শিরোনাম
সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৭ অপরাহ্ন

যুব সামাজের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় থিয়েটার থেরাপির প্রয়োগ বাড়াতে হবে

মোহাম্মদ আলী / ৮৩২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২০

যুব সমাজের মানসিক হতাশা দূরিকরণ, মনভঙ্গি সুদৃঢ়করণ এবং সতস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা বিকাশের লক্ষ্যে থিয়েটার ফর থেরাপির নানা ধরনের কর্মশেলীভিত্তিক প্রয়োগকলা কর্মসূচী পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোস্তফা কামাল যাত্রা। সম্প্রতি এ মনোবিশ্লেষক নাট্য বিজ্ঞানী পরম বাংলাদেশ এর মুখোমুখী হয়েছিলেন। সাক্ষাৎ নিয়েছেন মোহাম্মদ আলী।

পরম বাংলাদেশ: মনোস্বাস্থ্য শিক্ষা কেনো গুরুত্বপূর্ণ?

মোস্তফা কামাল যাত্রা : ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের (WHO) দেওয়া সংজ্ঞা মোতাবেক স্বাস্থ্য হচ্ছে, শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার সমন্বয়ে গঠিত ব্যক্তির অবস্থা। অর্থাৎ একজনের স্বাস্থ্য ভালো আছে কিনা তা নির্ভর করে ওই ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার সু-সমন্বিত রূপের উপর। যা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান যে, মনোস্বাস্থ্য শিক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্য কি এবং মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচর্যা বিষয়ক জ্ঞান এবং দক্ষতা তথা সক্ষমতা না থাকলে কোন ব্যক্তিই স্বাস্থ্যবান বলে বিবেচিত হবেন না। তাই শিশুকাল থেকেই মনোস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত্ব এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক শিক্ষা অত্যন্ত জরুরী। পারিবারিক পর্যায়ে প্রাসঙ্গিক আলোকপাত ও অনুশীলনের মাধ্যমে আচরণিক পরিবর্তন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে যা সম্ভব। অর্থাৎ মনোস্বাস্থ্য শিক্ষা ছাড়া সুষ্ঠু সামাজিকরণ ঘটে না। তাই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রসঙ্গ।

পরম বাংলাদেশ : আমাদের দেশে মনোস্বাস্থ্য শিক্ষা তথা মনোবিজ্ঞানের পাঠ স্কুল-কলেজ পর্যায়ে কতখানি গুরুত্ব দিয়ে পঠন-পাঠন হয়?

মোস্তফা কামাল যাত্রা : মোটেই গুরুত্ব দিয়ে পঠ-পাঠ হয় না। এর কারণ হলো, বাংলাদেশে ১৯১২ খিৃষ্টাব্দে ব্রিটিশ কর্তৃক প্রণীত Lunacy Act 1912 দ্বারা মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিদের অধিকার ও আইনী সহযোগীতা প্রদান করা হয়। যা একটি হাস্যকর ও হতাশাব্যঞ্জক ইতিহাস। এই আইনে মানসিক অসুস্থতাকে পাগলামী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং যেখানে পাগলদের পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার নেই বলে আইনগত বাধ্যবাদকতা রাখা হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থ ব্যক্তির মতামতের কোনো মূল্য নেই। ডাক্তার কর্তৃক দেওয়া ব্যবস্থাপত্র তাঁর পরিবারকে মেনে নিতে হয়। চিকিৎসা গ্রহণ এবং আইনগত সহায়তার ক্ষেত্রে অভিভাবকত্ব নির্ধারণেও তাঁর ইচ্ছার মূল্য নেই। প্রকৃতপক্ষে, এই আইন একজন মানসিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যাক্তিকে আত্মমর্যাদাহীন প্রাণী হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকে। ব্রিটিশদের প্রণীত এই মানবতাবিরোধী আইন তথা কালা কানুন রদ করে বাংলাদেশে একটি অধিকারমূলক মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ণের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার একটি নতুন আইন প্রণয়ণের উদ্যোগ নিলেও এই আইন প্রণয়ণে মনোচিকিৎসকদের (Psychiatrist) মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে খসড়া আইনটি প্রস্তুত করেছেন। যেখানে ঔষুধী চিকিৎসাকে গুরুত্ব দিয়ে মনোরোগীদের উপর নির্যাতনমূলক একরৈখিক আচরণ করার সুযোগ রেখে বিভিন্ন ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। যা পৃথিবীর অপরাপর দেশের গৃহীত অধিকারমূলক সনদ ও আইনের পরিপন্থী। বিশেষত জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত বিভিন্ন সনদের সাথে যা সাংঘর্ষিক ও অমানবিক। ওই তথাকথিত খসড়া আইনে সাইকোথেরাপি ও সাইকোথেরাপিস্টদের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রদানের কোন অবস্থান নেই। সেই সাথে মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আধুনিক সৃজনশীল কলা পদ্ধতিসমূহের এ আইনে কোনো স্বীকৃতি নেই। সর্বোপরি প্রচলিত মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা পদ্ধতিসমূহের মপাঠ অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডিগ্রী প্রদান সাপেক্ষে বিবেচিত হবে বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল কলাশৈলীভিত্তিক বিকল্প মনোচিকিৎসা পদ্ধতিসমূহ মনোচিকিৎসায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। যার স্বীকৃতি তো দূরে থাক, এর যথাযথ ব্যাখ্যাও এই খসড়া আইনে উপেক্ষা করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, এই খসড়া আইন আধিপত্ববাদী এক অমানবিক পুন:নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র হিসাবে বিদিত এবং মানবাধিকারকর্মি ও মনোসমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তি ও তাঁর/তাঁদের পরিবারের কাছে প্রত্যাখ্যাত দলিল। আইনের বেড়ী দিয়ে নতুন করে মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবাকে গোষ্ঠীভূক্ত করার হীন এই আইনি প্রচেষ্টায় আমরা যা অবলোকোন করি তা হল- দক্ষ মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সক্ষম জনবল তৈরির প্রতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব সংক্রান্ত কোন দিক নির্দেশনা তো নেইই; বরং সেবাকে কিভাবে সামাজিকীকরণের বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিকিকীকরণের পাশাপাশি ঔষধী চিকিৎসার যাঁতাকলে পিষ্ট করা যায় তার চক্রান্ত গ্রন্থীত হয়েছে। যদিও সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় দেশে স্কুল/কলেজ পর্যায়ে মনোস্বাস্থ্য শিক্ষা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তবে অবশ্যই তা মেডিকেল মডেলে না হয়ে সোশ্যাল মডেলে হতে হবে। যাতে সামাজিকিকীকরণের মাধ্যমে মনোসমস্যাগ্রস্থদের মানসিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় এবং দক্ষ মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সেবাকর্মি গড়ে তুলতে বিকল্প তথা সৃজনশীল কলাবিদ্যা গুলো গুরুত্ব দিয়ে পঠিত হয়; তার জন্য কার্যকরী ও যোক্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায়, মনোসামাজিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবাখাত দুষ্ট চক্রের আবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে না। মোদ্দাকথা মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য দূরিকরণ ও সেবা প্রদানে দক্ষ জনবল সৃষ্টির প্রক্রিয়া আধুনিক ও মনোবৈজ্ঞানিক হওয়ার জন্য মনোস্বাস্থ্য শিক্ষাকে যথাযথ সংজ্ঞায়ন, যুগোপযোগী এবং আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্কুল/কলেজ পর্যায় থেকেই পাঠ্যসূচীভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। তবেই আমরা মুক্ত হতে পারবো তথাকথিত বন্ধাত্বতাপূর্ণ পরিস্থিতি ও একমূখী আধিপত্বমূলকতার বলয়মুক্ত।

পরম বাংলাদেশ : আপনি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। কেনো তরুণদের লক্ষ্য জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করে কাজ করছেন?

মোস্তফা কামাল যাত্রা : দেখুন আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ মানুষ বর্তমানে তরুণ-তরুণী। যারা আমাদের দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে এবং বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে Sustainable Development Goal (SDG) এর সকল সূচক অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। অপর দিকে গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক ১৬.৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী মানসিকভাবে কোনো না কোনো সমস্যাগ্রস্থ। অর্থাৎ আগামী বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসাবে বিশ্বে স্বীকৃতি পেতে হলে আমাদের দক্ষ তরুণ-তরুণীদের সামগ্রিক অর্থে সুস্থ্য ও স্বাস্থ্যবান রাখতে হবে। তাই তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সেবা সহজলভ্য ও নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। অন্যথায়, আমরা দক্ষ ও কর্মক্ষম জনগণের চাইতে অদক্ষ ও অকর্মন্য জনবলের বোঝা বহনকারী রাষ্ট্রে পরিণত হবো। সেই কারণেই আমি তরুণ-তরুণীদের লক্ষ জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অধিপরামর্শমূলক কাজের পাশাপাশি বিকল্প ধারার সৃজনশীল কলাবিদ্যা প্রধান মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা প্রদান ও সেবা প্রদানে দক্ষ জনবল সৃষ্টির প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। যাতে একটি দক্ষ ও কর্মক্ষম এবং সতস্ফূর্ত তরুণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হয়। যারা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে তাদের সামগ্রীক সক্ষমতাকে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়।

পরম বাংলাদেশ : আমাদের দেশের বেশিরভাগ তরুণ সমাজ মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ কি?

মোস্তফা কামাল যাত্রা : আমাদের দেশের মানুষের সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ হয় না। পারিবারিক জীবনে অশান্তি, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যত সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আর্থ মানসিক একটি অবস্থা ও অবস্থান সর্বদাই বিরাজমান থাকে। ফলে তাদের হতাশাগ্রস্থ ও ভঙ্গুর মনোবল নিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার জীবনাচারের মধ্যে কাটে তাদের জীবন চক্র। যার সাথে আবেগগত দৃঢ়তার অভাবে তরুণ তরুনীরা সমন্বয় সাধন করতে পারে না। ফলে তারা অকর্মণ্য হয়ে পড়ে এবং হতাশায় ভোগে। জীবনের প্রতি নেতিবাচক মনোভঙ্গী সৃষ্টি হয়। বেছে নেয় আসক্তির পথ। ফলে আত্মহননের পথে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে তরুণ সমাজ। এই নেতিবাচক পরিস্থিতিই মূল কারণ আমাদের দেশের তরুন তরুণীদের হতাশাগ্রস্থতার। আর এই হতাশাগ্রস্থতা দূর করতে প্রয়োজন যথাযথ সময়ে যথাযথ মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যসেবা। যা কেবলমাত্র ঔষুধী বানিজ্যের মুখাপেক্ষী করে রাখলে সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের মত পার্শ্ব- প্রতিক্রিয়াহীন সৃজনশীল কলাবিদ্যা ব্যবহার করে চিকিৎসা নেওয়ার পথে থাকা বাধাগুলো দূর করতে মনোস্বাস্থ্য চিকিৎসার ধরণ, গতি-প্রকৃতি এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াসমূহ প্রাথমিক স্তর থেকে পাঠ্যসূচী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী। এতে করে নাগরিক হিসাবে মনোস্বাস্থ্য প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বাল্য বয়স থেকেই তারা সচেতন হয়ে গড়ে ওঠবে এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সদাই সচেষ্ট থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশে যা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে মনোবিজ্ঞান হিসেবে একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যক্রম হিসাবে প্রযুক্ত। ফলে হঠাৎ করে এবং জীবনের একটি পরিণত সময়ে এসে তরুন-তরুনিরা যখন মনোস্বাস্থ্য শিক্ষার মুখোমুখি হয় অর্থাৎ পাঠ্যক্রম হিসেবে তা শিক্ষার্থীদের কাছে অবধ্য হয়ে উঠে এবং গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সর্বোপরি মনোবিজ্ঞান বিষয়টি সম্পর্কে পূর্বাবগতি না থাকায় তার প্রতি থাকে না তাদের কোনো আগ্রহ। তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমক পর্যায় থেকেই গুরত্ব দিয়ে মনোস্বাস্থ্য শিক্ষার ধারাবাহিকতা সৃষ্টির জন্য বয়স ও বুদ্ধিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার পাঠ্যক্রম শ্রেণীভিত্তিক পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করা আবশ্যক। এই বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের মনযোগ আকর্ষণ করছি। রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের মনযোগী হতে হবে যাতে করে বাংলাদেশে এক রৈখিক দুষ্টবলয় চক্র থেকে বের হয়ে এসে একটি যুগপোযোগী ও আধুনিক এবং মানবাধিকারধর্মী মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ণের পথকে প্রসস্থ করতে। যা তরুণ সমাজের মধ্যে আশার আলো জ্বালাবে এবং আমরা পাব প্রতিশ্রুতিশীল মনোস্বাস্থ্য শিক্ষায় শিক্ষিত, স্বতস্ফ‚র্ত, সৃজনশীল এবং কর্মঠো আগামী তরুণ প্রজন্ম।

পরম বাংলাদেশ : তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে কি কি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

মোস্তফা কামাল যাত্রা : যেহেতু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ জন সমাজ তরুণ তরুণী; সেহেতু তাদের মানসিক প্রশান্তি ও স্বতস্ফূর্ততা নিশ্চিতকরণে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে নানমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত হল স্বতস্ফূর্ততা। আর স্বতস্ফূর্ততা হল কর্মক্ষমতার নিয়ামক শক্তি। কর্মক্ষম তরুণ সমাজের পরিসংথ্যান যত বাড়বে; তত তারা উৎপাদনশীল জনশক্তি হিসাবে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নে থাকবে ক্রিয়াশীল যা আমাদের অর্থনীতির চাকাকে রাখবে সচল ও বর্ধনশীল। প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনের চাকাকে গতিশীল করতে হলে আমাদের প্রয়োজন স্বতস্ফূর্ত ও কর্মক্ষম তরুণ জনসম্পদ। তরুন-তরুনীদের মনোস্বাস্থ্য পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই যা সম্ভব। তা নিশ্চিত করতে বেসরকারী পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারি পর্যায় থেকেও প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদী স্থায়ীত্বশীল নানান উদ্যোগ। এর জন্য প্রয়োজন মনোস্বাস্থ্যসেবা প্রদানে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সৃজনশীল কলাবিদ্যার উচ্চতর পাঠ্যক্রম চালু করা এবং গড়ে ওঠা জনবলের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে যথাযথ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করা। যা সরকারী ও বেসরকারী উদ্দ্যোগের মধ্যে সমন্বয় ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচী ছাড়া সম্ভব নয়। তাই দ্রুত সেই সমন্বয় ও কার্যকর পদক্ষেপ সময়ের দাবি। আশা করি, রাষ্ট্রের বৃহত্তর অগ্রগতি ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের কথা বিবেচনায় জনস্বার্থে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ এগিয়ে আসবে। যা জরুরিভিত্তিতে করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কারণ আমাদের মোট জনসংখ্যার তুলনায় মনোস্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য দক্ষ জনবলো ঘাটতি রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশে এক লক্ষ মানুষের জন্য একজন করেও মনোস্বাস্থ্য সেবা প্রদানে দক্ষ জনবল নেই। কিন্তু সরকার কর্তৃক সেবার মান বৃদ্ধি ও সেবা প্রদানের জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রের অবকাঠামো গড়ে তোলার চিন্তা করছে। যার অর্থ হচ্ছে ঘোড়ার আগে গাড়ী রাখার মত অবস্থা। এ অবস্থায় অনতিবিলম্বে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোস্বাস্থ্য চিকিৎসা প্রদানে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য উন্নত বিশ্বের মত বাংলাদেশেও সৃজনশীল কলাবিদ্যাধর্মী পাঠ্যক্রমের (থিয়েটার থেরাপি, আর্ট থেরাপি, মিউজিক থেরাপি প্রভৃতি) স্বতন্ত্র বিভাগ চালু করে দক্ষ জনবল সৃষ্টির উদ্দ্যোগ নেওয়া। কারণ খসড়া আইনে মনোস্বাস্থ্য সেবা প্রদানে সক্ষম ব্যক্তি হিসাবে পেশাদার ব্যক্তিকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ডিগ্রিধারী হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সৃজনশীল কলাবিদ্যা কেন্দ্রীক মনোস্বাস্থ্য সেবা পদ্ধতির স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি। সামগ্রীক বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও পর্যালোচনা এবং আইনি প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় একথা পরিষ্কার যে, আলোচ্য পরিস্থিতি থেকে আমাদের মুক্ত হতে হলে অবশ্যই উল্লেখিত আলোকপাত বিবেচনায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণপূর্বক তা বাস্তাবায়নে একযোগে কাজ করতে হবে।

পররম বাংলাদেশ : মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সৃজনশীল কলাবিদ্যার প্রাসঙ্গিকতা ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে কিছু বলুন।

মোস্তফা কামাল যাত্রা :দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার দেশ হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের মনোবিপর্যয়ের ঝুঁকি বেশি ও বর্তমান করোনা মহামারীর কারণে সৃষ্ট মনোস্বাস্থ্য বিপর্যয় আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপর দিকে, বাংলাদেশে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য উচ্চ শিক্ষার চিত্র ও হার হতাশা ব্যাঞ্জক। কারণ, দেশের মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য ক্লিনিক্যাল সাইকোলজী পাঠের সুযোগ রয়েছে। অপর দিকে কলেজ পর্যায়ে পঠিত মনোবিজ্ঞান বিষয়টির পাঠ্যক্রম সেকেলে ও তাত্বিক। তাই, পাশ করা মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা মনোস্বাস্থ্য সেবা প্রদানে যথাযথভাবে সক্ষমতা অর্জন করে না। গুস্তাফ ফ্রয়েড প্রবর্তিত প্রচলিত সাইকোটেকনিক তত্বের অনুসরণে যে মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা আমাদের দেশে অনুশীলিত হয় তা প্রদানে দক্ষ জনবরের ঘাটতি যেমন রয়েছে- এই প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কিন্তু জেকভ লিভি মরিনো প্রবর্তিত সৃজনশীল কলাবিদ্যাধর্মী মনোচিকিৎসা একটি দলীয় ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি। যা কম ব্যয়ে ও স্বল্প সময়ে অধিক মানুষের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সু-নিশ্চিত করে। আমাদের দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা ও অবস্থান বিবেচনায় দ্বিতীয়োক্ত মনোচিকিৎসা পদ্ধতি যথোপযুক্ত প্রক্রিয়া বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। যা বৈশ্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলেই যে কারো কাছে সহজেই বোধোগম্য হবে।
তাই বাংলাদেশে মনোসামাজিক চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাশ্রয়ী, অর্থ-বান্ধব ও স্বল্প সময়ে অধিক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিক্ষিত ও কালজয়ী মনোচিকিৎসা প্রক্রিয়া তথা সৃজনশীল কলাবিদ্যাধর্মী কর্মশৈলীর প্রয়োগ অধিকতর প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক।

মোস্তফা কামাল যাত্রা
মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞানী
অতিথি শিক্ষক: নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
নির্বাহী পরিচালক: উৎস (ইউনাইট থিয়েটার ফর সোস্যাল অ্যাকশন)
মঞ্চাভিনেতা ও নির্দেশক
কলামিস্ট

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ