বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২, ০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন

ফেসবুকে বাঙালির ভাষা চেতনা, মুজাক্কিরের রক্তে রক্তাক্ত একুশ

এনামুল হক নাবিদ
  • প্রকাশ : সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৪৪১ Time View
এনামুল হক নাবিদ

শহিদ মিনারে নেতা কর্মীদের বহর নিয়ে ফুল দেওয়া, তারপর ছবির পর্ব। অত:পর দেওয়া হয় ফেসবুকে আপলোড । তারপর লাইক, কমেন্টস ও শেয়ারে সরগরম নেতা, আমলা, পেশাজীবী ও সমাজসেবীদের টাইমলাইন। একাত্তরের কথা আপাতত পরে হোক।

একুশ নিয়ে বাঙালির ফেসবুকে চলছে একুশ চেতনা। বর্তমান অবস্থায় একুশ মানে হচ্ছে এ নিয়ে ফেসবুকীয় বাঙালির ভাষা চেতনা। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন পেশাগত কারণে উপজেলার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গিয়েছি। লক্ষ্য করলাম তরুণ-তরুণীদের মাথায় স্টিকার, গায়ে লাল সবুজের জামা, কি যে চেতনার ভাস্বর। সাথে ট্রাক ভর্তি সাউন্ড লাগিয়ে হিন্দী গানের উন্মাদ ডান্স।

এ হল আমাদের বাঙালিয়ানা। আসলে সত্যি বলতে চেতনা মানে আমরা বুঝি পোশাক-পরিচ্ছেদ, গান, আড্ডা- এগুলি। না হয় বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে যারা মায়ের ভাষা রক্ষা করেছে, বিশ্ব দরবারে ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে, মায়ের ভাষার জন্য আমরা কতটা আপোষহীন ছিলাম।

আর আজ সেই শহিদদের কথা বাদ দিয়ে উল্টো আমরা এমনি একটা দিনে প্রমাণ করতে চাচ্ছি, নিজেদেরকে বাঙালি হিসেবে আমরা কতটা চেতনা সম্পন্ন। তাঁদের চাওয়া পাওয়া কি আমাদের কাছে এ ছিল? আজ বাঙালিদের বাংলার কদর যদি জব্বার, রফিক, বরকতরা দেখতে পেত, তাহলে আমি হলফ করে বলতে পারি, তারা বলত এ হুজুগে বাঙালিদের কাছ থেকে বাংলাকে আরেক বার উদ্ধার করি।

ভাবতে অবাক লাগে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আমরা ভাষার নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিদের অস্বীকার করি। এমনকি জীবনের মায়া ত্যাগকারী এ ভাষা শহিদদের নিয়ে আমরা নোংরা রাজনীতি করি। না হয় শহীদদের বেদীতে ফুল দিতে গিয়ে ভিন্ন মতের লোকদের কেন অপমানের শিকার হতে হয়? ভাষার প্রাণ বলে যাদেরকে আমরা বুঝি, কবি সাহিত্যিকদের এ দেশে কেন লাঞ্চনার শিকার হতে হয়? কেন অর্থাভাবে তাদেরকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়? এদেশে কেন কবিরা মৃত্যুবরণ করার পর কবি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

একুশ আসলেই আমাদের নেতাদের বেশ বড় বড় ব্যানার দেখতে পাই। আর এ নেতাদের অপরাদের চিত্র যখন জাতির বিবেক সাংবাদিকরা গণমাধ্যমে তুলে ধরে জাতির কাছে তাদের কালো চেহারা প্রকাশ করে দেয়, তখনি এদেরকে রাতের অন্ধকারে চাপাতির আঘাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয়।

সম্প্রতি নোয়াখালীর ঘটনায় আমরা গণমাধ্যম কর্মীরা হারিয়েছি আমাদের ভাইকে আর বোরহান উদ্দীন মুজাক্কিরের মা হারিয়েছে নাড়িছেঁড়া ধনকে। দেখেছি সরকারি দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ঘাতকের বুলেট কিভাবে কেড়ে নিল আমার ভাইয়ের তাজা প্রাণ। যে ঘাতকদের বুলেট মোজাক্কির ভাইয়ের প্রাণ কেড়ে নিল, তাদের বিচার হবে কিনা জানি না। কারণ, পেশার খাতিরে নিজ বেড রুমে খুন হওয়া সাগর ও রুনির বিচারে যে নয়-ছয় হচ্ছে, আক্ষেপে সংবাদ কর্মীরা এখন তাদের ভুলে যাওয়া সম্বলিত স্টিকার ফেসবুকে লাগাচ্ছে!!

মুজাক্কির ভাইকে নিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক সাজেদ ভাই লিখেছেন, ‘এ পেশায় অনেক দূর যেতে চেয়েছিলেন বোরহান উদ্দিন মুজাক্কির। কিন্তু হায়! ঘাতকের বুলেট অকালেই শেষ করে দিল একটি জীবন, একটি স্বপ্ন। কাঁদতে আসে নি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’

একুশ আসলেই নেতাদের মুখে ভাষার চেতনায় মুখে খই ফুটে। অপর দিকে, তাদের নোংরা রাজনীতির কারণে আমার ভাই মুজাক্কিরের রক্তে একুশ ফের রক্তাক্ত হলো।

আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধের বীজ বপন হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। এ প্রেক্ষাপট হয়ত আজ আমাদের অনেক তরুণ প্রজন্মের কাছে অজানা। কারণ, আমাদের প্রয়োজনে আমরা ইতিহাসকে খন্ড-বিখন্ড করি। যে ভাষাকে কেন্দ্র করে আমরা ইতিহাসের অংশ, সে ভাষাকে আমরা আগলে রাখতে কতটা উদাশীন তা আজ বলার নয়। টকশোতে গলা ফাটায়, অপর দিকে, ভাষার আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের নাম মুখে নিতে আমাদের লজ্জায় মুখ কেটে যায়। কী পরিমাণ হিনমন্যতায় থেকে এসব টক শোবাজরা চেতনার ফেরিওয়ালা সেজে থাকে, বুঝার আর বাকী থাকে না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না এ ভাষাতেই আমাদের অস্তিত্ব। এ ভাষার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে আমাদের প্রথম পরিচয়। তা ভাষার মাসে দুঃখ নিয়ে বলতে হয়, এ ভাষা আমাদের অহংকার, এ ভাষাই আমাদের অস্তিত্ব। এ ভাষা হেলা-ফেলার জন্য নয়। কারণ, এ একুশ মানেই আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

পরিশেষে সবার নিকট একটি কথা বলি, যদি দায়িত্ব জ্ঞান কি আমরা জানতে পারতাম, তাহলে বাঙালি হিসেবে আমরা আরো উন্নত শিখরে আরোহন করতে পারতাম। আসলে সবকিছু চেতনা দিয়ে হয় না, থাকতে হয় হৃদয় নিংড়ানো এক টুকরো ভালোবাসা। ভাষার মাসে প্রিয় ভাষা শহীদ, ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারী সব ভাষা সৈনিকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের প্রিয় ভাই বোরহান উদ্দীন মুজাক্কিরের আত্মার শান্তি কামনা করছি। সেই সাথে নর ঘাতকদের বিচারের জোর দাবি জানাচ্ছি।

লেখক: সাংবাদিক, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম

Share This Post

আরও পড়ুন