ঢাকারবিবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মানুষ যতই আপন হোক না কেন; প্রত্যেকেই স্বার্থের নিগড়ে বাধা

নুরুন্নবী নুর
নভেম্বর ২১, ২০২০ ৩:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নুরুন্নবী নুর: ‘কাঁচের দেয়াল’, চলচ্চিত্রের মানসপুত্র জহির রায়হানের মুক্তিযুদ্ধ পূর্বে নির্মিত চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির মুক্তির কাল ১৮ জানুয়ারি, ১৯৬৩ আর রীল টাইম ৯১ মিনিট ১৬ সেকেন্ড। ‘কাঁচের দেয়াল’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি। এ চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- ‘মানুষ যতই আপন হোক না কেন, প্রত্যেকেই স্বার্থের নিগড়ে বাধা। স্বার্থ ছাড়া মানুষ একপাও সামনের দিকে এগোয় না। স্বার্থের উপর ভিত্তি করে মানুষ তার আচরণকে পরিচালিত করে। অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই, তা কিন্তু না! আপন হতে সম্পর্ক লাগে না, বিবেকটা একটু শিক্ষিত হলেই মানুষ অন্যের জন্য এমনিতেই আপন হয়ে উঠে। তখন সেই অচেনা মানুষের হাত ধরে বহুদূর নিঃসন্দেহে অজানা পথে পাড়ি দেয়া যায়।’

কাহিনী সংক্ষেপ: ‘অসহায় এক তরুণী মামার বাড়িতে লালিত পালিত। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা হয়ে যায় বাউন্ডুলে। মামার পরিবারে মেয়েটির লাঞ্চনা গঞ্চনার শেষ নেই। তবে এক মামা (মামির ভাই) ও মামাতো ভাই (ভালাবাসে) তাকে আলাদা চোখে দেখে। মেয়েটি হঠাৎ লটারীতে প্রচুর টাকা পেয়ে যায়। এ সময় মামার পরিবারে তার আদর যত্নও বেড়ে যায়। কিছু দিন পরেই সংবাদ আসে যে, লটারি মিথ্যে। মেয়েটির ভাগ্যে আবার দুর্ভোগ নেমে আসে। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ করে এবং বাড়ি থেকে কাঁচের দেয়াল ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়ে।’

স্বার্থপর মানুষ সবখানে পরিত্যাজ্য। প্রতিটি সম্পর্কই প্রকৃতপক্ষে কাঁচের দেয়ালের মতো। খুবই ঠুনকো। স্বার্থে মোড়ানো সম্পর্ক যতই আপনত্বের নিগড়ে বাধা থাকুক না কেন, সময়ের দ্বার প্রান্তে এসে মুখোশ উন্মোচিত হবেই। সম্পর্ক হবে স্বার্থহীন, যেখানে কোন উপরি পাওনা থাকবে না, থাকবে একরাশ বিশ্বাস ও ভালোবাসা।

কাঁচের দেয়াল এমনই একটি চলচ্চিত্র, যেটা মানুষের জীবনযাত্রাকে অধিক অর্থবহ করার জন্য সঠিক শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় সুন্দরভাবে ব্যক্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার, এছাড়াও আত্মনির্ভরশীল হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা। কালজয়ী এ সব চলচ্চিত্র আমাদের মাঝে যতদিন ধরে থাকবে, আমরা ততদিন নতুন পথের সন্ধানে পথ খুঁজব।

মামা চরিত্রে খাঁন আতাউর রহমান অসাধারণ অভিনয় করেছেন। অসাধারণ বলার কারণ, অভিনয়ে কোনো ভাঁড়ামি দেখি না। বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি, তাঁর চরিত্র নিঁখুতভাবে ফুটে উঠে। কাঁচের দেয়ালে সে অধিক মনুষত্ববোধ সম্পন্ন একজন মামার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সুমিতা দেবী মামার ভাগ্নে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, একজন মা-হারা মেয়ে, মামাদের কাছে আশ্রিত। বরাবরের ন্যায় সুমিতা দেবী অভিনয় দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়। আনোয়ার হোসেন, আমার প্রিয় একজন অভিনেতা। সুমিতার মামাতো ভাই চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দারুণ গুণী অভিনেতা, এছাড়াও মামা-মামী চরিত্রগুলোর অভিনয়ও ভালো ছিলো। চলচ্চিত্রে যাঁরা অভিনয়ে সংযুক্ত ছিলো, তাঁরা প্রত্যেকে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

প্রযুক্তি দুষ্প্রাপ্যতার যুগে ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্র অনেক ভালো গল্পের একটি চলচ্চিত্র। জহির রায়হান সুন্দরভাবে গল্পের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন, তবে সাউন্ডে একটু সমস্যা ছিলো। একটা শো শো শব্দ হুইসপারিং সংলাপগুলো শুনতে অস্পষ্ট। ভালোভাবে শুনতে পায়নি। শেষে হেডফোন লাগিয়ে শুনতে হয়েছে, তবে গল্পের ধারা এমনি, কি বলতে চাইছে, তা অনেকটা বুঝা যায়।

‘কাঁচের দেয়াল’ সংগীত ও আবহসংগীত খুব ভালো। সঠিক জায়গায়, সঠিক আবহসংগীতের প্রয়োগ করা হয়েছে। শো শো শব্দটা না হলে, শুনতে আরও মধুর লাগত। ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রের গীত, কণ্ঠ ও সংগীতে ছিলেন খান আতাউর রহমান। ‘শ্যামল বরণ মেয়েটি’ এই চলচ্চিত্রের একটি জনপ্রিয় গান।

লিটল সিনে সার্কেলের দ্বিতীয় নিবেদন, এফডিসি স্টুডিওতে নির্মিত ও রসায়নাগার পরিস্ফুটিত, জহির রায়হান রচিত ‘কাঁচের দেয়াল’, চিত্রগ্রহণে আফজাল চৌধুরী, সম্পাদনায় এনামুল হক, শিল্প নির্দেশনায় হাসান আলী এবং চিত্রনাট্য,পরিচালনায় ছিলেন জহির রায়হান।

লেখক:
তরুণ শিল্প সমালোচক

Facebook Comments Box