সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ০৬:৩০ অপরাহ্ন

মানবিক সমাজের জন্য থেরাপিউটিক থিয়েটার: প্রেক্ষিত করোনা পরিস্থিতি

মোস্তফা কামাল যাত্রা
  • প্রকাশ : রবিবার, ৪ জুলাই, ২০২১
  • ৪৩৪ Time View
মোস্তফা কামাল যাত্রা

মোস্তফা কামাল যাত্রা: স্বাস্থ্যবান মানব আত্মাই পারে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। যার পূর্বশর্ত হচ্ছে- এমন এক সমাজ বাস্তবতা, যেখানে প্রতিটি মানুষ পারস্পরিক সহনশীলতার মধ্য দিয়ে ভোগ করতে সমর্থ হবে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত সব মানবাধিকার। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে সেই প্রশ্নের প্রত্যাশিত নিবাস সুদূর পরাহত। তবে স্বপ্নের সেই পৃথিবী গড়ে তুলতে দুনিয়াময় চলছে নানামুখী প্রচেষ্টা। বিশেষত শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশে দেশে নেওয়া হচ্ছে বহুমুখী উদ্যোগ।

মন ও মননের সু-সামঞ্জস্যতা আনয়নে এবং চাপমুক্ত মানস গঠনে চিকিৎসা শাস্ত্র বিজ্ঞান করছে বহুবিধ গবেষণা। মনোবিশ্লেষক জেকব লেভি মোরেনো চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই পথ পরিক্রমায় নাট্য বিজ্ঞানের ক্রিয়াত্মক কলাকৌশলের সংযোজন ঘটিয়েছেন। উদ্ভাবন করেছেন এমন এক মনোচিকিৎসা বা প্রতিবিধানমূলক তথা থেরাপিউটিক নাট্য শৈলীর, যা মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাখছে যুগান্তকারী উদাহরণ।

উন্নয়নমূলক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি বিনির্মাণে ‘স্বতঃস্ফুর্ততা বা ইমপ্রম্পটু’কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জেকব লেভি মোরেনো তাঁর অন্যতম রচনা থিয়েটার অফ স্পনট্যানেইটি (Theatre of Spontaneity) গ্রন্থে বলেছেন, ‘জীবন হল আত্মার নিশ্বাস, স্বতঃস্ফুর্ততা হল তার প্রশ্বাস, নিশ্বাসের মাধ্যমে বিষের (সংঘাতের) জন্ম হয়, প্রশ্বাসের মাধ্যমে তা হয় অবমুক্ত। এ পর্যায়ে স্বতঃস্ফুর্ততা অবচেতনকে (চেতনার সাহায্যে) নিরাপদে বেরোতে দেয়। বাইরের কোন হস্তক্ষেপ ছাড়াই সংগঠিত হয় এই প্রক্রিয়া। চিকিৎসা হিসাবে তার গুরুত্ব এখানেই।

মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীল সক্রিয়তা পুনঃ আবিষ্কারের প্রত্যয়ে মোরেনো নাট্যবিজ্ঞানের শক্তিকে ব্যবহারের যে প্রচেষ্টা ১৯২১ সালে ভিয়েনায় সূচনা করেছিলেন, তা বর্তমান সময়ে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে চর্চিত হচ্ছে সফল ও কার্যকরভাবে। এই প্রক্রিয়ার মূল কথা হলো ‘ক্যাথার্সিস।’

‘ক্যাথার্সিস’কে মোরেনো এরিষ্টটলীয় ধারণার বাইরে এসে যেভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন, তা হল- যাপিত জীবনে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মধ্যে অনুভূতির জন্ম হয়, সেই অনুভূতি যার কারণে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক উপলব্ধির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা অর্থাৎ জমাট বেধে অচল হয়ে যাওয়া সামাজিক কাঠামোগুলোকে করে তুলে সজীব। এক্ষেত্রে স্থবির হয়ে যাওয়া অনুভূতিকে জাগ্রত করতে ‘ক্যাথার্সিস’ রাখে প্রধানতম নিয়ামকের ভূমিকা।

মোরেনো ক্যাথার্সিসকে প্রধান তিনটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথমত হল- ‘অ্যাকশন ক্যাথার্সিস।’ এই পর্যায়ে চিকিৎসা প্রত্যাশী ব্যক্তি বা সমষ্টি মূল ভূমিকায় অভিনয় করার সময় তার বা তাদের সৃষ্ট অ্যাকশনের মাধ্যমে গভীর আত্মজ্ঞানে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। ফলে আবেগজনিত বাধাগুলো বিলীন হয়ে তার বা তাদের ভূমিকা গ্রহণ পূর্ববর্তী সময়ের মূল আচরণ ক্ষমতা পুনপ্রাপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে তার বা তাদের মধ্যে উন্মোচিত হয় সম্ভাবনাময় ও ইতিবাচক সক্রিয়তার।

দ্বিতীয়ত হল ‘দর্শক ক্যাথার্সিস।’ এই পর্যায়কে তিনি অবলোকনকারী বা অবলোকনকারীদের ক্যাথার্সিস হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ নাট্যক্রিয়া পর্যবেক্ষণকারী হিসাবে দর্শকও লাভ করেন এমন এক অভিজ্ঞতা যার মধ্য দিয়ে তিনি বা তারা অর্জন করে অভিন্ন প্রশান্তি।

তৃতীয়ত হল- ‘নান্দনিক ক্যাথার্সিস।’ এ পর্যায়ে থেরাপিউটিক থিয়েটার সেশনে অংশগ্রহণকারী প্রোটাগনিষ্ট বা মূল ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ এবং অবলোকনকারী পর্যবেক্ষক (দর্শক) সর্বপরী সেশন সঞ্চালকসহ পার্শ্ব চরিত্রে রূপদানকারী থিয়েটার থেরাপিষ্ট এবং অংশগ্রহণকারী অভ্যাগত দর্শক যে নান্দনিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেশন সময়কাল পূর্ণ করে, তা অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের সামগ্রিক সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটায়।

থেরাপিউটিক থিয়েটার সেশনে পরিচালিত সাইকোড্রামা (ব্যক্তি পর্যায়ে) এবং সোসিওড্রামা (সামগ্রিক বা সামাজিক পর্যায়ে) থেকে অবহিত অতীত আনন্দ-বেদনার উপলব্ধী যে শিক্ষা দিয়ে থাকে, তা প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত ছিল সেটা বিবেচনায় আসলেই ক্যাথার্সিসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মাত্রা বিশ্লেষণ করা সম্ভবপর হয়।

অর্থাৎ এখানে ভূমিকা গ্রহণ ও দৃশ্যের আন্তঃপ্রক্রিয়ায় সমন্বিত অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি বা সমষ্টির প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির হিসাব কষা হয়। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একমুখী আত্মউপলব্দী বা বিশ্বাস বা সমন্বিত মুক্তির পথ কথা গড়ে উঠবে ‘থেরাপিউটিক সমাজ।’

থেরাপিউটিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলে মানবিক ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা তখনি সম্ভব হবে, যখন আন্ত:ব্যক্তিক ও আন্ত:সামাজিক সম্পর্কগুলো সন্তোষজনক পর্যায়ে উপনীত হবে। যার মাধ্যমে জমাট বাঁধা সম্পর্কের কাঠামোগুলো উপনীত হবে এমন এক স্তরে যেখানে পরিশুদ্ধ হবে ব্যক্তিগত, দলীয় বা সামাজিক ক্যাথার্সিস। মোরেনো বিশ্বাস করতেন চিকিৎসা এবং সামাজিক সক্রিয়তার আন্ত:প্রক্রিয়াগত সম্ভাবনাগুলো সীমাহীন। তার অনুশীলন যত বেশি করা যাবে, সমাজ হবে তত বেশি মানবিক।

থিয়েটার থেরাপিতে সৃষ্ট সামি রিয়েলিটি (Sami Reality) বা সারপ্লাস রিয়েলিটি (Surplus Reality) অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের যে কোন সংঘাতময় অবস্থা ও অবস্থানকে উপস্থাপনের মাধ্যমে অভিনেতা, দর্শক ও সঞ্চালকগণের প্রচলিত ধ্যান ধারণার স্তরকে ইতিবাচক স্তরে উপনীত করে- উন্মেষ ঘটায় এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যে দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে স্বতস্ফুর্ত ও সৃজনশীল মানব আত্মার। মূলত যা হল মোরেনোর উদ্ভাবিত স্বতস্ফুর্ততার চিকিৎসাগত প্রধান বৈশিষ্ট। যাকে তিনি একাত্মতার বিশুদ্ধীকরণ (Catharsis of Integration) অভিদায় অবিহিত করেছেন।

বিশ্বব্যাপী মানুষে মানুষে এমন এক আন্ত:সম্পর্ক প্রয়োজন, যার কারণে জাগতিক স্বার্থের (ব্যাক্তিক, সামাজিক, রাজনৈতিক) উর্দ্ধে উঠে মানুষ হয়ে উঠবে একান্ত ও এক ঈশ্বরবাদী। যার জন্য প্রয়োজন আত্মার পরিশুদ্ধি। মোরেনোর ভাষায় একাত্মতার সমাজ বা থেরাপিউটিক সমাজ হল- এমন, যে সমাজে প্রতিটি মানুষ মানবিক মর্যাদা নিয়ে চাপমুক্ত মানসে সুসংগঠিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক জীবনাচার অতিবাহিত করতে হবে সক্ষম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) কর্তৃক প্রদত্ত ২০০১ সালে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছিল, উন্নত বিশ্বের শতকরা ৫০ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে থাকে। যেখানে উন্নয়নশীল দেশে বসবাসকারী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্ যসেবা প্রাপ্তির হার যে হতাশাব্যঞ্জক হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল।

২০০৮ সালে সেই সুপারিশগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) প্রতিবেদক উল্লেখ করেছেন, স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব ও অর্থ বরাদ্দ না থাকা হচ্ছে অন্যতম কারণ। দীর্ঘ ২০ বছর পরও যদি দাতা সংস্থাদের সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম না হয়, তবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে বিপর্যস্ত।

আসুন যে যার অবস্থান থেকে সচেষ্ট হই প্রতিষ্ঠা করতে তেমন এক থেরাপিউটিক সমাজ ব্যবস্থা যেখানে বিশ্ব নামের গ্রামে সব বাসিন্দা সু-সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমৃত্যু বেঁচে থাকবে। উদ্যোগী হই বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২১ এর প্রতিপাদ্য মেন্টাল হেলথ ইন এন আনইকুয়াল ওলাল্র্ড’কে কার্যকর করতে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্ যসেবা প্রাপ্তি মানসিকভাবে বিপর্যস্তদের শুধু অধিকারই নয়; মানবাধিকারও বটে।

মহামারী করোনা উত্তর মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় এবং করোনার নেতিবাচক প্রভাব হিসাবে বর্ণিত বিপর্যয় ঢেউ হিসাবে চিহ্নিত (মহামারী > মন্দা > অভাব > অরাজকতা) সাইকেল প্রত্যাশিত মানবিক তথা থেরাপিউটিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা হিসাবে কাজ করবে। কারণ উল্লেখিত ঢেউ চতুষ্টয় (Pandemic -> Recession -> Poverty -> Disorder) আসে পর্যায়ক্রমে কিন্তু তাদের নেতিবাচক প্রভাব থাকে চলমান। অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে নেতিবাচক প্রভাবগুলো মানবিক সমাজের কাঠামোকে করে ক্ষতিগ্রস্ত। আর সমাজের নিয়ামক শক্তি হিসাবে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে অমানবিকতার উন্মেষ। ফলে সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে হয় চুরমার। তাই মনোবিশ্লেষক নাট্যক্রিয়ার অনুশীলনের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনাই কেবল পারে, উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে দিতে পারে পরিত্রাণ। মানবিক সমাজ তথা থেরাপিউটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার মানসে মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞানের নিয়মিত চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে সামাজিক অরাকতার হার কমানোর উদ্যোগ এখন সময়ের প্রয়োজন।

আশা করছি, সামগ্রীক বিপর্যয়ের চিত্র বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারক মহল এই ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন মানবিক কারণে।

লেখক: নির্বাহি পরিচালক, উৎস

Share This Post

আরও পড়ুন