বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০৮:৪৯ অপরাহ্ন

নান্দনিক সিআরবি এবং আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের গৌরব গাঁথা

আলীউর রহমান রোশাই
  • প্রকাশ : শনিবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২১
  • ৪৮৭ Time View

চট্টগ্রামের অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শন ঐতিহ্যবাহী সিআরবি ভবন। বৃটিশরা চট্টগ্রাম বন্দরের অপার সম্ভাবনা এবং পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম, সিলেট ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা আসামের জমি পাহাড়ে চা বাগান ও বাঁশ থেকে কাগজের সম্ভাবনা দেখে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করে পশ্চিম বঙ্গ থেকে পূর্ব বঙ্গকে ভাগ করে আসামের সাথে এক করেন। চট্টগ্রাম এবং আসামে অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা দেখে বৃটিশরা বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন। তখন চট্টগ্রামের সিআরবিকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে হেড কোয়ার্টার করা হয়।

সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিরাট এলাকাজুড়ে সিআরবির নান্দনিক ভবনসমূহ গড়ে তোলা হয়। ১৯১০ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধ হলেও সিআরবি পূর্ব বঙ্গ রেলওয়ের হেড কোয়ার্টার হিসেবে থেকে যায়।

মহাত্মা গান্ধীসহ বাঙালি নেতারা তখন বঙ্গভঙ্গকে রীতিমত একটা অপরাধ ভেবেছিল। চালাক বৃটিশ ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, আগামীতে এই চট্টগ্রাম ও আসাম হবে অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার । আজকে ১১৫ বছর পর এসে সেই কথা প্রমাণিত হচ্ছে, আসাম হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে সম্পদশালী প্রদেশ। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম। যদি বঙ্গভঙ্গ রদ না হতো, আজকে বাংলাদেশ হতো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী রাষ্ট্র।

চট্টগ্রাম শহরের অতি প্রাচীনতম স্থাপনার নাম সিআরবি। এর পূর্ণ রূপ হচ্ছে সেন্ট্রাল রেলওয়ে ভবন। কালজয়ী ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিআরবি ভবন চট্টগ্রাম। ঠিক তেমনি নাগরিক জীবনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে সন্নিহিত এলাকায় আঁকা-বাঁকা, সর্পিল রাস্তা উঁচু নিচু পাহাড় টিলা, বন-বনানী ছায়া সুনিবিড় এই বিরাট এলাকা অঘোষিত পর্যটন স্পট হিসেবে যুগ যুগ ধরে মানুষকে দিয়ে আসছে বিনোদনের আস্বাদন।

১৮৬২ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার তদানিন্তন পূর্ববঙ্গের দর্শনা থেকে জাগতি পর্যন্ত ৫৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে এতদ্বাঞ্চল রেলপথের গোড়াপত্তন করে।১৮৯২ সালের ১৬ নভেম্বর গেজেটমূলে ফেনী থেকে রেলওয়ে চট্টগ্রামের বটতলী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যই কেন্দ্রীয় রেল ভবন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন সুবিধাকে রেলওয়ের সাথে সমন্বিত করার প্রয়াসেই ১৮৯৯ সালে সিআরবি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সিআরবি লাগোয়া উত্তর টিলায় লোজ্জ ক্লান, দুই পাহাড়ের মাঝখানে গভীর খাদ, যার শেষ প্রান্তে বেরিয়েছে পশ্চিম প্রান্তের মূল রাস্তায় পেট্রোল পাম্পের পাশ দিয়ে যেখানে উঁচু বাঁধ দিয়ে তৈরি করা যাবে শত ফুট গভীরতার স্বচ্ছ সরোবর। চট্টগ্রামের সিআরবির সাত রাস্তার মোড় ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে। পাহাড় ঘেরা মনোরম পরিবেশে নির্মাণ করা হয়েছে শিরীষ তলাসহ বেশ কিছু নান্দনিক স্থাপনা। শিরীষ তলায় বসে জমিয়ে আড্ডা দেয়া যায়, মাঠে খেলা যায়। সাথে দেখবেন, মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম স্মৃতিফলক, তার পর নজরে আসবে ১৮৯৯ সালের তৈরি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের মডেল। ভবনের দক্ষিণ দিকে বিরাট আঙিনায় দায় সারা গোছের ফুলের বাগান দেখলে অব্যবস্থাপনার ছাপ ফুটে উঠবে।

সিআরবির পূর্ব দিকে রাস্তার পূর্ব পার্শ্বে রেলওয়ে হাসপাতাল অবস্থিত। এটা এক সময় ছিল ফিরিঙ্গি অফিসারদের ক্লাব, কর্মক্লান্ত কর্মকর্তারা কাজের বাইরের সময়টুকু এখানে আমোদ-প্রমাদ করে কাটাতেন, আড্ডা দিতেন, নিজ দেশে ফেলে আসা আত্মীয়স্বজনের গল্প করতেন। গেল চার-পাঁচ বছর ধরে সিআরবি পাহাড়ি জনপদের এ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশ ও পাহাড়ের তলদেশে বাঙালির সর্ববৃহৎ বৈশাখী উৎসব, বসন্ত উৎসব ও সাহাবুদ্দিনের বলী খেলায় লক্ষাধিক লোকের জমায়েত ঘটে। বলা যেতে পারে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামে সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র এই সিআরবি।

যাওয়ার উপযুক্ত সময়: সারা বছর যাওয়ার উপযুক্ত সময়। কিন্তু বিকালের টাইমের মানুষের ভিড় বেশি থাকে এবং পরিবেশটা খুব ভাল লাগবে।

কিভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে: বিআরটিসির বাসগুলো ঢাকা কমলাপুর টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছাড়ে। আর অন্যান্য এসি, ননএসি বাসগুলো ছাড়ে সায়দাবাদ বাস স্টেশন থেকে। আরামদায়ক এবং নির্ভর যোগ্য সার্ভিসগুলো হল এস আলম ও সৌদিয়া, গ্রীনলাইন, সিল্ক লাইন, সোহাগ, বাগদাদ এক্সপ্রেস, ইউনিক প্রভূতি। চট্টগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে আট কিলোমিটা দূরে অবস্থিত অপরূপা ফয়স লেক।

অন্য শহর থেকে: দেশের প্রায় সব কয়টি জেলার সাথে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। আপনি আপনার শহর থেকে নিজের পছন্দ মত বাসে এসে চট্টগ্রাম শহরের একে খানে নামবেন এবং সেখান থেকে সিএনজি বা রিক্সা যোগে চলে যাবেন ফয়স লেকে।

নদী পথে: বরিশাল, খুলনা পটুয়াখালী ইত্যাদি জেলার সাথে চট্টগ্রামের রয়েছে লঞ্চ/ইস্টিমার সার্ভিস। সুতরাং আপনি নদী পথেও চট্টগ্রাম আসতে পারেন।

রেলওয়ে: ঢাকা থেকে আশুগঞ্জ, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কুলিল্লা, চান্দপুর, ফেনী হয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ট্রেন সার্ভিস রয়েছে। তাছাড়া সিলেট থেকে ও ট্রেন সার্ভিস রয়েছে।

জিইসি মোড় থেকে থেকে সিএনজিচালিত বেবিটেক্সিতে ৮০-১০০ টাকা নিতে পারে। টাইগারপাস মোড় থেকে হাঁটলে পাঁচ মিনিটের পথ। এমএ আজিজ স্টেডিয়াম গেট থেকেও একই সময় লাগবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, পরিবেশ কর্মী

Share This Post

আরও পড়ুন