শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা তহবিলে এক কোটি টাকা অনুদান দিল চট্টগ্রাম চেম্বার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের ছুটি বাড়ল ৩০ জুন পর্যন্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম’র আইটি বিশেষজ্ঞ গ্রেফতার চট্টগ্রামে সাদার্ন ইউনিভার্সিটিতে দুই মাসব্যাপী আন্তঃবিভাগ বির্তক প্রতিযোগিতা শুরু নাভানাসহ সীতাকুণ্ডের সব কারখানায় ঈদুল আজহার আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দাবি পরিবেশ বিষয়ক গল্প : মন পড়ে রয় । নাজিম হোসেন শেখ পিএইচপি অটো মোবাইলসের তৈরি অ্যাম্বুলেন্স উপহার পেল চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সোতোকান কারাতে স্কুল চট্টগ্রামের কারাতে বেল্ট প্রতিযোগিতা সম্পন্ন চট্টগ্রামের পাহাড় অপরাজনীতি, অপেশাদার আমলাগিরির শিকার হাটহাজারী নাজিরহাট কলেজে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন
রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন

নাটক ‌এমা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া: ‘থিয়েটার অব এনার্কি’ ধারণার প্রতিধ্বনী

মোস্তফা কামাল যাত্রা / ২৯৮ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১

মোস্তফা কামাল যাত্রা: ৬০ এর দশকের প্রারম্ভে পেনসিলভেনিয়ার অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়ে ইতিহাসবিদ রিচার্ড ড্রেনোনের সাথে পরিচয় ঘটেছিল নাট্যকার হাওয়ার্ড জিনের। রিচার্ডের সাথে আলাপচারিত জিন প্রথম শুনেন এমা গোল্ডম্যানের নাম। জিনকে ড্রেনোন জানান যে, তিনি এমার জীবনী নিয়ে একটি জীবনীগ্রস্থ রচনা করেছিলেন। যার শিরোনাম ‘রিবিল ইন প্যারাডাইস’। মূলত: এমা আমেরিকার ইতিহাসের এক অন্যতম প্রধান নারী। যার রাজনৈতিক দর্শন হল এনার্কিজম। একজন বিস্ময়কর নারী হিসাবে, একজন এনার্কিস্ট হিসাবে তার সমকালে অনাবশ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও; আমেরিকার প্রচলিত ইতিহাসে তিনি অন্তর্ভূক্ত নন। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস চর্চায় এমা’র নাম উচ্চারিত না হওয়া বা সংরক্ষিত না থাকলেও সমাজ বিশ্লেষক হিসাবে বিশেষ করে রাজনৈতিক দর্শন এনার্কিজম আলোকপাত করতে গেলে এনার্কিস্ট এমাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই।

আমেরিকার ইতিহাসের অনিবার্য সত্য লুডলো হত্যাযজ্ঞ, লরেল টেক্সটাইল ধর্মঘট, হে মার্কেট ঘটনাক্রম এবং সমকালের অন্যতম রাজনৈতিক নেতৃত্ব মাদার জোনস, বিগ বিল হে ইউড, জন রিডের কর্মযজ্ঞ যেমন ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি, তেমনি এমা গোল্ডম্যানের জীবন ও দর্শন আমেরিকার প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক কারিকুলামেও স্থান পায়নি। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ বিপ্লবী, শ্রমিক নেতা, সমাজতন্ত্রী, এনার্কিস্টগন বরাবরই প্রচলিত ইতিহাসে অনউল্লেখিত থাকে। পাঠ্যক্রমে গুরুত্ব নিয়ে আলোকপাত হয় সমরনায়ক, শিল্পপতি আর রাষ্ট্র প্রধানদের জীবন ও জীবনাচার।গতানুগতিক অর্থডক্স রাজনৈতিক তত্ত্বের বিপরিতে এনার্কিজমের দর্শন বুঝতে হলে প্রয়োজন রাশিয়ান এনার্কিস্ট মিখাইল কুখালিন এবং পিটার ক্রমেটকিন রচিত প্রবন্ধ নিবন্ধের নিবিড় পঠন-পাঠন। প্রাসঙ্গিক আর অবশ্য পাঠ্য রচনা হল- ‘নো হয়ার এট হোম’ শিরোনামে আনা মারিয়া ড্রেনোন এবং রিচার্ড ড্রেনোনের যৌথ সৃজন পাঠ করা। এ গ্রন্থনাটিতে মূলত: আলেকজেন্ডার বার্কম্যান ও এমা গোল্ডম্যানের মধ্যে বিনিময় হওয়া চিঠিপত্রের সমাহার ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ স্থান পেয়েছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা থেকে নির্বাসিত হয়ে ইউরোপে আশ্রয় নেওয়া সময়কালে পরস্পরকে লেখা চিঠিপত্রের এ সংকলন এমা গোল্ডম্যানকে বুঝা বা উপলব্ধী করার জন্য এক বিরল দলীল। যা বিশ্ব সাহিত্যে অসামান্য পত্র সাহিত্য হিসাবে পরিগণিত।

এমা গোল্ডম্যানের আত্ম জীবনী “লিভিং মাই লাইফ” পাঠ না করলে একজন এনার্কিস্ট হিসাবে এমা’র জীবন ও রাজনৈতিক বিশ্বাসকে অনুধাবন করা কঠিন। “লিভিং মাই লাইফ” গ্রন্থে এমা’র বৈচিত্রময় জীবন ও জীবন দর্শনের নানা দিক যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি সমকালীন সমাজ বাস্তবতা ও আর্থ-মানসিক পরিস্থিতি চিত্রিত হয়েছে চমৎকারভাবে।

তৎকালীন রাশিয়ার অধিনস্থ লিথুনিয়ার কভনোতে এক দরিদ্র ইহুদি পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল। দারিদ্রতার কষাঘাতের দু:খময় স্মৃতি এবং কৈশোর বেলার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতার আবেগঘন বর্ণনার পাশাপাশি কোনিংসবার্গে বেড়াতে গিয়ে অপেরায় ভার্দির কনসার্ট উপভোগকালে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠার স্মৃতিচারণ করেছেন এমা সাবলিল ভাষায়। মিলনায়তনপূর্ণ দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে তার সেই বেদনা-বিধূর অনুভূতি প্রকৃতপক্ষে এমা’র অন্তর আত্মার এক মানবীয় দিক।

হাওয়ার্ড জিন রচিত ‘এমা’ নাটকের অনুবাদ করেছেন লিটল ম্যাগ ‘উঠান’র সম্পাদক মাজহার জীবন। তিনি ইতোমধ্যে সাহিত্য কর্মে, সৃজনে প্রকাশনা জগতে একটি নিজস্ব অবস্থান গড়ে তুলেছেন। নাটকটিতে রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্ব-পরিবারে এমা’র ইহুদি পরিবারের অভিবাসী হওয়ার সময়কাল থেকে তার জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত ঘটনাক্রম তথ্য-উপাত্ত্ব ব্যবহৃত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক এবং রোচেস্টার শহরে প্রাথমিক অবস্থায় তার পারিবারিক জীবন অতিবাহিত হয়েছিল। বদ মেজাজী পিতার অনুগ্রহ থেকে বাঁচার জন্য অল্প বয়সেই স্থানীয় এক যুবককে সে বিবাহ করে পিতার পরিবার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। যদিও সে জীবন সুখের ছিল না। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তাকে যোগ দিতে হয়েছিল কাজে। বাবার বিদ্দেশপূর্ণ আচরণ থেকে মুক্তি এবং স্বামীর অনুগ্রহের পাত্র না হয়ে থাকার মানসিকতা বালিকা এমা’র জীবনে উন্মেষ ঘটায় নতুন জীবনবোধ।

একজন পোশাক শ্রমিক হিসাবে কর্ম জীবন শুরুকারী এমা ১৭ বছর বয়সেই অবগত হয় ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরে আট ঘন্টা শ্রম ঘন্টার দাবিতে হওয়া শ্রমিক আন্দোলন এবং হে মার্কেট কেন্দ্রিক ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর ইতিবৃত্ত। রোচেস্টার শহরের যে ফ্যাক্টরীতে এমা কর্মরত ছিল; সেখানকার কর্ম অভিজ্ঞতা এবং মালিক ও মালিক পক্ষ কর্তৃক শ্রমীকদের উপর যে নির্যাতন চলমান ছিল; যা তাকে ক্ষুব্দ-বিক্ষুব্দ করে তুলেছিল। ফলে তার মন ও মানস গড়ে ওঠে একজন শ্রমজীবীর আত্ম-উপলোব্ধীর আলোকে।

হে মার্কেট আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের উপর ইন্টারন্যাশনাল হার্ভেস্টার কোম্পানির প্ররোচনায় পুলিশ কর্তৃক হওয়া নৃসংশতা এবং রহস্যজনক বোমা বিস্ফোরণে মৃত্যুবরণকারী পুলিশ ও শ্রমিকদের হত্যার দায় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে আদালতের মিথ্যা রায়কে আইনি ভিত্তি দিয়ে আটজন শ্রমিককে ফাঁশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এ আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টদের সমর্থনে ততকালীন এনার্কিস্টদের দ্বারা প্রচারিত “রিভেঞ্জ” নামের সার্কুলার বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল বলে বিচারক ও রাষ্ট্র পক্ষের অবস্থান যুবক এমা’র মানসপটে নতুন ক্ষতের জন্ম দেয়।

পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিগত জীবনের অস্থিরতা এবং পেশাগত জীবনের সংক্ষুদ্ধতা এমা গোল্ডম্যানের শ্রেণি চেতনা ও রাজনৈতিক মানস গঠনে রেখেছিল অগ্রগণ্য ভূমিকা। তিনি রোচেস্টার শহরে থাকা পরিবার পরিজন ছেড়ে চলে যান নিউ ইয়র্ক শহরে। পরিচিত হন কয়েকজন নবীন এনার্কিস্টের সাথে। যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আলেকজান্ডার বার্কম্যান সশা। সশার সাথে এমা’র প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কারণ সশা ছিলেন নতুন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে প্রত্যয়ি এক তরুণ। যে কিনা নিজেও আসেন আমেরিকায় একজন রাশিয়ান অভিবাসী হিসাবে। তরুন এ দুই এনার্কিস্ট (সশা ও এমা) এ সময়কালে এনার্কিজমের অন্যতম প্রচারক জার্মান সাংসদ বিপ্লবী জোহান মোস্টের সাথে পরিচিত হন। মোস্টের সাথে এমা এক সময় ব্যাক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। যা নিয়ে সশা এবং এমা’র মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল ব্যক্তিগত দূরত্ব। দ্বিমুখী ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে মোস্ট ও সশার সাথে ব্যক্তিগত টানাপোড়েন থাকলেও এনার্কিজম প্রমোশনে তারা সকলেই ছিলেন একাট্টা এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ। প্রবাসী শ্রমিকদের সংগঠিত করে এনার্কিজমের দীক্ষা দিতেন তারা। ম্যানহাটন শহরের একটি ফ্যাক্টরীতে চাকুরী নিয়ে এমা সেখানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের এনার্কিস্ট হিসাবে গড়ে তুলতে থাকেন।

হাওয়ার্ড জিন রচিত নাটকের সুচনা হয় ফ্যাক্টরীতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে কর্ম পরিবেশ ও কর্মকর্তাদের অমানবিক আচরণের প্রসঙ্গ নিয়ে কথপোকথনের মধ্য দিয়ে। যা নাট্য কাহিনীর সূত্রপাত ঘটায়। নাটক এগিয়ে চলে এমা’র কর্মময় জীবন ও ব্যক্তিগত বৈচিত্রময় চারিত্রিক নানা দিকের প্রেক্ষিতকে তুলে ধরার পরম্পরার ধারাবাহিকতায়।

১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম শহর হোমস্টিড এ ধর্মঘটি শ্রমিকদের আন্দোলনের তীব্রতাকে দমন করতে ধর্মঘট দমনে সমকালের অন্যতম এজেন্সি ফ্রিক পিস্কারটন ডিটেকটিভকে নিযুক্ত করা হয়। এন্ডু কার্নেগির স্টিল মিলের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত সেই শ্রমিক ধর্মঘটকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর গুলি বর্ষণ করা হলে সাতজন শ্রমিক নিহত হয়।

১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় ভয়ংকর অর্থনৈতিক মন্দা। শত শত শিশুরা এ মন্দায় না খেয়ে মারা যায়। আলোচ্য নাটকের কেন্দ্রিয় চরিত্র এমা গোল্ডম্যান এ সময়কালে সাধারণ মানুষকে মন্দার কার্যকারণ বিষয়ে সচেতন করতে সচেষ্ট ছিলেন। খাদ্য গুদাম লট করতে ভূক্তভোগী মানুষকে উৎসাহিত করতে এমা সভা-সমাবেশ এ বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। যা এনার্কিস্ট মুভমেন্টের ইতিহাসে ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন’ নামে স্বীকৃত। এ পর্যায়ে এনার্কিস্টগন সিদ্ধান্ত নেয় যে, মন্দার স্বীকার মানুষ ও ধর্মঘটি শ্রমিকদের উপর নিষ্ঠুর আচরণের নেপথ্যপুরুষ হেনরী ক্লে ফ্রিককে হত্যা করা হবে। এ প্রতিশোধমূলক হত্যা পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল যে কল-কারখানাগুলো নিরাপদ নয়। আতংক সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানান দেওয়া যে- কেউই বাঁচাতে পারবে না। এ হত্যায় সফল হলেও এনার্কিষ্ট আলেকজান্ডার বার্কম্যান সশা ধরা পড়ে এবং বিচারে তার ২২ বছরের সাজা হয়েছিল।

জেল জীবনের অভিজ্ঞতাকে নিয়ে সশা একটি ক্লাসিক কারাসাহিত্য রচনা করেন। যার শিরোনাম হল- ‘প্রিজন মেমোর’র অব এন এনার্কিস্ট’। সশা যখন জেলে তখন এমা শ্রমিক আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠকে পরিণত হয় এবং একজন এনার্কিস্ট হিসাবে বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচীতে বক্তৃতা দিয়ে নিজেকে একজন অন্যতম এনার্কিস্ট প্রধান বক্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি তার অপরাপর র‌্যাডিক্যাল বন্ধুদের মত মনে করতেন, হত্যা হল এনার্কিজমের একটি কৌশল। যদিও হত্যাকান্ড অযৌক্তিক তথাপিও হত্যাকারীর ক্ষোভের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকে। যা এনার্কিস্টদের বাধ্য করে সেই অমানবিক তথা অযৌক্তিক কান্ড ঘটাতে।

১৯০১ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্ট ইউলি যাম ম্যাককিনলেক সমকালিন এনার্কিস্ট লিওন ফ্লোগেজ যখন গুলি করে হত্যা করে; তখন পুলিশি অভিযানের তোপে আত্মগোপনে থাকা এনা অনেকের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং যৌন সম্পর্কে অভ্যস্থ হয়ে ওঠেন।

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্ডার সাশা যখন জেল থেকে মুক্তি পায় তখন তাদের সম্পর্ক পুন:রায় সুদৃঢ় হয় এবং তারা যৌথভাবে ‘মাদার আর্থ’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়। যা এনার্কিজমের স্বপক্ষে একটি তাত্ত্বিক প্রকাশনা হিসাবে সুখ্যাতি অর্জন করে।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে শিকাগোতে এনার্কিজমের উপর বক্তৃতা করতে গিয়ে এমা আবারো এক অসমবয়সী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ঊনত্রিশ বছর বয়সী কেতাদূরস্থ সু-পুরুষ বেন রেইটম্যানের নামের এক ডাক্তারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন ঊনচল্লিশ বছর বয়সী এমা। একজন পরাক্রমশালী এনার্কিস্ট এমা গোল্ডম্যান ও বেনের সাথে বিনিময়কৃত পত্রাবলী থেকে তার এ বহুগামিতা বা ব্যাবিচারী জীবনের বহুমাত্রিক তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দুজনের সখ্যতার পাশাপাশি বেন ছিলেন এনার অসংখ্য বক্তৃতার প্রধান আয়োজক ও সংগঠক। বিক্ষোভ সৃষ্টি আর জনগনকে সংগঠিত করার মাধ্যমে এনার্কিষ্ট আন্দোলনের ব্যাপ্তি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে এ প্রেমিক জুটি রেখেছিল অগ্রগন্য ভূমিকা।

আলোচ্য নাটকে বেন রেইটম্যান একটি অন্যতম প্রধান নাট্য চরিত্র হিসাবে যেমন দ্যুতি ছড়িয়েছে তেমনি নাট্য ঘটনাক্রমের অগ্রগমনে ছিল সক্রিয় ভূমিকা।

উল্লেখিত আলোচনাগুলো আয়োজন করা হত ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণার মধ্য দিয়ে। যার শিরোনাম থাকত ‘যদি মুক্তই না হই-তবে কিসের ভালোবাসা? কিংবা জন্ম নিয়ন্ত্রণ। কখনও বা ‘ভালবাসার সাথে বিবাহের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না’ কিংবা ‘দেশপ্রেম’। উল্লেখিত শিরোনামে বক্তৃতা আয়োজন করলেও প্রকৃত পক্ষে এনা ওই বক্তৃতাগুলোর আশ্রয়ে এনার্কিজমের প্রচার প্রসারে নিয়ত ছিলেন। যার কারণে তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন।

সরকারের আগ্রাসী দৃষ্টি এড়াতে কৌশলী এমা এ সময়কালে নাট্যকার স্ট্রিন্ডবার্গ, বার্নাড শ, আন্তন চেখভ কিংবা ইবসেনের নাটক নিয়ে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করেন। সমকালীন বিখ্যাত এসব নাট্যকার সৃষ্ট নাট্যচরিত্র ও নাট্যমূহুর্ত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এনার্কিজমের সুক্ষ ইঙ্গিত রেখেই তিনি তার বক্তৃতাবলী চালিয়ে যেতেন।

মূলত: পুলিশি আগ্রাসন এড়াতে এমা’র বক্তৃতার শিরোনাম নির্বাচন এবং বক্তৃতা প্রদানের সময় ইঙ্গিতময় বিশ্লেষণের মাধ্যমে এনার্কিজমের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি এনার্কিস্ট হয়ে মানবাধিকার রক্ষায় শ্রোতাদের উৎসাহিত করতে স্বনামখ্যাত নাট্যকারদের রচিত নাটকের বিষয়বস্তু ও চরিত্রগুলোর যে কৌশলী মূল্যায়ন করতেন। বক্তৃতার ইতিহাসে এমা’র সেই চিন্তা ও ভূমিকা এক বিষ্ময়কর ও মডেল বক্তৃতা কৌশল হিসাবে পরিগনিত হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

পুলিশ কর্তৃক তার অনুরূপ ১১টি বক্তৃতা সভা পন্ড করা হয়েছিল। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে এমাকে এক বক্তৃতা মঞ্চ থেকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে সান ফ্রান্সিসকোতে পাঁচ হাজার শ্রোতার সামনে দেশ প্রেমের উপর বক্তৃতা করছিলেন এমা। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে এলে উপস্থিত শ্রোতা ও দর্শকদের বাঁধার মুখে পুলিশকে বক্তৃতা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

মাজহার জীবন অনুদিত এমা নাটকের সমাপ্তি ঘটে এমন একটি দৃশ্যমূহুর্তের নাট্যায়নের মধ্য দিয়ে। ফেডারেল এজেন্ট ভর্তি মিলনায়তনের বক্তৃতা মঞ্চে এমা। হারলেম ক্যাসিনোতে অনুষ্ঠিত সেই সভাস্থলে দর্শক শ্রোতার উদ্দেশ্যে হঠাৎ পুলিশের ঘোষণা: “হল ছাড়ুন; এটা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আদেশ! যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন (এমা’র উদ্দেশ্যে)।”

নাট্য সাহিত্য এবং নাট্য উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এনার্কির স্বপক্ষে পান্ডুলিপি ও প্রয়োগের চর্চা ও অনুশীলনকে পর্যালোচনা করলে আমরা এনার্কিজম সম্পর্কে একটি নতুন সৃজনশীল মূল্যায়ন ব্যাখ্যা করতে স্বক্ষম হব। যার ব্যাপকতা ও ব্যাপ্তি এর সংশ্লেষণে এমন এক নাট্যধারার অনুসন্ধান সম্ভব; যাকে আমি ‘থিয়েটার অব এনার্কি হিসাবে অভিধা দিতে চাই।’ যে ধারার অন্যতম নিয়ামক সৃষ্টি ও সৃজন হিসাবে আলোচ্য নাটক ‘এমা’ বিশ্লেষকদের কাছে একটি বিশেষ পান্ডুলিপি হিসাবে চিহ্নিত হবে। এমন একটি বিশেষ নাটক অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষীদের নজরে নিয়ে আসার জন্য মাজহার জীবনকে অন্তহীন ধন্যবাদ।

এনার্কিকে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির হাতিয়ারে পরিণত করতে এমা গোল্ডম্যান তার জীবনকে এক সৃজনশীল রাজনৈতিক অভিযানে পরিণত করেছিলেন। যা একটি দৃষ্টান্তমূলক জীবনযুদ্ধ। শেষ জীবনে নাট্যবেত্তা হিসাবে এমা বক্তৃতা করে বেশ সুনাম কুড়িয়ে ছিলেন। রাজনীতিকে সৃজনশীলতার উপমায় সুষমামন্ডিত করেছিলেন এমা গোল্ডম্যান। যা “থিয়েটার অব এনার্কি” হিসাবে ইতিহাসের পাতায় সন্বিবেশিত হয়েছে হাওয়ার্ড জিন রচিত জীবনাচরিতামূলক নাটক এমা’র পরতে পরতে। মাজহার জীবন কর্তৃক করা যার সাবলিল অনুবাদ; বাংলা ভাষায় অনুবাদ নাট্যে এক নবতর সংযোজন।

এমা গোল্ডম্যান প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস বেত্তাদের কাছে উপেক্ষিত এক বিস্মৃত নারী। নারী স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা মূল্যায়নে এমা’র উজ্জ্বল অবস্থান নতুন প্রজন্মের সামনে দৃশ্যায়ন এবং সাহিত্য হিসাবে সমাদৃত হতে সহায়ক সৃজনকর্ম হিসাবে ব্যাবহৃত হবে। যা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের পাঠ্যক্রমভূক্ত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।

জিনের হাত ধরে জীবন এর অনুবাদে বাংলা ভাষীদের কাছে ‘এমা’ নাটকটি অন্যতম স্মারক নাট্য পান্ডুলিপি হিসাবে ‘থিয়েটার অব এনার্কি’ ধারণার নাট্যশৈলীর বিকাশ ও বিস্তৃতিতে মাইলফলক নাট্যকর্ম হিসাবে মূল্যায়িত হবে বলে আমার প্রত্যাশা।

বাংলা ভাষায় অনুদিত এ নাট্য সাহিত্যের মঞ্চভ্রমণ বাংলা নাট্য উপস্থাপনায় অনুসন্ধিৎসু পরিচালকের পৃষ্ঠপোষকতা পাবেই পাবে। কারণ এনার্কিজম ধারণার রাজনৈতিক দর্শন এবং একজন নারী এনার্কিস্ট হিসাবে এনা গোল্ডম্যানের অনবদ্য অবদান একটি তুলনাহীন উদাহরণ।

লেখক: অতিথি শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

add

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “নাটক ‌এমা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া: ‘থিয়েটার অব এনার্কি’ ধারণার প্রতিধ্বনী”

  1. Mostafa+Kamal+Jatra says:

    পরিবর্তনকামী মতাদর্শের বিশ্বস্ত সৈনিক
    “এমা গোল্ডম্যান”
    ========================
    বইমেলা উপলক্ষে গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে এবছর প্রকাশিত অন্যতম গ্রন্থ নাটক ‘এমা’।
    হাওয়ার্ড জিন রচিত নাটকটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাজাহার জীবন।
    দেওয়ান আতিকুর রহমান এর অসাধারণ প্রচ্ছদ সমৃদ্ধ এই প্রকাশনার মূদ্রন ও বাইন্ডিং অসামান্য সুন্দর।
    জীবনী নাট্য এমা’তে অ্যানার্কিস্ট রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী ‘রেড এমা’ খ্যাত এমা গোল্ডম্যান এর ৭০ বছর জীবনের নানামূখী জীবনাচার চিত্রায়িত হয়েছে।
    প্রথম এই সংস্করণটির মূল্য ৩০০ টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ