রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন

রক্তাক্ত গন্ডামারা: দুই । ১৭ এপ্রিল ঘটনার সূত্রপাত

ফজলুল হক মিন্টু
  • প্রকাশ : বুধবার, ১২ মে, ২০২১
  • ৯১ Time View

বাঁশখালির গন্ডামারায় নির্মাণাধীন এসএস প্লান্টে দুই ধরনের শ্রমিক কর্মরত আছে। খুব অল্প সংখ্যক শ্রমিক সরাসরি চাইনিজ কোম্পানি সেপকোর অধীনে কর্মরত আছে, যারা ছিল দক্ষ শ্রমিক। এদের বেশীর ভাগ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। এরা চাইনিজদের থেকে কাজ বুঝে নিয়ে বাঙ্গালি শ্রমিকদের পরিচালনা করে। আবার অন্যদিকে, অবশিষ্ট বেশীর ভাগ শ্রমিক নিয়োগ প্রাপ্ত হয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এসব ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান, প্লান্ট কর্তৃপক্ষ হতে নিয়মিত এবং সময়মত শ্রমিকদের মজুরি বিল পায় কিনা সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নাই। তবে শ্রমিকদের মজুরি কখনোই নিয়মিত এবং সময়মত পরিশোধ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

শ্রম আইন অনুসারে মজুরিকাল শেষ হওয়ার সাত কর্ম দিবসের মধ্যে মজুরি পরিশোধের নিয়ম থকেলেও জানা যায়, ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত শ্রমিকেরা মার্চ মাসের মজুরি পায়নি। প্রায়শঃ শ্রমিকদের দুই-তিন মাসের মজুরিও বকেয়া থাকে বলে শ্রমিকদের অভিযোগ রয়েছে। আবার রমজান মাস শুরু হওয়ায় এ সময় একটু বাড়তি খরচ প্রয়োজন হয় বিধায়, শ্রমিকদের বাড়িতে টাকা পাঠানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এইঅবস্থায় তারা দাবি তোলে, প্রতি মাসের ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে পূর্ববর্তী মাসের মজুরি পরিশোধ করতে হবে এবং মার্চ মাস পর্যন্ত সব বকেয়া মজুরি অতিসত্বর পরিশোধ করতে হবে।

এখানে শ্রমিকদের কোন লিখিত চুক্তিপত্র বা নিয়োগপত্র দেয়া হয় না। শ্রমিকদের সাথে মৌখিক আলোচনার মাধ্যমে ঘন্টা হিসাবে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। তবে মজুরি দেয়া হয় মাস হিসাবে। এখানে নিয়োজিত শ্রমিকদের অধিকাংশই নির্মাণ শ্রমিক। মজুরি ঘন্টায় ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। দৈনিক কার্য সময় ১২ ঘন্টা। তবে মাঝখানে মধ্যাহ্ন বিরতির ব্যাপারে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, দুই ঘন্টা আবার কেউ বলেছেন তিন ঘণ্টা। সে হিসাবে মধ্যাহ্ন বিরতি দুই-তিন ঘন্টা বাদ দিলে দৈনিক কার্য সময় নয়-দশ ঘন্টা হয়ে থাকে। শ্রমিকেরা রোজার সময় একটানা বিরতিহীন আট ঘন্টা কাজ করতে চেয়েছিল। শ্রম আইনে সাপ্তাহিক ছুটির কথা উল্লেখ থাকলেও শ্রমিকেরা সাপ্তাহিক ছুটির দিন জুমার নামাজের আগ পর্যন্ত চার ঘন্টা কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ সেটা মানেনি।

উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ প্রকল্পটির ৭০ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশের এস আলম গ্রুপের এবং বাকী ৩০ শতাংশ চাইনিজ কোম্পানি সেপকো ইলেকট্রিক পাওয়ার কনট্রাকশন কর্পোরেশন (২০ শতাংশ) এবং এইচটিজি ডেভলপমেন্ট গ্রুপের (১০ শতাংশ)।

প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রকৌশল কাজসহ যাবতীয় দায়িত্ব ছিল চাইনিজ কোম্পানি দুইটার অধীনে। প্রকল্পে প্রায় পাঁচ হাজার বাঙালি শ্রমিক এবং এক হাজার চাইনিজ নাগরিক কর্মরত রয়েছে। এত বড় একটি শ্রম ঘন প্রকল্পে শ্রমিক পরিচালনা করার মত দক্ষ মানব সম্পদ বিভাগের ঘাটতি রয়েছে। চাইনিজ এবং বাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভাষাগত যোগাযোগেরও ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণের জন্য খুব বেশী পরিকল্পিত উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। চাইনিজ এবং বাঙালি শ্রমিকদের মাঝে ব্যবস্থাপনার জন্য ২-১ জন বাঙালি দায়িত্বে থাকলেও তারা ছিল মূলত চাইনিজ দ্বারা প্রভাবিত। চাইনিজদের সন্তুষ্ট করাই তাদের একমাত্র কাজ। তারা শুধু চাইনিজদের বক্তব্য বাঙালি শ্রমিকদের অবহিত করেই দায়িত্ব শেষ করত।

বাঙালি শ্রমিকদের কোন বক্তব্য বা তাদের কোন অভিযোগ চাইনিজদের কাছে উপস্থাপন করার মত সক্ষমতা বাঙালি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ছিলনা। ফলে চাইনিজ এবং বাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি বাড়তে বাড়তে এক সময় বিস্ফোরণ ঘটে।

(চলবে)

Share This Post

আরও পড়ুন