রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:২২ পূর্বাহ্ন

ধারাবাহিক ছোট গল্প: পতিতার আলাপচারিতা । পর্ব দুই

এনামুল হক নাবিদ
  • প্রকাশ : বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১
  • ৪৭০ Time View
এনামুল হক নাবিদ

ছেলেটিও কাল বিলম্ব না করে এদিক সেদিক একটু উঁকি মেরে মেয়েটিকে অনুসরণ করল। ঢুকে দেখল, উত্তর দক্ষিণে একটি খাটিয়াতে মেয়েটি ঘুমটা দিয়ে ঠিক খাটিয়ার মাঝখানে বসে রইল। ঘরটা থাকার তেমন বাসযোগ্য না হলেও ঘন্টা খানিকের জন্য মন্দ না। যৌবনের প্লাবণে কুড়ে ঘরটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হচ্ছে যুবকটির। এর মাঝে তাদের কিছু আলাপচারিতাও হয়ে গেল। না, ছেলেটির আর তর সইছে না। এমন সময় সে শুনতে পেল, নদীর এক পাশ থেকে দুই-তিনজন নারী এক সাথে কান্না জুড়ে দিয়েছে। কান খাড়া করে সে শুনল কান্নার ধ্বনি।

কান্নাকাটি শুরু হয়েছিল মিহি সুরে। বিলাপের মত। ভয় তাকে চেপে ধরল। সব ভয় দূর করে নিজেকে দৃঢ় করল। যখন সে কাংখিত মেয়েটির স্পর্শ পাওয়ার জন্য মেয়েটির ঘুমটা ধরে মাথার উপর একটুখানি তুলল, তখনি সে দেখত পেল অন্য কিছু। যার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মেয়েটির ঘুমটা খুলে সে দেখত পেল ভয়ংকর এক চেহেরা, যে চেহেরা খুবই বিকৃত, খুবই ভয়ঙ্কর। যেখানে খুব নৃশংসভাবে আঘাত করা হয়েছে। আঘাতের ফলে ক্ষত বিক্ষত এ চেহেরার উপর ভেসে উঠল ভয়ংকার কিছু প্রাণীর প্রতিচ্ছবি। এসব দেখে সে আর স্বাভাবিক থাকতে পারল না স্বপ্নের এ কুড়ে ঘরে। তবে সে কুড়ে ঘরে আর এক মুহূর্ত দেরী না করে নিজ অবস্থান ত্যাগ করল। সামনের দরজা খুলতে না পেরে ঘরের পিছনের দরজায় দ্রু বেগে বেরিয়ে গেল সে। ভয়ে সে চিৎকার করে যাচ্ছে, কিন্তু তার চিৎকারে কেউ সাড়া দিল না। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এক সময় সরু রাস্তা পেরিয়ে মূল সড়কেই পৌঁছে গেল সে। ভয়ে এখানেই অচেতন অবস্থায় পড়ে রইল।

পর দিন প্রভাতের লগ্নে তার অবস্থা স্বাভাবিক হলে সে ফিরে যায় তার নিজ আবস্থলে। এ ঘটনা শুধু আগন্তুক এ যুবকের সাথে ঘটেছে এমন নয়, ঘটেছে আরো অনেকের সাথে। ভয়ঙ্কর এ ঘটনাটা ঘটে থাকে খুব বেশি অমাবশ্যার রাঁতে। তবে পতিতা পল্লীর কথা বলে নিজেদের সেই নোংরা চেহেরাটা ঢাকতে ঘটনাটা তেমন কেউ বলাবলি করে না। পল্লীর ভয়ঙ্কর ঘটনাটা তেমন কেউ বলাবলি না করলেও বিষয়টা আর ধামাচাপা রইল না।

মোহনীয় চেহেরার মাঝে ভয়ংকর রূপ ধারণকারী পতিতাকে অনেকেই আবার ভূত পেতাত্মা বলে। ভয়ঙ্কর এ পতিতার আকৃতি ভিন্ন সময় ভিন্ন রূপ নেয় বলে এ মেয়েটিকে কেউ চিহ্নিত করতে পারে না। ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর এ ঘটনার খবর এক কান দু’কান করে মফস্বলের এক সংবাদকর্মীর কানে এসে পৌঁছায়। রহস্যময় কুয়াশার জট খুলতে পতিতা পল্লীতে যাওয়ার আকাঙ্খা হয়। সংবাদ কর্মীর।

নাম তার শৈয়বাল (ছদ্মনাম)। মফস্বলে সংবাদ পেশায় কাজ করে। এর মাঝে একদিন! সে দিন কালী পূজা, অমাবশ্যার প্রথম রাত। মাঝ রাতের কাছাকাছি। নিষ্পাপ ধুমকেতুবিহীন আকাশ। একাকী পথ চলতে লাগল শৈয়বাল। এক সময় পৌঁছে গেল যৌনাচারের নিরাপদ আবাস্থল শ্যামনগরের পতিতা পল্লীতে। মূল সড়কের পাশে ঝোপের মধ্যে কি যেন দেখতে পেল। না কিছুই নেই। হঠাৎ করে সামনে দিয়ে কালো রঙের দুইটি কুকুর চলে গেল। সময়টা ছিল তখন কার্তিক মাস। তাই একটু শিশিরের ছোঁয়া গায়ে লাগছে। অনুভব হচ্ছে হেমন্তের হাওয়া। গুটে গুটে অন্ধকার। জনমানবহীন সড়কের মাঝে মাঝে শেয়াল কুকুরের উঁকি লক্ষ্য করা যায়।

পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে শৈয়বাল। নেই কোন জানা শোনা পথ। ভয় আতংক সব কিছু মিলে এক সময় নদীর তীরবর্তী চলে এল সে। জমাট অন্ধকার চারদিকে। বসেনি আকাশের বুকে নক্ষত্রের মেলা। ঝোপে নেই কোন জোনাকির দল। তবে ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ ভয়টা আরো তীব্রতর করে তুলল। পথ চলার এক পর্যায়ে হঠাৎ কি যেন দেখে আর পা বাড়ানো সম্ভব হল না শৈয়বালের।
যেন মরুর বালিরাশির গোলক কূপে আটকে গেল দুই পা। আর পা বাড়াবেই বা কিভাবে? মোহনীয় চুলের অধিকারী, টানা টানা চোখ, চেহেরায় কোমলতার পরশ একুশ কি বা বাইশ বছরের এক যুবতী ঠাঁই দাড়িয়ে আছে তার সম্মুখপানে। পরনে রেশমী কাপড়ের একটি সাদা রঙের ত্রি পিস, যেন সে দেখত পেল কল্পনার এক অচেনা পরী। পা বাড়াতে যাবে এমনি সময় মেয়েটি রাস্তার মাঝা-মাঝি দাড়িয়ে রইল, যেন তার পথ আগলে ধরল। মেয়েটির দিকে থাকাতেই তার যেন মনে হল নিশীথের নির্জন এ প্রান্তরে রূপ পরী যেন তার দিকে চেয়ে হেসে উঠল। হাসিতে যেন সূরের অপূর্ব মূর্চ্ছনা। সে হয়ত ভাবল, পল্লীর কোন পতিতা।

চোখের উঁকিতে কথা হল দুইজনের। নরম পায়ের কদম চলতে লাগল সামনে। এর মাঝে তাদের কন্টাক্ট হয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবে এ পতিতা পল্লীতে পতিতারা যে রকম কন্টাক্ট করে থাকে।

শৈয়বাল ভাবল, তার কাজ হয়ত এখান থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। কুয়াশার জট খুলতে এ মেয়ের সাহয্য নেয়া যায়। হাতে একটি গ্যাস লাইট, নোট খাতা আর পকেটে ছিল একটি পাঁচ টাকা দামের কালো পেন।

হেটে চলছে যুগল। এক সময় এসে গেল ঝাউ তলার কাছে। দেখতে পেল ছোট একটি কুঁড়ে ঘর। কিছু মানুষের ধ্বনি কিন্তু এখনো তার কর্ণে আঘাত হানছে । নদীর তীরে না হলেও খানিকটা দূরে জেলেদের ডিঙিগুলো দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটা দুইটাতে ল্যাম্প পোস্টের মিটি মিটি আলো ঝলছে। এর মাঝে মেয়েটি ইশরায় তাকে অনুসরণ করতে বল্ল। মেয়েটি বলল, কি এসো? শৈয়বাল ভাবল, এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে সময়টা কাজে লাগালে অধিক মঙ্গল হয়।

মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল শৈয়বাল। তাই তেমন নার্ভাস ফিল করছে না। সামনে এগুতেই ঘরের দরজা তাকে স্বাগত জানাল। ঘরে ঢুকেই দেখত পেল অন্য এক প্রতিচ্ছবি। দেখত পেল সম্পূর্ণ বিপরীত। যা মূহুর্তের পূর্বেই কল্পনা করেনি সে। একটু আগেই যে মেয়েটি তার সাথে কথা বলল, সে মেয়েটির লেশ মাত্র নেই বললেই চলে। তাহলে মেয়েটি কে? ঘরটি ঝোপরীর মত মনে হলেও ভিতরের অবস্থা বেশ উন্নত। যেন আরবের আমীর উমরাহ্দের কোন অন্দরমহল। মেয়েটির কাপড় সাজ সজ্জা, যৌবনের তৃপ্তিময় প্লাবিত চেহেরা যেন তার সামনে বসে আছে অচেনা স্বর্গীয় এক পরী।

শৈয়বালের দিকে থাকিয়ে মেয়েটি ইশারায় বলল, ‘এসো’। উত্তরে সে বলল, ‘এ তো আসলাম।’

(চলবে….)

Share This Post

আরও পড়ুন