মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০১:৩৬ অপরাহ্ন

যক্ষ্মা আমাদের জন্য এখনও চিন্তার বিষয়

ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ / ৪৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৪ মার্চ, ২০২১
ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

ডাক্তার মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ: বিশ্বকে ঘর বন্দি করে ফেলেছে নোভেল করোনাভাইরাস। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে উপায় খুঁজতেই সারা পৃথিবী এখন ব্যস্ত। নোভেল করোনাভাইরাসের মারাত্মক রূপের মধ্যেই বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। ২৪ মার্চ দিনটি প্রতি বছর বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ দিনটিতে বিশ্ব জুড়ে যক্ষ্মা বিষয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা প্রচার করা হয়।

কেন এ দিনটিই নির্দিষ্ট হল? এর একটি ইতিহাস রয়েছে। ১৮৮২ সালের এ দিনটিতেই বিজ্ঞানী রবার্ট কোচ জানিয়েছিলেন, তিনি যক্ষ্মার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেছেন। তার এ আবিষ্কার যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। জীবাণু আবিষ্কার প্রায় ২০০ বছর হলেও বিশ্ব জুড়ে যক্ষ্মা এখনও মানুষের প্রাণ কাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসেব বলছে, মারাত্মক সংক্রামক যক্ষ্মা এখনও প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার জনের প্রাণ কাড়ছে। এ ছাড়াও বিশ্বে ৩০ হাজার জন প্রতিদিন রোগাক্রান্ত হচ্ছে। তবে আশার কথা, এ রোগ প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের পথ উন্মোচন হয়েছে।

অতীতে যক্ষ্মা একটি অনিরাময়যোগ্য রোগ হিসেবেই পরিচিত ছিল। তখন বলা হত ‘যার হয় যক্ষ্মা তার নাই রক্ষা’। সেই ধারণা অবশ্য এখন পাল্টেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে যক্ষ্মা এখন একটি নিরাময়যোগ্য রোগ হিসেবেই স্বীকৃত। তারপরেও যক্ষ্মা এখনও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটা হুমকি হিসেবেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, এ দেশে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছে। তাই এখানে দিবসটি পালনের গুরুত্ব অপরিসীম।

যক্ষ্মা একটি সংক্রামক রোগ। ‘সাম্প্রতিক সময়ে যক্ষ্মার সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা কমে এসেছে। ১৯৯০ সালের পর যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ ভাগ কমে এসেছে। দ্রুত যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার কারণে যক্ষ্মার প্রকোপ কমে আসছে। তারপরেও এখনো যক্ষ্মা সারা বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১১ সালে সারা বিশ্বে ৮৭ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। মারা যায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে ৯৫ ভাগ মৃত্যু হয়েছে গরীব ও মধ্য আয়ের দেশে। ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি যক্ষ্মা। একই বছর (২০১১) সারা বিশ্বে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় পাঁচ লাখ শিশু। এর মধ্যে মারা যায় ৬৪ হাজার। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় তিন লাখ ৬২ হাজার। এর মধ্যে মারা গেছে ৭২ হাজার। সে হিসেবে দিনে মারা গেছে ২০০ জন। ২০১৭ সালে প্রায় এক কোটি মানুষ যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ মৃত্যুবরন করেছে। প্রায় দশ লাখ শিশু যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

সুতরাং যক্ষ্মা আমাদের জন্য এখনও চিন্তার বিষয়। সব মিলিয়ে যক্ষ্মা বিষয়ে আমাদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক খবর বেরিয়ে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিচালিত জরিপে। সেটা হল- সারা বিশ্বে সর্বাধিক যক্ষ্মা আক্রান্ত ২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। রোগের চিকিৎসা রয়েছে। সরকারীভাবেও বিনামূল্যে পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তারপরেও একমাত্র সচেতনতার অভাবে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

যক্ষ্মা দিবসে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এ রোগের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে আরো সচেতন করে তোলা এবং প্রতিটি চিকিৎসা পদ্ধতিকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ বর্তমানে করোনা ভাইরাস নিয়ে যেভাবে সারা বিশ্বে এক আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর কারণ হল- সঠিক সিদ্ধান্তর অভাব ও সচেতনতার ঘাটতি।

যক্ষা শব্দটা এসেছে ‘রাজক্ষয়’ থেকে। ক্ষয় বলার কারণ- এতে রোগীরা খুব শীর্ণ হয়ে পড়েন। এর ইংরেজী শব্দ টিউবারকুলোসিস। এটি একটি বায়ু বাহিত সংক্রামক ব্যাধি। মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস (টিউবারকেল ব্যাসিলাস) নামের জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট রোগকে টিউবারকুলোসিস বলে। বিশ্বে যে দশটি রোগে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়; তার মধ্যে যক্ষা অন্যতম। যক্ষা একটি ভয়ানক রোগ। সাধারণ এন্টিবায়োটিক ওষুধে এ রোগের ব্যাকটেরিয়া উপর কার্যকরী নয়। এইডস রোগীর চেয়ে বেশি মানুষ মৃত্যবরণ করে যক্ষা রোগে।

যক্ষা অতি সাংঘাটিক প্রাণ নাশক ব্যাধি। এ রোগে আত্রান্ত হলে রোগী ফেকাশে, রক্তশূন্য, দুর্বল, বক্ষ সরু, কাজে কর্ম অনিহা, প্রায়ই কাশি লেগে থাকে। শরীর ক্ষয়, স্বর ভঙ্গ, বিকালে জ্বর, রাতে ঘাম, দিন দিন শরীরের ওজন কমে যায়, সকালে ও রাত্রে কাশি বৃদ্ধি। কাশির সাথে পুঁজের মত শ্লেষ্মা। ফুসফুস হতে উজ্জ্বল বর্ণ রক্ত আসা। যক্ষ্মা সবচেয়ে বেশী দেখা যায় ফুসফুসে। পিতা-মাতার এ রোগ থাকলে সন্তানদেরও এ রোগ হতে পারে ।

টিউবার কুলোসিস এর প্রকারভেদ: একিউট টিউবার কুলোসিস- এটা মানুষকে হঠাৎ আক্রমণ করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি অতি দ্রুত জীর্ণ শীর্ণ হয়ে যায়। নিউমোনিক থাইসিস- এতে সাধারণত: ফুসফুস আক্রান্ত হয় এবং নিউমোনিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। হেমোরেজিক থাইসিস- ফুসফুস দিয়ে রক্ত উঠে ও মুখ দিয়ে নির্গত হয়। ফাইব্রয়েড থাইসিস- নিউমোনিয়া, প্লুরিসি প্রভৃতি রোগের পুরাতন অবস্থায় এটা সৃষ্টি হয়। স্ক্রুফুলা থাইসিস- গন্ডমালা রোগ হতে এটা সৃষ্টি হয়। ল্যারিনজিয়াল থাইসিস- রোগীর কণ্ঠনালীতে গুটিকা হয়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়।

টিউবারকুলোসিসের কারণ ও উপসর্গ- মাইকো ব্যাকটেরিয়াম টিউবার কুলোসিস নামের জীবাণুর সংক্রমণই এর মুল কারণ। দেহের প্রতিরোধ শক্তি কমে গেলেই এরা রোগ সৃষ্টি করার সুযোগ পায়। অনিয়মিত আহার, পুষ্টিকর খাদ্য ও ভিটিামিন যুক্ত খাদ্যের অভাব, শৃংখলাবিহিন জীবন যাপনের ফলে এ রোগ সৃষ্টি হয়। নোংরা পরিবেশ, স্যাঁত স্যেঁতে, আলোবাতাস হীন পরিবেশ

উপসর্গ- সাধারণত তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, কাশির সাথে কফ এবং মাঝে মাঝে রক্ত বের হওয়া, ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি ফুসফুসের যক্ষার প্রধান উপসর্গ।

জটিল উপসর্গসমূহ- যক্ষ্মার সঙ্গে প্লুরিসির লক্ষণ দেখা দিতে পারে। জীবাণুর আক্রমণে প্লরাতে ফুটা হয়ে যায়, প্লুরায় পুঁজ হয়। আন্ত্রিক যক্ষ্মার সৃষ্টি হতে পারে। দেহের বিভিন্ন স্থানে টিউবারকল দেখা যায়। দেহ জীর্ণ শীর্ণ, দুর্বল, মস্তিস্ক ঝিল্লীর প্রদাহ, মুখ দিয়া রক্ত উঠা, অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দেয়। বুকের রোগ হতে হাত, পা, পেট, পায়ু, কিডনী, ব্রেন প্রভৃতি আক্রান্ত হতে পারে। পায়ুতে ফিসটুলা বা ভগন্দর হয়।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা- রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্র যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে গিয়া রোগ নির্ণয় করতে হবে। যক্ষ্মা রোগ নিশ্চিত হলে রোগীকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে। তা সম্ভব না হলে বাড়ীতে একটা পৃথক কামরায় রোগীকে স্বতন্ত্র ভাবে রেখে অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের ম্যধ্যমে চিকিৎসা করতে হবে। রোগীর জন্য পৃথক আসবাবপত্র, থালাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও থানাবাসন অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। রোগী যেখানে সেখানে কফ, থুথু, শ্লেষ্মা ফেলবে না। একটি পিকদানীতে রোগীর কফ, থুথু সংগ্রহ করতে হবে এবং বিশোধন ওষুধ দিয়ে বিশোধন করে দূরে কোথাও পুঁতে ফেলতে হবে। কলকারখানায় আইনের দ্বারা ধূলা ও ধোঁয়া নিবারণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ীর ভিতরে বা বাইরে কোথাও ধুলা জমতে দেওয়া যাবে না। বাড়ীতে মাছি, তেলাপোকা, পিঁপড়ার উপদ্রব কমাতে হবে। রোগীর ঘরে প্রচুর আলো বাতাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এমন জায়গায় বাড়ী, ঘর নির্মাণ করতে হবে, যেখানে সব সময় প্রচুর আলোবাতাস পাওয়া যায়। নিয়মিত টাটকা ও পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া উচিত। রাত্রি জাগা ও অতিরিক্ত পরিশ্রম বর্জন করতে হবে।

হোমিও প্রতিবিধান- রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা হয়। তাই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর রোগের সব লক্ষণ নির্বাচন করতে পারলে আল্লাহর রহমতে হোমিওতে যক্ষা রোগ চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। অভিজ্ঞ চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে যক্ষা রোগীর জন্য যে সব মেডিসিন ব্যবহার করে থাকেন, একোনাইট, বেলেডোনা, ব্রায়োনিয়া, রাসটক্স, টিউবারকিউলিনাম, ক্যালি আয়োড, ষ্ট্যানাম, একালিফা ইন্ডিকা, ফসফরাস, ক্যালি আয়োড, আর্সেনিক এলবাম, কার্বোভেজ, ইপিকাক, সালফারসহ আরো অনেক ওষুধ লক্ষণের উপর আসতে পারে। তাই যক্ষা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে অভিজ্ঞ হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

লেখক: কো-চেয়ারম্যান-হোমিওবিজ্ঞান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ