধর্মান্তর করা হয়, যা ধর্ষণেরেই নামান্তর। তাই নিয়মিত মামলা করে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচার করতে হবে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা লাকিংমের পরিবারের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ বলেন, ‘লাকিংমে চাকমাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে। তার পরিবার এর ন্যায্য বিচার পায় নি। লাকিংমে কোনো একক ঘটনা নয়। পাহাড়ে ও সমতলে এ রকম অনেক ঘটনা ঘটছে। জিয়াউর রহমান শান্ত পাহাড়ে অশান্তির আগুন জ্বেলে দিয়েছে। সেই দাবানল আজো জ্বলছে। সরকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে নানা চেষ্টা করলেও দুষ্টচক্র সক্রিয়। লাকিংমের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার চাই।’

ন্যাপ নেতা মিটুল দাশগুপ্ত বলেন, ‘নারীদের সর্বোচ্চ ত্যাগে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সংবিধান প্রণয়ন হয়েছিল ১৯৭২ সালে তাতে সব ধর্ম ও জাতিসত্তার মানুষের অধিকারের কথা বলা হলেও আদিবাসীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। লাকিংমেকে হত্যার বিচার দাবি করছি।’

সুনীল ধর বলেন, ‘নারী নিপীড়ন বিরোধী লংমার্চ হয়েছিল। এর পরও নারী নির্যাতন থামেনি। যে সব ঘটনা সামনে আসছে, সেগুলো নিয়ে মাঠে নামছি, প্রতিবাদ করছি। কিন্তু কত ঘটনা অন্তরালে থেকে যাচ্ছে। বৈষম্যহীন সাম্প্রদায়িকতামুক্ত দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। লাকিংমে হত্যার বিচার চাই।’

সাংবাদিক প্রীতম দাশ বলেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণ হত্যার বিচার এখন হয় না। লাকিংমে মারা গেছে আজ কতদিন? কিন্তু কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শুধু লাকিংমে নয় সকল ধর্ষণের, হত্যারর বিচার চাই। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ন্যায় কিচারের দাবিতে আন্দোলন করার মত লজ্জার কিছু নেই। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য সবাই জীবন দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু আজও তা হলো না।’

উল্লেখ্য, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী গ্রামের চাকমা পাড়ার লালা অং চাকমার মেয়ে লাকিংমে চাকমা (১৫)। গত বছরের ৫ জানুয়ারি লাকিংমেকে বাহারছড়া ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গার আতাউল্লাহসহ চার-পাঁচ জন যুবক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। এর পর তার বাবা টেকনাফ থানায় অপহরণের মামলা করার চেষ্টা করলেও থানা মামলা না নিয়ে তাদের আদালতে পাঠায়। ২৭ জানুয়ারি লাকিংমের বাবা নিজে বাদী হয়ে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে আদেশ দিয়েছিল। মামলায় লালা অং চাকমা অভিযোগ করেন তার মেয়ে বয়সে শিশু। ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া জন্মসনদ অনুযায়ী তার মেয়ের বয়স ১৪ বছর ১০ মাস। জন্ম সনদে লাকিংমের জন্ম ২০০৫ সালের ২ মার্চ। আতাউল্লাহরা তাকে অপহরণ করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
এর প্রায় এক বছর পর গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় লাকিংমে চাকমাকে কয়েকজন যুবক কক্সবাজার সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। সে দিন হাসপাতালে নেয়ার আগেই লাকিংমের মৃত্যু হয়েছিল বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। লাকিংমের মৃত্যুর বিষয়টি হাসপাতালে কর্মরত পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ লাকিংমের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ১০ ডিসেম্বর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পেয়ে লাকিংমের বাবা লালা অংও হাসপাতালে এসে সন্তানের মরদেহ পাওয়ার আবেদন করেন। এর পর আইনি জটিলতা শুরু হওয়ায় লাকিংমের মরদেহ কাউকে দেওয়া হয়নি। গত ১৫ ডিসেম্বর লালা অং চাকমা মরদেহ পেতে টেকনাফ বিচারিক হাকিম আদালতে আবেদন করেন। আদালত শুনানি করে আবেদনটি গ্রহণ করে লাকিংমের ধর্ম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে র‌্যাবকে দায়িত্ব দেয়। এর পর র‌্যাব তদন্তের দায়িত্ব পায়। তদন্তে লাকিংমে চাকমার বয়স নাবালিকা অর্থাৎ প্রচলিত আইনে বিয়ের উপযুক্ত।

প্রেস নিউজ

Share This Post

আরও পড়ুন