বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ১০:০৮ অপরাহ্ন

মেয়েটিকে হুট করে রথ যাত্রার অনুষ্ঠানে স্বামী সন্তানসহ এভাবে দেখে ফেলব, কল্পনাও করিনি

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ২০৭ Time View

দশম শ্রেণিতে প্রথম ভালোলাগা মেয়েটিকে হুট করে রথ যাত্রার অনুষ্ঠানে স্বামী-সন্তানসহ এভাবে দেখে ফেলব, কল্পনাও করিনি। অনেক দূরে ছিল। কথা বলতে যেয়েও অনেক লোকের ভীড়ে সুযোগ হয়ে উঠেনি। তাড়াহুড়ো করে বোধহয় অনুষ্ঠান থেকে চলে যাচ্ছিল। যতক্ষণ না আড়াল হচ্ছে, দাঁড়িয়ে চলে যাওয়াটা দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম, সেই স্কুলের সময়গুলোর কথা।

আমাদের ক্লাসে প্রায় সময় মেয়েটি মেয়েদের সারির মাঝখানে বসত, আর আমি প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বেঞ্চে। প্রায় সময় ওর দিকে তাকিয়েই থাকতাম। তাকিয়ে থাকাতেও ভালো লাগত।চেহেরা এতোটা মাধুর্য্যময় ছিল, ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। দেখতে ফর্সা। কথা বলতো খুব ছোট বাচ্চা মেয়ের মতো।

পড়াশোনায় অতোটা ভালো ছিল না, আবার অতিরিক্ত খারাপ ছিল, তাও না। মোটামোটি পর্যায়ের ছিলো। বিভিন্ন ধরনের কথা বলে প্রচুর রাগাতাম। খুব বেশি রাগ করতো তাও না। মিশুক স্বভাবের ছিলো। এমনিতে হলেও গিয়ে কথা বলতাম। বন্ধুরা তো একেকটা বাঁদর ছিলো, আমাকে ছাড়তো না। ওরা জানত, আমি মেয়েটাকে খুব পছন্দ করি। সেটা নিয়ে আমাকে নানা কথা বলত। আমিও রাগ করতাম না। সত্য কথা বলতে কি, বন্ধুরা যখন মেয়েটাকে নিয়ে কিছু বলত, ভালোই লাগত।

স্কুলে আসলে তো দেখা হত। তারপরও যে দিন বন্ধ থাকত, ওই দিনও দেখার জন্য মনটা কেমন জানি ছটফট করত। অদ্ভূত ভালোলাগা বলতে হয়। বন্ধুরা মিলে বুদ্ধি ভাগাভাগি করতাম।কীভাবে দেখা যায়। যেমনি ভাবনা, তেমনি কাজ।দেখা হয়ে যেত।

এক পলক দেখার জন্য স্কুলবন্ধুরা বন্ধের দিন প্রায় সময়, মিথ্যা বায়না ধরে মেয়েটির ঠাম্মার কাছে কাশির ওষুধের জন্য যেতাম। হঠাৎ কোনো কোনো দিন দেখতাম, আবার কোন কোনো দিন দেখা নাও হতো। কেন আসলাম জিজ্ঞেস করলে, ঠাম্মাই বলে দিতো, আমার কাছে এসেছে। কাঁশির ওষুধের হাদিয়া ছিল সম্ভবত দশ টাকা। ওষুধগুলো মেয়েটির বাড়ি থেকে বের হলেই পুকুরের মাঝখানে ছুঁড়ে মারতাম, আর সবাই মিলে হাসতাম।

ফিরবার পথে বন্ধুরা বিষয়টা নিয়ে অনেক মজা করত। ওদের বলতামও। মেয়েটিকে সত্যিই আমার খুব ভালো লাগে। তোরা বিষয়টাকে পজেটিভলি দেখ। বন্ধুরা খুব হেল্পফুল ছিলো।আবদার করলে কোনো দিন না করতো না, উৎসাহ দিতো। তাই বন্ধুদের কাছে বিষয়টা নিয়ে বেশি বেশি বলতামও। বন্ধুরা কোন দিনই খারাপ পরামর্শ দেয়নি। বড় জোর বলতো, মেয়েটাকে বলে দিলে তো হয়।

প্রচন্ড ভালো লাগত মেয়েটাকে। ক্লাসেও অনেক বিরক্ত করতাম। আমাদের সময়ে বিরক্তটা আজকালকার মতো নয়। একে অপরের প্রতি যথেষ্ট সম্মান ছিল। বিরক্ত বলতে যেমন কাগজ ছুড়ে মারা, বোর্ডে নাম লিখে, আমি লিখি নাই বলা আর কত ধরনের শিশুসূলভ দুষ্টুমি করতাম, ঠিক মনে নেই।

এভাবে ক্লাসে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সময়গুলো অতিবাহিত করতাম। খুব খারাপ লাগত, যখন ছুটির ঘন্টা বেজে উঠতো। ক্লাস এইট অব্দি ছুটির ঘন্টাটা খুব মধুর ছিল, কিন্তু ক্লাস নাইনে উঠার পর থেকে মেয়েটারে ভালোলাগার সাথে সাথে কেমন জানি ছুটির ঘন্টাটাও মধুর হতে শুরু করল।

একদিন তো বলেও দিয়েছি, তোমাকে আমার প্রচন্ড ভালো লাগে। ক্লাসে ভালো ছাত্র ছিলাম বিধায়, সেই সুবাধে উত্তর দিল, দেখ, তোমাকে আমার ভাইয়ের মতো জানতাম! যখন থেকে ভাইয়ের মতো জানত বলল, ঠিক তখন থেকে মেয়েটারে বিরক্ত করা বন্ধ করে দিলাম। আর বিরক্ত করতাম না। রাগাতামও না।

একটি মেয়ে যখন আমাকে ভাইই ভাবে, সে ক্ষেত্রে বিরক্ত করার করার কোন কারণ দেখিনি।বলতে গেলে, ওর সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিলাম। সম্মান নিয়ে থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম, যা এখন অব্ধি অনুভব করি। সে ভুলে গেলেও, আমার কিছু যায় আসে না। সে যখন কান্নাজড়িত কন্ঠে ভাই সম্বোধন করে, ওকে নিয়ে এভাবে দুষ্টুমি না করার জন্য অনুরোধ করল, আমি আর ওকে সেভাবে দুষ্টুমি বলি, আর বিরক্তই বলি, সবকিছু বন্ধই করে দিলাম।

খুব দুষ্টু মন ছিলো। অবশ্য কোন দিন দুষ্টুমি করে ক্ষতি করার কথা কল্পনাও করিনি। স্কুল বয়সে ভালো লাগাটাই সবচেয়ে বড় ছিলো। আগ বাড়িয়ে জোর করে কিছু করার কথা কল্পনায়ও ছিল না। এখন বুঝতে পারছি, কেন তাকে জোর করিনি। কারণ, সে মুহুর্তে আমার তাকে ভালোলাগত, যেটা ভালোবাসা ছিলো না। সেই বয়সটাতে ভালোলাগাটা বেশি হয়, ভালবাসা তখন বুঝা যায় না।

মেয়েটি টেস্টে ফেল করার পর আর স্কুলে আসেনি। মাঝখানে মেয়েটির বাড়ির কয়েকজন বান্ধবী থেকে শুনেছিলাম, বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী প্রবাসী। আর কোন খবর নিইনি। শুধু ভালোলাগাটা ছিলো, চোখের সামনে যতদিন ছিলো, হয়তো ততোদিন আকর্ষণটা ছিল। যখনই চোখের আড়াল হলো, সেভাবে আর মনে পড়ছে না।

Share This Post

আরও পড়ুন