রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০১:০৭ পূর্বাহ্ন

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে: মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনার এক ঐতিহাসিক দলিল

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : সোমবার, ২৪ মে, ২০২১
  • ৯৭ Time View

নুরুন্নবী নুর: পৃথিবীর প্রতিটি জাতির উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাস রয়েছে উন্থান ও পতনের। কোন জাতিই তার নিজ ভূখন্ডকে আপনা-আপনি পেয়ে যায় না। কোন না কোনভাবে সংগ্রাম করে আদায় করে নিতে হয়/হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম যে হয় না, তা কিন্তু না। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান দুইটি খণ্ডে বিভক্ত হয়। একটি পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ; অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান মূলত পাঞ্জাবি, পাঠান, বেলুচি এবং সিন্ধিদের আবাসভূমি। সেখানে পাঞ্জাবিরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।

পুরো পাকিস্তান জুড়ে শতকরা ৫৬ জন মানুষ, জাতিতে বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও, ভাষা তো দূরের কথা; পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি অধিবাসীরা, নিজ ভূখন্ডকেও নিজের করে নিতে পারেনি। সে জন্য পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান, উভয় অঞ্চলের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক যুদ্ধে নেমে পড়ে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা সুযোগ-সুবিধায়, পূর্ব পাকিস্তানিদের চেয়ে এগিয়ে ছিল বিধায়, তারা সবসময় পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর জোর-জুলুম, নির্যাতন, শাসন-শোষণ ও পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের অধীনস্থ করে রাখতে চেয়েছিল। এসব বাঙালিরা কোনভাবে মেনে নেয়নি।

ন্যায়ের অধিকার রক্ষায় বাঙালিরা প্রথমে ভাষা আন্দোলন দিয়ে, পরে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে, তারা তাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে সফল হয়। পূর্ব পাকিস্তান, একটি নতুন ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত লাভ করে। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান, পূর্ব পাকিস্তানের নাম রাখেন, ‘বাংলাদেশ’। এ যে পশ্চিমীদের কাছ থেকে পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করার পিছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে আত্মত্যাগ; যা কখনই ভুলবার নয়। সে সময় পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের সাথে যুদ্ধে নেমে পড়ে এদেশের আপামর জনসাধারণ। আপামর জনসাধারণ বলতে দেশি, বিদেশি, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ সর্বোপরি সব শ্রেণি পেশার সাধারণ মানুষ; যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন পূর্ব বাংলাকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল। ১১টি সেক্টর মূলত সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে পরিচালিত হত। সে হিসেবে চট্টগ্রাম ছিল এক নম্বর সেক্টরের অধীনে। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, মেজর রফিকুল ইসলাম। তিনি ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) চট্টগ্রাম হেডকোয়ার্টারে এ্যাডজুট্যান্ট পদে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাত আটটা ৪০ মিনিটে তার অধীনস্থ ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও জেসিওদের নিয়ে পাকিস্তারিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং রাত সাড়ে এগারোটার মধ্যে পুরো চট্টগ্রাম শহর দখলে আনতে সক্ষম হোন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্যে আরো অনেকের সাথে তাকে জীবিত ব্যক্তিবর্গের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বীরউত্তম’-এ ভূষিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম রচনা করেছেন ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’। বইটি ১৯৭৪ সালে প্রথম প্রকাশিত ইংরেজিতে লেখা তার মূল গ্রন্থ ‘এ টেল অব মিলিয়নস’ থেকে অনূদিত। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার করুণ ও বেদনাময় কাহিনী নিয়ে রচিত তার আরেকটি বই ‘মুক্তির সোপানতলে’, প্রকাশিত হয় ২০০১ সালের জুলাই মাসে।

‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থটির মূল অংশে সামরিক ও গেরিলা তৎপরতার বিবরণ এবং রাজনৈতিক ও অন্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। মূলত রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার চূড়ান্ত যুদ্ধে এদেশের আপামর জনসাধারণের মহান অবদান আর আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইটির সব ঘটনা।’ বইটি শুধু এক নম্বর সেক্টরের যুদ্ধের বর্ণনামূলক নয়, এটি অন্য সেক্টরের যুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবেন। এমনি করে সব সেক্টরের ঘটনাবলী এবং যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণসমূহ থেকে সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের বিশাল চিত্রপট পাঠকের সামনে উজ্জ্বল, সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে।

‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনার বর্ণনায় সমৃদ্ধ এক ঐতিহাসিক দলিল। গ্রন্থে এক দিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের অনিশ্চিত, দুঃস্বপ্নের নয় মাসের রক্তাক্ত যুদ্ধসমূহের বিবরণ স্থান পেয়েছে, অন্য দিকে বর্ণিত হয়েছে বাঙালি হত্যায় উন্মত্ত পাকিন্তানি সৈন্যদের নৃশংতার বিবরণ। কীভাবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, এক কোটি বাঙালিকে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। গ্রন্থকার নিজে এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী। এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি এক দিকে যেমন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি প্রত্যক্ষ করেছেন প্রতি মুহূর্তে; তেমনি গভীরভাবে অনুভব করেছেন এ যুদ্ধের নৃশংসতা, ভয়াবহতা, সাধারণ মানুষের বেদনার্ত আহাজারি। তারই প্রতিফলন ঘটেছে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে।’

এত দিন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রত্যক্ষদর্শী ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে রক্ষার, মুক্তিযু্দ্ধের পিছনের ইতিহাস জেনেছি ও চিনেছি, আজ একজন সেক্টর কমান্ডারের সরাসরি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ দৃষ্টিতে মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পেরে, নিজের মধ্যে বেশ গর্বোবোধ অনুভব হচ্ছে। বইটি পড়লে, ‘ব্যক্তিস্বার্থে যারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিকৃত করছে তাদের কর্মকাণ্ড সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে সবার কাছে। ইতিহাস তার নির্মোহ সৃষ্টি-ধারায় অসত্যের আশ্রয়ধারীদের ফেলে যাবে অন্ধকারের আস্তাকুঁড়ে। ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কারো স্বার্থেই ইতিহাসকে মিথ্যার আবরণে ঢেকে রাখা যায় না চিরকাল।

শুধু এক নম্বর সেক্টরের ইতিহাস জানতে যেয়ে পার্শবর্তী দেশ ভারতের জনগণ এবং সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাদের সহায্যের কথা জানতে পেরেছি, ভালও লেগেছে। বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্রের ন্যায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর যে ন্যাক্কারজনক দমন পীড়ন চালিয়েছিল, তা কখনও ভুলবার নয়। তবে পূর্ব বাংলা, বর্তমান ফিলিস্তনিদের ন্যায় শক্তিতে দুর্বল হলেও অধিকার রক্ষায় পার্শবর্তী দেশগুলোর সাহায্য-সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল এবং পশ্চিমীরা, পূর্ব বাংলার জয় সুনিশ্চিত জেনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, সেটাই বাঙালির জন্য বড় অর্জন। মিথ্যা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সত্যের কাছে সে চিরদিনই দুর্বল। সত্যের জয় একদিন হবেই।

মনে রাখতে হবে, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ কোন সামরিক অভিযান নয়- স্বাধীনতার যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোন স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে পারে না, মুক্তির সশস্ত্র চূড়ান্ত যুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হয় না।’

অনন্যা প্রকাশনীর ৩৯টি অনুচ্ছেদবিশিষ্ট মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম কর্তৃক রচিত ৬০০ পৃষ্ঠার ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইটির প্রকাশক মনিরুল হক। বইটি প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ১৯৮১, পরিমার্জিত নবম সংস্করণ মার্চ ২০১৪, পরিমার্জিত দশম সংস্করণ জুলাই ২০১৯। এছাড়াও ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইটির গ্রন্থস্বত্ব লেখক নিজেই, প্রচ্ছদে দেবদাস চক্রবর্তী, অক্ষর বিন্যাসে তন্বী কম্পিউটার ও মুদ্রণে পাণিনি প্রিন্টার্স। গায়ের মূল ৬০০ টাকা হলেও, ৯০টাকা ছাড়ে ও কুরিয়ার খরচসহ ক্রয়মূল্য ৫৮০ টাকা। রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, ‘যে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে তাদের অমর স্মৃতির প্রতি-‘ উৎসর্গ করেছেন।

লেখক: তরুণ শিল্প সমালোচক, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

Share This Post

আরও পড়ুন