সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ০৮:১১ অপরাহ্ন

ধারাবাহিক রম্য গল্প: ‘হরমুজ আলী’ এখন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি!

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ২৫৫ Time View

‘হরমুজ আলী’ মানে কূটচাল আর পাড়া প্রতিবেশীদের সর্বনাশ। সেটি হাটহাজারীর ফটিকা গ্রামের সবার কমবেশী জানা আছে।

হরমুজ আলীর বয়স পঞ্চাশের কোঠায় । ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন তাকে এসব কূটচাল ছেড়ে ধর্ম-কর্মে মনযোগী হওয়ার জন্য বলে।

ছোট মেয়ে রাইসা সেদিন বলেই বসল, ‘বাবা, তোমার বয়স তো আর কম হল না, এবার একটু ধর্ম পালনে মনযোগ দাও।’

ছোট মেয়ের মত হরমুজ আলীও বেশ কদিন ধরে ধর্ম পালনে মনযোগী হওয়ার চিন্তা করছিল। বয়স আর পাপ তো কম হলো না, এবার তো ধর্মকর্ম না করে আর উপায় নেই।

হরমুজ আলী গত মাস থেকে নিয়মিত পাড়ার মসজিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মুসল্লি বনে গেছেন। শার্ট পরা ছেড়ে পাঞ্জাবি ধরেছেন, দাড়িও রেখেছে। তবে আখিরাত, সমাজ ও পরিবারের ভয়ে সে মসজিদে নিয়মিত হলেও তার নিজের উপর নিজের ভরসা নেই। কারণ, সে যেখানে যায়, সেখানে কূটচাল কিংবা দলাদলী করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

হরমুজ আলীর এমন পরিবর্তনে পাড়ার সবাই খুশী হলেও এলাকার মুরব্বী হাজ্বী আবদুল ওয়াদুদ খুশী হতে পারেন নি। তিনি মনে মনে আশঙ্কা করছেন, হরমুজ আলী মানেই ঝামেলা আর কূটচাল। এবার তার কূটচাল থেকে মসজিদও রেহাই পাবে না। হাজ্বী আবদুল ওয়াদুদের আশঙ্কাই সত্যি হল।

হরমুজ আলীর মসজিদে যাতায়াতের এক মাস না হতেই মসজিদ কমিটি নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়ে গেল। কিছু লোক দাবি করে বসল, হরমুজ আলীকেই মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি করতে হবে! না হলে তারা মসজিদে নামাজ পড়বেনা। প্রয়োজনে তারা আলাদা মসজিদ বানাবে।

এলাকার মুরব্বী হাজ্বী আবদুল ওয়াদুদ বললেন, ‘হেদায়ত সবার জন্য নয়। যারা হেদায়তের আলো থেকে নিজ ইচ্ছায় বঞ্চিত, হরমুজ আলী তাদের একজন।’

এভাবে মসজিদ পরিচালনা কমিটি, মসজিদের টাকা ও সম্পদ নিয়ে পাড়ার লোকজনের মধ্যে সমস্যা লেগে থাকল। মাঝ-খানে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন পড়ে গেলেন মহা ঝামেলায় । তাঁরা কোন পক্ষ নেবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। দিনে একদল এসে তাদের দলে ভিড়তে বললে, রাতে এসে আরেক দলও একই কথা বলে।

মসজিদের ইমাম মাওলানা তমিজ উদ্দিন মনে মনে বলেন, ‘মসজিদের কোন সমস্যা হলেই ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়ে টানাটানি হয়ে যায়। খোয়া যায় তাদের কম টাকার বেতনের চাকরিও। আর এসব সমস্যার মূলে হরমুজ আলীদের মত বক ধার্মিক। ধর্ম মানুষকে নমনীয় ও মানবিক হতে শেখায় আর হরমুজ আলী শিখেছেন তার উল্টো।’

মসজিদের ইমাম হলেন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। যাকে মানুষ প্রতিদিন পাঁচ বার নামাজে অনুসরন করেন। তাদের বেতনও কম মানসিক, চিন্তাও বেশী। আজব দেশ, আজব সমাজ, আজব মানুষ। কিছুক্ষণ আগে যে মানুষের পেছনে নামাজে ইকতেদাইতুল বেহাজাল ইমাম বলেছিল, কিছুক্ষণ পর তারাই আবার হরমুজ আলী চরিত্র পাঠ নিয়ে সেই ইমামের চাকরি নিয়ে টানাটানি করে।

এক দিন সকালে হঠাৎ মোড়ের রফিকের চায়ের দোকোনের ‘টক অব দ্যা ভিলেজ’ এ পরিণত হলো ‘হরমুজ আলী।’

আলোচনার বিষয়, হরমুজ আলী মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে। তবে তার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে অধিকাংশ মুসল্লি ও গ্রামবাসী কিছুই জানে না।

(চলবে)

গল্পকার: সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট

Share This Post

আরও পড়ুন