শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৯:১১ পূর্বাহ্ন

মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৬৯ এ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সভায় বক্তব্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন ইনি

মোহাম্মদ আলী / ১৮৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০

তাঁর পরিবারেরও রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ইতিহাস। তিনি স্কুল ও কলেজ জীবনে প্রগতিশীল ধারার সমর্থক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে যে জনসভা হয়েছিল তাতে তিনি উপস্থিত ছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওই জনসভায় বক্তব্য রেখে তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তাঁর প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চর্চা ও প্রতিপালনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার অভিপ্রায় শিশুকাল থেকেই।

তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম নারী উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার, যিনি একাধারে একজন কথা সাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও গবেষকও।

জন্ম ১৯৫৬ সালে কক্সবাজারে। তাঁর পিতা রাজনীতিবিদ মরহুম আফসার কামাল চৌধুরী এবং মা বেগম লুৎফুনহরার কামাল। ড. শিরীণ আখতারের স্বামী অবসর প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা মেজর মো. লতিফুল আলম চৌধুরী। তিনি এক ছেলে এবং এক মেয়ের জননী।

অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার হলেন চবির ১৮তম ও প্রথম নারী উপাচার্য। ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ তাকে চবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন।

সেশনজট ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে চেষ্টা করে যাচ্ছেন শিরীণ আখতার। নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দূর করতেও ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। এর আগে তিনি চবির উপ-উপাচার্য হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিরীণ আখতার কক্সবাজার সরকারি গার্লস্ স্কুল থেকে ১৯৭৩ সালে এসএসসি, চট্টগ্রাম সরকারি গার্লস্ কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এইচএসসি, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স), ১৯৮১ সালে একই বিভাগ থেকে এমএ সম্পন্ন করেন।

১৯৯১ সালে তিনি ‘বাংলাদেশের তিনজন ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান, ওয়ালিউল্লাহ, আবু ইসহাক’ অভিসন্দর্ভের উপর ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যাল পিএইচডি. ডিগ্রী অর্জন করেন। শিরীণ আখতার চট্টগ্রাম এনায়েত বাজার মহিলা কলেজে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত প্রভাষক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি চবির বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সহকারী অধ্যাপক,২০০২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০০৬ সালের ২৫ জানুয়ারি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

তিনি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সার্চ কমিটির একমাত্র নারী সদস্য। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত চবি বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের (হলুদ দল) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালার সাথে অনেক বছর ধরে কাজের মাধ্যমে যুক্ত আছেন। তিনি বাংলা একাডেমি ঢাকা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কলকাতা ভারত, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব ও হীরণ লাইব্রেরি কলকাতা ভারতের আজীবন সদস্য।

তিনি বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘কোচবিহার অনাসৃষ্টি’, পশ্চিমবঙ্গ ভারত, কবিতা বিষয়ক পত্রিকা ‘বাংলা’, ঢাকা বাংলাদেশ, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকী ‘লোক বাংলা’, ঢাকা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ হেরিটেজ রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা বাংলাদেশের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি গবেষণা পত্রিকা চবি বাংলা বিভাগের ‘পান্ডুলিপি’ ও কলা অনুষদের ‘জার্নাল’ এর সদস্য।

শিরীণ আখতারের উল্লেখযোগ্য গবেষণামূলক গ্রন্থগুলো হলো বাংলাদেশের তিনজন উপন্যাসিক (বাংলা একাডেমি) ১মপ্রথম সংস্করণ-১৯৯১, দ্বিতীয় সংস্করণ- ২০১০; যুগবাণী ও নজরুল (নজরুল ইনষ্টিটিউট) – ২০০৩; সেনোবিয়া রবীন্দ্রনাথ ও হিমেনেথ – ২০০৪; চির উন্নত শির (চট্টগ্রাম নজরুল জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত)- ২০১০; শৈলবালা ঘোষ জায়ার উপন্যাস শেখ আন্দু-২০১৫।

তার উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে স্বাতী নক্ষত্রের আলো- প্রথম প্রকাশ – ১৯৯২; মৎস্য কন্যা- ২০১৬; যুদ্ধজীবন -২০১৭; রোহিঙ্গা-২০১৯।

ছোট গল্পের মধ্যে রয়েছে পরিব্রজ্যা (ছোটদের গল্প)- ২০০৪; ছোটকার টোটকা গল্প – ২০০৪

তার প্রাপ্তির খাতায় রয়েছে একাধিক পুরষ্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো অমর একুশে পদক (গবেষণা), চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ২০১৯; দেশ ‘শ্রেষ্ঠ পান্ডুলিপি ’ পুরষ্কার- ২০১৮ (ঢাকা); চট্টগ্রাম সমিতি কর্তৃক সম্মাননা-১৯৯০; ‘সন্দীপনা’, আর্ন্তজাতিক সাহিত্য শিল্প সংগঠন কর্তৃক পুরষ্কার ২০১১; উৎস কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদান, ২০০৬; কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমি পুরষ্কার, ২০১৬; ‘‘আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন সোসাইটি” কলকাতা ‘ স্বর্ণপদক’ – ২০১৮; ‘‘ইউনেস্কো পুরষ্কার”, ২০১৮; ‘‘চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাব সম্মাননা পুরষ্কার”-২০১৭; জোরারিয়ানালা স্কুল, কক্সবাজার কর্তৃক পুরষ্কার, ২০১৮; চট্টগ্রাম সমিতি পুরষ্কার, ২০১৬; কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমি পুরষ্কার ২০১৭; ‘‘ইউনেস্কো ক্লাব সম্মাননা”, চট্টগ্রাম জেলা, ২০১৯; কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান অতিথি সম্মাননা, ২০১৯; চট্টগ্রাম বিভাগীয় লায়ন ইনগোরাল সিরোমনি ‘কিনোট স্পিকার’ হিসেবে পুরষ্কার ২০১০; নজরুল জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদ কর্তৃক ‘চট্টগ্রাম একুশে পদক ২০১০।

শিরীণ আখতার নারী শিক্ষায় বিশেষ অবদান, নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য রোকেয়া দিবস উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রবর্তিত ‘বেগম রোকেয়া পদক ২০২০’ গ্রহণ করেন গত ৯ ডিসেম্বর।

নারী যোগাযোগ কেন্দ্র চট্টগ্রাম মহানগর ও ইউনাইট থিয়েটার ফর সোশাল অ্যাকশন (উৎস) এ মহান ব্যক্তিকে গত শনিবার (১৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহহমান হলে অনু্ষ্ঠান করে সংবর্ধনা দেয়।

ওই অনুষ্ঠানে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে রোকেয়া পদক প্রদান করায় আমি বেগম রোকেয়া ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে একই সূত্রে আবদ্ধ হয়েছি। এই একই সূত্রে গাঁথা পড়ায় আমার উপর দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। আমি যেন বেগম রোকেয়ার সেই স্বপ্নকে সত্যি করতে পারি, নারীর শিক্ষা, নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে পারি।’

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিরীণ আখতারের
যে অবদান, তা অব্যাহত থাকবে- এ প্রত্যাশা সবার।

তথ্য সূত্র: নারী যোগাযোগ কেন্দ্র চট্টগ্রাম মহানগর ও উৎস

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ