মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২, ০১:০৫ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের ‘লাইফলাইন’ চট্টগ্রাম আজো অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন ও শ্রীহীন নগরী

মো. মুজিব উল্ল্যাহ্ তুষার
  • প্রকাশ : বুধবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৩৮৫ Time View

প্রাচ্যের রাণী খ্যাত সমুদ্র ও পাহাড় বেষ্টিত নদী-মালিনী-বনানী কুন্তলা-বীর প্রসবিনী-চঞ্চলা -চট্টলা। দুই হাজার বছর পূর্বে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠার কথা রোমান, গ্রীক ও আরব নাবিক এবং ভৌগোলিকদের লেখা গ্রন্থে পাওয়া যায়।

ইংরেজ সিভিলিয়ান এএল ক্লে ১৮৬২-৬৩ এবং ১৮৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দে দুই দফায় চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। তিনি ‘লীডস্ ফ্রম ডাইরী ইন লোয়ার বেঙ্গল’ নামের তার রচিত গ্রন্থে চট্টগ্রামের অপরুপ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দেন।

চট্টগ্রামে বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে স্বাধীনতার পূর্বেও এখানে বেশ কিছু মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প গড়ে উঠে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পেপার মিল, অয়েল রিফাইনারি ও ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রি। কাঠের গুণগত মান ও নির্মাণ শ্রমিকদের নিপুণতার কারণে চট্টগ্রামের সরের জাহাজ বিশ্বের শীর্ষ স্থানে ছিল। তুরস্কের সুলতানগন আলোকজান্দ্রিয়ার পরিবর্তে চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজই বেশি নিয়ে যেতেন। বানিজ্য ও যুদ্ধ জাহাজ মিলিয়ে বছরে কমপক্ষে ২৫-৩০টি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো।জার্মান সরকার চট্টগ্রামের সরের জাহাজ ক্রয় করে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে। ডয়চল্যান্ড ফ্রিগেট নামের জাহাজটি আজও কালের সাক্ষী হিসেবে সংরক্ষিত আছে ব্রিমার্হাফেন (Breemerhafen) শিপ বিল্ডিং মিউজিয়ামে।

বাংলাদেশের ৯২ ভাগ আমদানি-রপ্তানির প্রধান নগরী হওয়া সত্বেও চট্টগ্রাম আজও অগোছালো, অপরিচ্ছন্ন ও শ্রীহীন নগরী। বিশ্ব মানের বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠা নগরীর পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসাবে চট্টগ্রামের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত চট্টগ্রামের পঞ্চান্ন ভাগ এলাকায় পানির লাইন থাকলেও পুরোটাতে পানি সরবরাহ নেই।অন্য দিকে, গণশৌচাগার নেই চট্টগ্রাম মহানগরে অন্তত ৫৭ ভাগ মানুষের জন্য।

চট্টগ্রাম বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক বলা হলেও মানের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। কয়েকটি উড়াল সেতু নির্মাণ করা হলেও জনদুর্ভোগ কমেনি বরং বেড়েছে।

সরকারী গুরুত্বপূর্ণ অফিস যেমন শিল্প, বানিজ্য, ব্যাংক-বীমা, আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, বিনিয়োগ, পর্যটন, রেল, ক্যামিকেলসহ বন্দর ও আভ্যন্তরীণ জাহাজ চলাচলের প্রধান কার্যালয় বা অধিদপ্তরসমুহ চট্টগ্রামে নেই। যার কারণে ব্যবসায়ী মহল ঢাকাতে স্হায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাই চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকান্ডে তারা অংশীদার হতে আগ্রহী নয়। এখানে হাইকোর্টের একটি স্থায়ী বেঞ্চের দাবি বহু দিনের। আজ পর্যন্ত তা পূর্ন হয়নি।

অবকাঠামোগত সমস্যার জন্য নাগরিক সুবিধা ঢাকার তুলনায় কম হওয়ার কারণে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাগণ সাপ্তাহিক ছুটিতে ঢাকা চলে যান। একই কারণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের চট্টগ্রামে খণ্ডকালীন অফিস করার কথাও উপেক্ষিত।

বন্দর নগরীকে বিশ্ব মানের নগরীতে উন্নীত করতে হলে যে কাজগুলি জরুরী ভিত্তিতে করা প্রয়োজন তার কিছু প্রস্তাবনা যেমন: যানবাহন খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন ও জনগণের ভোগান্তি নিরসনকল্পে বাস্তব সম্মত পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। উড়াল সেতুর জন্য যৌত্তিক স্থান নির্বাচনের পাশাপাশি ওই স্থানের বিদ্যমান রাস্তার সংস্কার, মেরামত ও প্রশস্তকরণ অপরিহার্য। বিদ্যমান তিনশত কিলোমিটার ফুটপাত পুনরুদ্ধার, রিক্সা চলাচলের পৃথক লেইন, লক্কর ঝক্কর পুরানো গাড়ী অপসারণ করে বহদ্দারহাট থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত আধুনিক বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা যায়। সড়কের আইল্যান্ড, সড়ক দ্বীপ সবুজায়ন ও সড়কের পার্শবর্তী দেয়ালে চমৎকার সব বাণী দিয়ে মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করা যেতে পারে।

আশার কথা, বর্তমানে তার কিছু বস্তাবায়ন আমরা দেখতে পাচ্ছি। রাস্তায় এলইডি লাইট স্থাপনের কারণে শহরের বহু এলাকা আলোকিত হয়েছে। তবে এতে জনআকাঙ্খার পুরোপুরি বাস্তবায়ন ঘটেনি।

একটি আদর্শ নগরী বলতে এমন শৃঙ্খলাপূর্ণ নিরাপদ ও মসৃণ সড়ক ব্যবস্থা থাকে, যেখানে ৪৫ মিনিটে নগর প্রদক্ষিণ আর ১৫ মিনিটে পার্কে যাওয়া সুযোগ থাকে। পর্যটন খাতের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিলে শহরের যানবাহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি, চিকিৎসা সেবা ব্যঙ্গালোরের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, জলাবদ্ধতার নিরসন, উন্নত ও পরিচ্ছন্ন সড়ক, ব্যাপক সবুজায়ন, স্বাস্থ্য সম্মত সর্বোপরি নিরাপদ পরিবেশের জন্য লড়তে হবে।

চট্টগ্রামবাসীর ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় হওয়ার এখনই সময়।

লেখক: সাংবাদিক, সংগঠক ও সমাজ কর্মী

Share This Post

আরও পড়ুন