রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:২২ পূর্বাহ্ন

মনোচিকিৎসা: চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার এক স্বর্গ রাজ্য বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল যাত্রা
  • প্রকাশ : বুধবার, ১৯ মে, ২০২১
  • ৪১৩ Time View
মোস্তফা কামাল যাত্রা

মোস্তফা কামাল যাত্রা: দৈনিক প্রথম আলোতে গত ১২ মে ‘জিনের আসর এবং মানসিক চিকিৎসা’ শীর্ষক ছাপাকৃত উপ সম্পাদকীয়টিতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের মনোস্বাস্থ্য সেবা খাতের দৈন্য দশাকে পর্যালোচনার পাশাপাশি কিছু সুপারিশ প্রস্তাবনা আকারে উপস্থাপনা করার জন্য লেখক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেনকে ধন্যবাদ।

মনোস্বাস্থ্য সেবায় শুধুমাত্র তার উল্লেখিত ২৬০ জন মনোচিকিৎসকই বাংলাদেশে সেবা প্রদান করেন এমন নয়। তার বাইরে রয়েছেন ওষুধবিহীন পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরণের সাইকোথেরাপিস্টগণ।

প্রথমোক্ত ২৬০ জন মূলত: নগর কেন্দ্রীক ওধুধি মনোচিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। যাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক দেশের বাইরে অবস্থান করেন। কয়েক জন দেহ ত্যাগ করেছেন। অর্ধশত জন বার্ধক্যজনীত কারণে অবসরে আছেন। আর বাকিরা নগরভিত্তিক ব্যাক্তগত চেম্বার পরিচালনা করেন। সে ক্ষেত্রে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সব সুযোগ সুবিধা দিয়ে নিয়োগ দিতে চাইলেও সরকার জনবল নিশ্চিত করতে পারবে না।

দ্বিতীয়োক্ত মনোস্বাস্থ্য সেবা প্রদানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ডিগ্রিপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপিস্টগণের সংখ্যাও অপ্রতুল। আবার ওধুবিহীন কথা বলায় থেরাপিধর্মী এ চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে নেই ব্যপক জন সচেতনতা।

হাতে গোনা দ্বিতীয়োক্ত পেশজীবীগণে জন্যও বাংলাদেশে নেই যথা উপযুক্ত চাকুরীর সুযোগ। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য সংখ্যক কিছু একাডেমিক সাইকোথেরাপিস্ট সৃষ্টি হলেও তারা কর্মক্ষেত্রের জন্য দেশের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

অপর দিকে, রয়েছে অপচিকিৎসার দৌরাত্ব। ঝাড়-ফুক, কবিরাজী চিকিৎসার পাশাপাশি ইলেক্ট্রিক সক ও শিকল থেরাপি নামের অমানবিক নির্যাতন। তাই চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার এক স্বর্গ রাজ্যে পরিণত হয়েছে- বাংলাদেশের মনোচিকিৎসার চিত্র।

মানসিক সমস্যাগ্রস্থদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১৯১২ সালে ‘লুনাটিক এক্ট’ রহিত করে। ‘বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অধিকার আইন-২০১৮’ প্রণিত হলেও; তা ভূক্তভোগী মানুষ ও তাদের পরিবারের পক্ষে নেই।

ওই আইন মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী ছাড়া এ বিষয় সেবা প্রদানে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। তাই স্বাধীনতার পর কলেজ পর্যায় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী সম্পন্নকারীগণ মনোচিকিৎসা প্রদানে প্রতিবন্ধকতার শিকার এবং তাদের পাঠ্যক্রমও যুগ উপযোগী ও আধুনিক নয়।

হতাশাব্যাঞ্জক বিষয় হল- এমবিবিএস ডিগ্রী সম্পন্নকারী চিকিৎসকগণ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কোন শিক্ষা গ্রহণ করে না। কারণ তাদের সিলেবাসে মানসিক স্বাস্থ্য একটি ঐচ্ছিক বিষয়। আবার সাইকিয়াট্রিও পড়েন খুব কমই সংখ্যক শিক্ষার্থী। যার কারণে স্বাধীনতা উত্তর যে পরিসংখ্যান, তা হল- শুধুমাত্র ২৬০ জন!!!!

এমন একটি পরিস্থিতি বিবেচনায় উন্নত বিশ্বের মত সৃজনশীল কলাবিদ্যাধর্মী মনোচিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আইনী ভিত্তি দেওয়া আমাদের দেশেও জরুরী। ফ্রয়েডিয়ান পদ্ধতির বাইরে বিগত এক শতাব্দিতে বিশ্বে নানা ধরণের মনোচিকিৎসার পদ্ধতির প্রবর্তন হয়েছে এবং যাদের কার্যকারিতা ও উপযোগিতাও বিশ্বময় স্বীকৃত।

মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের মনোস্বাস্থ্য চিকিৎসা খাতকে সমৃদ্ধ করতে উন্নত বিশ্বের মডেল মোতাবেক অভিব্যাক্তিমূলক সৃজনশীল কলাবিদ্যা প্রধান মনোচিকিৎসা তথা ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’কে প্রাধান্য দিয়ে কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং আইনী বাধাগুলো দুর করতে সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের এগিয়ে আসতে হবে।

বিশেষ করে করোনা উত্তর পরিস্থিতিতে উদ্ভুত মনোস্বাস্থ্য বিপর্যয় প্রতিরোধে তার বিকল্প নেই। আশার কথা হল- বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরিচালিত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজী, সাইকোলজী ও থিয়েটার বিভাগগুলোর পাঠ্যক্রমে ইতোমধ্যে সাইকোড্রামা, থেরাপিউটিক থিয়েটার ও এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপির পাঠ্যক্রম অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।

আমাদের প্রত্যাশা এমবিবিএসের পাঠ্যক্রমে মনোস্বাস্থ্য বিষয় শিক্ষাক্রমকে অবশ্যই পাঠ্য বিষয় হিসাবে অন্তভর্‚ক্ত করা হবে এবং ওধুধবিহীন চিকিৎসা প্রক্রিয়াগুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হবে। তাহলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার স্তরেই মনোচিকিৎসার সুযোগ অবধারিত হবে এবং এমবিবিএস ডাক্তারগণ মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ রোগীকে রেফারেল চিকিৎসা সেবার আওতায় আনতে সক্ষম হবেন।

বর্তমান চিত্র হল- এমবিবিএস ডাক্তারগণ মনোসমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের ভুল ডায়গনস্টিক করেন এবং ভূল চিকিৎসাপত্র দিয়ে তাদের মনোস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরো বিষিয়ে তুলেন। এটা তাদের দোষ নয়, তাদের শিক্ষাক্রমের সীমাবদ্ধতা।

সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নীতি নির্ধারকগণ অনতিবিলম্বে এমবিবিএসের সিলেবাসে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার ওধুধী ও ওধুধ বিহীন উভয় প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভূক্ত করবেন এবং উন্নত বিশ্বের আদলে বিকল্প পদ্ধতিতে অর্থাৎ মনোচিকিৎসায় প্রয়োগকৃত সৃজনশীল অভিব্যাক্তিমূলক কর্মকৌশলগুলো অনুশীলনে দক্ষ জনবল সৃষ্টির জন্য নাট্যকলা, চিত্রকলা, সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগগুলোর পাঠ্যক্রমকে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র বিভিন্ন কলা-কৌশল গুরুত্ব দিয়ে পাঠ্যক্রমভূক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন।

মনোস্বাস্থ্য পরিচর্যায় সংস্কৃতিকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি আগামী বাজেটে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ রাখে- তাহলে খুব সহজেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, প্লেবেক থিয়েটার, লিভিং নিউজ পেপার থিয়েটার, ক্লাউন থেরাপি, কালার থেরাপি, আর্ট থেরাপি, মাইম থেরাপি, ডান্স থেরাপি ও মিউজিক থেরাপি বিষয়ক প্রশিক্ষণ আয়োজন করে রাখতে পারে অনবদ্ধ অবদান।

করোনা পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট মনোস্বাস্থ্য বিপর্যয় চিত্র পর্যালোচনা এবং মানুষের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা, বিষন্নতা, আত্মহনন আর আত্মহত্যার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে নাগরিক স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র বিদ্যায়তনিক পাঠ ও গণ প্রয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে মানবিক আচরণ করবেন বলে আমার বিনম্র প্রত্যাশা।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অতিথি শিক্ষক, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ কোর্সের সমন্বয়ক।

Share This Post

আরও পড়ুন