রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:১৮ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে প্রচারিত হাসির ধারাবাহিকগুলোর মধ্যে ‘বহুব্রীহি’ সবার উপরেই থাকবে

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১
  • ২৩০ Time View

নুরুন্নবী নুর: কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি কালজয়ী সৃষ্টি ‘বহুব্রীহি’ উপন্যাস। অবশ্য, উপন্যাস না বলে টিভি নাটক বলাটা বেশি সমীচীন হবে। কারণ, তাঁর, এ একটি নাটকই পরবর্তী উপন্যাসে রূপ দেন। ২৬ পর্ব বিশিষ্ট ‘বহুব্রীহি’ ধারাবাহিক নাটকটি, তাঁর অসংখ্য সৃষ্টিশীল কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি প্রযোজনা করেছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)

ধারাবাহিক নাটকে হুমায়ূন আহমেদের তেমন আগ্রহ না থাকলেও ১৯৮৮ সালে আবারো ধারাবাহিক নাটক রচনায় হাত দেন তিনি। এবারের নাটকে পরিচালক ছিলেন নওয়াজীশ আলী খান। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবার একটি হাসির নাটক বানানো হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরোদস্তুর হাসির নাটকের দুই পর্ব লিখে নিয়ে যান হুমায়ূন আহমেদ, নাম দেন নীরস গল্প। কিন্ত বেশ কিছু পরিবর্তন এনে অবশেষে সেই নাটকের নাম দেওয়া হলো বহুব্রীহি।

এইসব দিনরাত্রির মতো বহুব্রীহির গল্পের কেন্দ্র বিন্দুও ছিল একটি পরিবার। তবে এইসব দিনরাত্রির পরিবারকে দেখলে সবার নিজের পরিবারের কথা মনে পড়লেও বহুব্রীহি দেখে সে রকমটা মনে হওয়ার অবকাশ লেশমাত্রই ছিল। বহুব্রীহির পরিবারে সব পুরুষ চরিত্র আধা-পাগল ধরনের, কিন্তু নারীরা সুস্থ ও স্বাভাবিক।

পরিবারের প্রধান ব্যক্তি সোবহান সাহেব সমাজের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে খুবই চিন্তিত, সমস্যার সমাধান নিয়ে সোবহান সাহেবের বিভিন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমেই গল্প এগিয়ে যেতে থাকে। সোবহান সাহেবের পরিবারে স্ত্রী ও দুই কন্যা ছাড়া ফরিদ নামে তার এক শ্যালক রয়েছে, কিছুটা পাগলাটে চরিত্রের ফরিদ মামার হাস্যকর কিছু কাণ্ড গল্পের গতি বাড়িয়েছে। সেই পরিবারের বাইরে ছোট মেয়ে মিলির প্রেমিকের চরিত্রে মনসুর নামের একজন ডাক্তার ছিলেন, যিনি কিছুটা বোকা ও নার্ভাস প্রকৃতির। এছাড়া সেই বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে দুই সন্তান নিয়ে বিপত্নীক যুবক আনিস এসে উপস্থিত হন, যিনি প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ও যুক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ।

পুরোদস্তুর হাসির নাটক হলেও সমাজের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বহুব্রীহি নাটকে ছিল। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে তুই রাজাকার এর মতো কালজয়ী সংলাপ বহুব্রীহি নাটকেই দেখানো হয়েছিল। আজকালকার যুগে হাসির নাটক দেখলে মনে হয় কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু বহুব্রীহিতে সাধারণ সংলাপ একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমেই খুব স্বাভাবিক হাসির উপলক্ষ্য এনে দিয়েছিল। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে যতগুলো হাসির ধারাবাহিক প্রচারিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বহুব্রীহি সবার উপরেই থাকবে।’

‘বহুব্রীহি’ নাটকের চিত্রগ্রহণ বেশ সাবলীল। এটি ‘এইসব দিনরাত্রি’র চিত্রগ্রহণের চেয়ে বেশ নান্দনিক। সুনিপূণ চিত্রগ্রহণে নাটকটি দর্শকের কাছে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। লেখক হুমায়ূন আহমেদ নাটকটির চিত্রগ্রহণটা মাথায় নিয়ে শ্যুট করেছেন। নাটকটির লিখিত কোনকিছু ছিল না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমার নাটক এবং সিনেমার গল্পটা আগে লেখি। সেখান থেকে চিত্রনাট্য তৈরি করে নাটক বা সিনেমা বানাই। একমাত্র ব্যতিক্রম বহুব্রীহি। আগে নাটক বানিয়ে সেখান থেকে উপন্যাস লেখা।’

‘বহুব্রীহি’ নাটকের সম্পাদনার কাজটিও অসাধারণ হয়েছে। মাথায় নিয়ে ঘুরা গল্পটাকে সম্পাদক খুব গুরুত্বের সাথে জোড়া লাগিয়েছেন। কোনো প্রকার ভাড়ামো ফুটেজের লেশমাত্র ছিল না। সে সময়ে দেশের অবস্থা ও মুক্তিযুদ্ধের নানা স্পর্শকাতর বিষয় চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি বলিয়েছেন। সম্পাদনার কাজটি নিঁখুত না হলে, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে আনা অসম্ভব ছিল।

সংগীত ও আবহসংগীতের যে সংমিশ্রণ, তা ‘বহুব্রীহি’ নাটককে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। রবীন্দ্রসংগীত ও দেশাত্ববোধক গান ব্যবহার করে নাটকটিকে অন্য একটি মাত্রায় রূপ দিয়েছেন। নাটকের গল্পকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করতে সংগীত ও আবহসংগীতের যৌক্তিক ব্যবহার, সব দর্শককে মুগ্ধ করেছে। সূচনা ও আবহসংগীতে ছিলেন খোন্দকার নুরুল আলম ও সেলিম আশরাফ।

‘বহুব্রীহি’ নাটকের সংলাপগুলো বেশ হাস্যোদ্দীপক ও হৃদয়গ্রাহী। নাটকটি সব সংলাপে, ছোট ছোট অনেক অন্তর্নিহিত বার্তা দর্শককে বলে দেয়। সংলাপগুলোতে লেখক হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিদর্শন ও তাঁর গভীর মনস্তত্ত্ব ফুটে উঠে। বিশেষ করে আনিস, সোবহান সাহেবের সংলাপগুলো আমার কাছে খুবই শিক্ষণীয় মনে হয়েছে। নাটকটির নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়েছেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। নাটকের কয়েকটি জনপ্রিয় সংলাপ হল-
বহিস্কার হও!
আপনি হলেন গিয়া বটবৃক্ষ।
তুই রাজাকার!

নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আবুল হায়াত, আলেয়া ফেরদৌসি, আলী যাকের, লাকী ইনাম, আবুল খায়ের, আসাদুজ্জামান নূর, আফজাল হোসেন, লুৎফুন নাহার লতা, আফজাল শরীফ, শান্তা ইসলাম, মাহমুদা খাতুন, নাহিদ জামান, দীপা ইসলাম, নাজমুল হুদা, রেহনুমা তারান্নুম, তোরসা প্রমুখ শক্তিমান অভিনেতারা।

এছাড়াও আরো নাম ভূমিকায় ছিলেন মো. মহসিন, ইমদাদুল হক, ডলি, মনুশীল, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, আল ইমাম, রায়হান আনসারী, উদয়ন বিকাশ বড়ুয়া, মো. জাকির হোসেন, মো. সেলিম, নজরুল ইসলাম খোকন, মঈন উদ্দিন আহমেদ, শামীমা মঈন, নাশাত ফারহানা মঈন, তিন কড়ি ব্যান্ড, কেরামত মওলা, মঞ্জু চৌধুরী, ওয়াহিদুল ইসলাম, আব্দুস সালাম, সুমনা, জামিলুর রহমান শাখা, রানু দাস, সুমন, রিমা, রিনা, মানোয়ার হোসেন, অহিগুল খান, শেখ আব্দুল মান্নান, মতিউর রহমান, সাইদ, রিপন, সেলিম, নাদিম, বাচ্চু, মাহবুব, শিফাত, কাজী মাহফুজুল হক, মতিন রহমান-১, সৈয়দা লুৎফুন নেসা, সুরমা, ফয়জুন নেসা,আফজাল, অরবিন্দ শেখর পাণ্ডে, সুরুজ মিঞ্চা, শামসুদ্দীন, সুবল দত্ত, ওয়াসী উদ্দিন আনসার, সেলিনা জামান ডেইজি, কাজী সুলতানা জামান বীনা, মোঃ আলী, নওশের আলী, মানু বড়ুয়া, হাবিবুর রহমান জালাল, গোলাম হাবিবুর রহমান, গোলাম মোহাম্মদ, এসএম সাইদুর রহমান, ইব্রাহিম কবির, গোলাম ফারুক, অহিদুর রহমান খোকন, তাসনীম আসমা রহমান, উপল ও সান্তনা প্রমূখ।

সর্বশেষ বহুব্রীহি নাটকের রচনা ও চিত্রনাট্যে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ এবং প্রযোজনা করেন নওয়াজেশ আলী খান।

সূত্র:
১) বহুব্রীহি নাটক- হুমায়ূন আহমেদ
২) হুমায়ূন আহমেদের সেরা তিন ধারাবাহিক নাটক- নাজিম উদ্দিন নাহিদ

লেখক: তরুণ শিল্প সমালোচক, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

Share This Post

আরও পড়ুন