বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

বাংলার লোকসাহিত্যের জীবনাভিজ্ঞতাময় একটি রচনা ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে বিধৃত লোকজীবন’

নুরুন্নবী নুর / ১৪৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

বর্তমান বিশ্বে লোকসাহিত্য, সাহিত্যের অন্যতম আলোচনার নাম। লোকসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই কিছু মাটির মানুষের নাম উঠে আসে। যে মানুষগুলোর মধ্যে কোনো পুঁথিগত শিক্ষা নেই, আছে মূলকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য অত্যুৎ বাসনা। লোকসাহিত্য একটি স্মৃতিনির্ভর বিষয়, যা মানুষের মনের মধ্যে দীর্ঘ কাল ধরে লালিত হয়ে থাকে। লোকসাহিত্যের মধ্য দিয়ে সময়ের আবর্তনে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সুক্ষ্মতিসুক্ষ্ম বিষয়গুলো প্রকাশ পায়। যেখানে থাকে মানুষের সমাজে বেড়ে উঠার অতীত ইতিহাস, অর্থনীতি ও জীবনপ্রবাহ ইত্যাদি। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশে লোকসাহিত্যে ভরপুর। অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশেও রয়েছে কিছু লোকসাহিত্য।

বাঙালির প্রত্যেকটি অঞ্চলে লোকসাহিত্য বলার মতো করে আবিষ্কৃত না হলেও যে কটি প্রাচীন অঞ্চলে লোকসাহিত্যের সৃষ্টি ও বিকাশ লাভ করেছে, তার মধ্যে চট্টগ্রামের কথা না বললে নয়। চট্টগ্রামের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের মতো চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যও প্রাচুর্যে ভরপুর। বিশ্বব্যাপী উপভাষা, লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণে যে প্রচার ও আলোচনা চলছে তাতে চট্টগ্রামও সামিল হতে পারে।

বাংলার লোকসাহিত্যের জীবনাভিজ্ঞতাময় একটি রচনা ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে বিধৃত লোকজীবন’। লেখকের শৈশবকালীন লোকসাহিত্য নিয়ে যে ভাবনার উদয় হয়েছিলো, গ্রন্থটি রচনা করতে তা ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল। তার কাছের মানুষদের কাছ থেকে লোকসাহিত্যের উপাদান, উপকরণ সংগ্রহ করার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণপূর্বক অন্যান্য দেশি-বিদেশি সহায়ক বইয়ের সাহায্য নিয়েছেন, যা গ্রন্থটি অধিক তথ্যবহুল করে পাঠকের কাছে মূল্যবান করে তুলেছেন।

এ গ্রন্থে সাতটি অধ্যায়ের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। প্রথম অধ্যায়ে বিশ্বসাহিত্য সংগ্রহ ও চর্চার যে আয়োজন চলছে, তার পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায় হচ্ছে, বাংলা লোকসাহিত্যের ধারায় চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যের অবস্থান বিচার। তৃতীয় অধ্যায় চট্টগ্রামের লোকছড়ায় বিধৃত লোকজীবন। চতুর্থ অধ্যায়ে আছে চট্টগ্রামের লোকসংগীত ও লোককাহিনীতে বিধৃত লোকজীবন। পঞ্চম অধ্যায়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে বিধৃত লোকজীবন। ষষ্ঠ অধ্যায়ে চট্টগ্রামের প্রবাদবাক্যে বিধৃত লোকজীবন। সপ্তম অধ্যায় চট্টগ্রাম ধাঁধায় বিধৃত লোকজীবন।

‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে বিধৃত লোকজীবন’ গ্রন্থটি পাঠ করে লেখকের প্রতি অন্য রকম ভালোলাগা কাজ করছে। মানুষের মূল সম্পর্কে জানা, একটা সহজাত প্রবৃত্তিরই অংশ। লেখক যেহেতু চট্টগ্রামের একজন, সেহুতু এরূপ স্মৃতিনির্ভর রচনা লেখার জন্য, আমরা যারা নবীন পাঠক/শিল্পী, তাদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবেন। মানুষ আজকাল নিজের শিকড় নিয়ে ভাবেন না, পরদেশ নিয়ে পড়ে থাকেন। স্বার্থের কারণে নিজের শিকড় ভুলে অন্যের মূল খোঁজার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি জানেন না, মূল শিকড় তাঁর জন্মস্থান।

মাইকেলের মতো পরধনে মত্ত না হয়ে আমাদের মা, মাটি, মানুষ সম্পর্কে ভাবতে হবে, ভাবতে হবে নিজের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে কিভাবে উপস্থাপন করা যায়। অবশ্য মাইকেলও তাঁর ভুল ধরতে পেরে নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন। আমরা মনে করব, আমরা নিজেরা একেক জন জামাল নজরুল। লোভের বশবর্তী না হয়ে অন্যের গুণগান না করে, সামান্য প্রাপ্তি নিয়ে সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাহলেই সূর্যসেনের, প্রীতিলতার, ভাষা শহীদের, মুক্তিযোদ্ধাদের, সর্বোপরি শেখ মুজিবের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে আশা রাখি।

‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে বিধৃত লোকজীবন’ গ্রন্থের লেখক হলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দক্ষিণ মাদার্শা গ্রামের সন্তান ড. শফিউল আযম ডালিম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে অধ্যয়ন করেন। বর্তমানে তিনি এ বিভাগের সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়, তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কোন পাপ করিনি’। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সুখের পথে এক পা’ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। স্বকীয়তায় ও ভিন্নধর্মী রোমান্টিকতায় নির্মাণ করেন এক অপরূপ প্রেমের কাব্য ‘নোবেল অস্কার তুমি’ (১৯৯৫)। রম্য রচনায়ও তিনি সিদ্ধ হস্ত, তার প্রমাণ ‘অরাজনীতি'( ১৯৯৪) গ্রন্থটি। কলকাতা থেকে তাঁর প্রকাশিত গবেষণামূলক গ্রন্থ হলো ‘ দুই বাংলার উপন্যাস প্রেক্ষিত দুর্ভিক্ষ’।

বলাকা প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে বিধৃত লোকজীবন’ বইটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ২০১৬ সালে অমর একুশে বইমেলায়। লেখক নিজেই বইটির স্বত্বাধিকারী। প্রচ্ছদে ছিলেন কাজল, বইটির গায়ের মূল্য ২০০ টাকা। লেখক শফিউল আযম ডালিম বইটি উৎসর্গ করেছেন তার কন্যা ফাইরিন আযম ফারহা ও পুত্র দাউদ আযম সিমরাতকে।

লেখক: প্রাক্তন ছাত্র, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

add

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বাংলার লোকসাহিত্যের জীবনাভিজ্ঞতাময় একটি রচনা ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে বিধৃত লোকজীবন’”

  1. Shaon Farid says:

    লেখাটি পড়ে খুবই ভালো লাগলো। আমাদের সবার প্রিয় ডালিম স্যারের সব বই সংগ্রহে থাকলেও এই বইটির সম্পর্কে তথ্য জানা ছিলনা। বইটি দ্রুতই সংগ্রহ করার আশা রাখি। গ্রন্থটি সম্পর্কে প্রাণবন্ত আলোচনা করে তথ্যটি জানানোর জন্য জনাব নুরুন্নবী নুর’কে ধন্যবাদ। ডালিম স্যারের জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ