বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ১২:১৩ অপরাহ্ন

বদিই হল সমাজের নির্লজ্জ্ব আবেগপ্রবণ চরিত্র: ‘কোথাও কেউ নেই’

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২১
  • ২৬৬ Time View

খুব কৌতূহল ছিল, ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটি দেখার। অবশেষে দেখে ফেললাম। নাটকটির রচনায় হুমায়ূন আহমেদ আর নির্দেশনায় ছিলেন বরকত উল্লাহ।

দুই দিন ধরে দশ পর্বের প্রায় দশ ঘন্টার নাটকটি দেখে আমি বিস্মিত, আবেগপ্রবণ হয়েছি। অনেকের কাছে শুনতাম ‘বাকের ভাই’ শব্দটি। কিন্তু সময়ের অভাবে সেই বাকের ভাইকে দেখার সুযোগ হয়নি। এবার সুযোগটা হাত ছাড়া করিনি।

নাটকটি দেখার পর থেকে শ্রদ্ধা বেড়ে গেল নির্দেশক, রচয়িতা ও অভিনেতাদের প্রতি।

প্রথমেই সেই কালজয়ী চরিত্রের কথা ‘বাকের ভাই’ সম্পর্কে বলি। অভিনেতা আসাদুজ্জামান নুরকে যতটুকু না সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে জানি, তার চাইতে বাকের ভাই হিসেবে লোকে মুখে নাম শুনেছি বেশি। বিশেষ করে আমার শিক্ষা জীবনের গুরুদের মুখে বেশি শুনেছি বলে আমার মনে পড়ে। নাটকটিতে অসাধারণ অভিনয় করেছেন এই গুণী অভিনেতা। একজন সাহসী, প্রেমিক, অন্যায়ের প্রতিবাদী, বন্ধু বৎসল, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মজার মানুষ, দয়ালু, বাস্তববাদী চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নির্ভুলভাবে। তাকে দেখলেই একটা প্রবাদের কথা মনে পড়ে, ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।

নাটকের আরেকটি কেন্দ্রীয় চরিত্র মিলি (সুবর্ণা মোস্তফা)। একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, চিন্তাশীল, সাহসী, বুদ্ধিমতী নারী চরিত্র। তার অভিনয় শৈলী পুরো নাটক জুড়ে প্রতীয়মান।প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানো নারীর অসাধারণ প্রতিভূ। চরিত্রটির প্রতিটি সংলাপে রয়েছে আলাদা মাধুর্য্য। যতই সামনের দিকে নাটকটির কাহিনী এগিয়ে যায়, ততই চরিত্রটি হয়ে উঠেছে সাবলীল। অনুপ্রেরণামূলক একটি চরিত্র বলা যায়। যে কোন পরিস্থিতিতে এতো সুন্দর করে নিজেকে উপস্থাপনা করা। সত্যিই চরিত্রটির রয়েছে আলাদা একটি বিশেষত্ব।

অন্য দিকে, অল্প সময়ের চরিত্র হুমায়ূন ফরিদীর অভিনয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতো সুন্দর গোছালো কথা কিভাবে বলেন তিনি, আমি সত্যিই অবাক হই। মনে হয়, হুমায়ূন ফরীদির মধ্যে একটা আধ্যাত্মিকতা আছে। ছোটবেলা থেকে এই অভিনেতাকে চরমভাবে শ্রদ্ধার সাথে অনুসরণ করতাম। এ নাটকে তার উকিল চরিত্রটিকে বুকে হাত দিয়ে সম্মান করার মত। উকিলদের প্রতি আমার সব সময় একটা বিতৃষ্ণা কাজ করত। কিন্তু নাটকটি দেখার পর থেকে একটি সম্মানের জায়গা তৈরি করে দিয়েছে নাট্যকার।

অন্য দিকে, ড. এনাম আহমেদ, যিনি দাদা চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাও মুখ ফুটে বলার মত। এতো দারুণ অভিনয় সত্যিই মাথা নত করার মত।

বদি (আব্দুল কাদের) চরিত্রটির একটু আলাপ করা যাক। চরিত্রটি প্রথমে খুবই দুর্দান্ত মনে হয়েছিল। যেটা নাটকের মূলত একটি কমেডি চরিত্র। কিন্তু শেষে মনে হল, এই বদিই হল সমাজের নির্লজ্জ্ব আবেগপ্রবণ চরিত্র। তার নিজের পরিবারের কথা ভেবে একজন নিরপরাধ মানুষকে অর্থাৎ বাকের ভাইকে ফাঁসির দিকে ঠেলে দিয়েছেন। ধিক্কার জানাই সে সব বদির মত মানুষরূপী কুত্তাগুলোর প্রতি, যারা নিজের সুখের জন্য অন্যের জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

নাটকে ফাঁসি অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডের বিষয়টি আমার ভাল লাগে নি। যেটা কিছুটা বলতে চেয়েছিল মিলি চরিত্রটি। কেননা অনেক সময় আইনের বেড়াজালে নিরপরাধ মানুষও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হয়। যদি মৃত্যুদন্ড না থাকে অন্তত পক্ষে নিরপরাধ মানুষটি বেঁচে থাকার স্বাদ পাবে।

এছাড়াও মাসুদ আলী খান, মোজাম্মেল হোসেন, লাকি ইনাম ম্যাম, মাসুদা শরফুদ্দিন, খায়রুল আলম সবুজ, শামসুজ্জামান খান, রাবিনা, সালেহ আহমেদ, তমালিকা কর্মকার, গোলাম সারোয়ার হারুন, বিজরি, সেলিনা মাহবুব তৃষ্ণা, হোসেন আরা পুতুল, শীলা আহমেদ, টিটু, লুৎফর আহমেদ জর্জ, আফসানা মিমি, মাহফুজ, শহিদুজ্জামান সেলিমসহ এবং অন্য চরিত্রগুলো তাদের সর্ব্বোচটা দিয়ে অভিনয় করেছেন।

সর্বশেষ, ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটি বাংলা নাটকের একটি অসাধারণ দলিল। সময়ের ব্যবধানে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। এর সাথে পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের মনুষত্বের। কিন্তু বাকের ভাইয়ে মত ভাল মনুষত্ববোধ সম্পন্ন মানুষের অভাব থেকেই যাচ্ছে।

রিভিউ দিয়েছেন নুরুন্নবী নুর, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Share This Post

আরও পড়ুন