শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১১:২৪ অপরাহ্ন

ধারাবাহিক ছোট গল্প: পতিতার আলাপচারিতা । শেষ পর্ব

এনামুল হক নাবিদ
  • প্রকাশ : রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১
  • ১২৫ Time View
এনামুল হক নাবিদ

পিছনে থাকাতেই ছাঁয়ামূর্তি দুইটি আমার সামনে দন্ডায়মান। হঠাৎ অচেনা ছায়ামূর্তি দেখে থ হয়ে গেলাম ক্ষণিকের জন্য। কিছু একটা বুঝে উঠতে যাব, এমন সময় নেকড়েগুলোর ঘেরাওয়ের মধ্যে আমি অবরুদ্ধ হয়ে গেলাম। যে অবরোধ বার বার ভাঙতে গিয়ে আমি কাহিল হয়ে পড়লাম। তারা আমার চোখ আর হাত-পা বেঁধে নিরুদ্দেশ পথে হেঁটে চলল।

খানিক পর নির্জন এক কামরায় প্রবেশ করল। হাত পা বাঁধা থাকায় শরীর আমার নিস্তেজ হয়ে আসল। নির্জন এ নিশুতীর মাঝে অসহায় এক যুবতীর উপর ঝাপিয়ে পড়ল এক দল মানুষরূপী নেকড়ে।

সে দিন সেই নেকড়েগুলো আমার দেহকে ছিন্ন ভিন্ন করেছে। তাদের হাত পা ধরে বার বার আকুতি করলাম, আমায় ছেড়ে দাও। আমি তাদেরকে ভাইয়ের জায়গা থেকে হাত জোড় করে বললাম, আমাকে ছেড়ে দাও। না, আমার মিহি সূরের কান্না তাদের কর্ণে পৌঁছায়নি সে দিন। একের পর এক নর পিচাশরা আমার সতিত্বের উপর অত্যাচার করে যাচ্ছে।

যখন আমি সম্ভ্রম হারিয়ে নিঃশ্ব চোখে তাদের দিকে চেয়ে রইলাম, তখন মনে হল- পৃথিবী তো নারীদের রক্ষা পাওয়ার জায়গা না। তাহলে কাদের কাছে আমি রক্ষা চাচ্ছি? এ পৃথিবীতে মেয়েদের জন্মই হয়েছে পুরুষদের বীর্যপাত করার জন্য। আমার সম্ভ্রম নিয়ে উল্লাস করে ক্লান্ত হয়নি সেই নরপিশাচরা। আমার দেহকে ছিন্ন ভিন্ন করে সে দিন তারা দেহ বিলাশের দেহ উল্লাসে মেতে উঠেছিল।

অবশেষে তারা আমার নিতর দেহকে খন্ড বিখন্ড করে শান্ত হয়। তখন এ সুন্দর পৃথিবীকে অবাসযোগ্য মনে করে আমি চলে গেলাম দু’পারের স্রষ্টার কাছে।

অচিন রাজ্যের গল্প শোনার মত শৈয়বাল শুনে যাচ্ছে পতিতা পল্লীর এক নৈস্বর্গের পতিতার আলাপচারিতা। আপন ভোলা মানুষের মতই রিসিতা ঝুঁকে পড়েছে শৈয়বালের বুকে।

রিসিতা তখন হারিয়ে গিয়েছিল শৈয়বালের প্রেম বিলাশের নৈস্বর্গে। তার চাপাকলির আঙ্গুলগুলো তখন বিলি কেটে যাচ্ছে শৈয়বালের চুলগুলো। পরম তৃপ্তি নিয়ে শৈয়বালের মনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে রিসিতা। চাঁদ গড়িয়ে গড়িয়ে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। শেষ প্রান্তে নিশীথের আয়ু। তারাগুলো ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে এল। প্রেমে মাতাল এক যৌবনার ভালবাসার আঁকুতি নিয়ে মাথা তুলে শৈয়বালের চোখে তাকিয়ে রইল রিসিতা। আর অকপটে বলে যাচ্ছে কেন তার আবস্থল হল এ পতিতা পল্লী। শুকিয়ে শুভ্র গন্ডদেশ রিসিতার। চোখ দু’টো টল টলে। শৈয়বাল বলে উঠল, কাঁদছ তুমি? নিরব অশ্রুর ঢল নেমে আসছে তখন রিসিতার দু’চোখে।

স্মৃতি পথের রেখা আঁকতে আঁকতে রিসিতার অলক্ষ্যে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস।

আলাপচারিতার মাঝে রিসিতার অবিন্যস্ত চুল আর চোখের জল যেন প্রকাশ পাচ্ছে প্রচন্ড এক ঝড়। এ যেন মরুর পরিচিত ধূলি ঝড় ধেয়ে আসছে এ কুড়ে ঘরে। মরুর সেই সাইমুমের মাঝে হারিয়ে গেল রিসিতা। হারিয়ে যাওয়ার মাঝে শৈয়বাল কি যেন দেখতে পেল। যা দেখল তার জন্য শৈয়বাল মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তার সামনে বসে যে রূপ রাজ্যের রাজকন্যাটি স্মৃতিপথের অভিলাষ ব্যক্ত করে যাচ্ছে, সেই রূপ কন্যাটি অনুনের এক ছোট্ট টুকরো হয়ে তার সামনে কোথাও অদৃশ্যের পথে হারিয়ে গেল।

ভয়ে আত্ম চিৎকার করে উঠল শৈয়বাল। শৈয়বালের রূপ পরীর অজনা কাহিনীর ইতি হল এখানেই। অচেতন অবস্থায় পড়ে রইল শৈয়বাল। পূর্ব প্রান্তের সূর্যের কিরণ প্রতাপ ছড়াতে লাগল। সূর্যের প্রতাপে জ্ঞান ফিরে এল শৈয়বালের।

নিশীথের রূপ গল্পের অচিন কূল থেকে স্বাভাবিক হলে আপন নীড়ের পথ ধরল শৈয়বাল। হেঁটে আসতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। এসেই ধব দবে সাদা কাগজের বুকে কলম চালাল। পর দিন শ্যামনগরের এ পতিতা পল্লী নিয়ে প্রতিবেদন আসে সংবাদ পাড়ায়। বিষয়টি প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রশাসনের আন্তরিকতায় শ্যামনগরের তীরে এখন আর কোন পতিতা পল্লী নেই। এখানে গড়ে উঠেছে সভ্যতার এক নান্দনিক আধুনিক পর্যটন নগরী…।

শেষ

Share This Post

আরও পড়ুন