শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১১:৫৩ অপরাহ্ন

ধারাবাহিক গল্প: হঠাৎ দেখা । পর্ব পাঁচ

শাশ্বতী ভট্টাচার্য
  • প্রকাশ : রবিবার, ২ মে, ২০২১
  • ২০৯ Time View

রাতের নিস্তব্ধতায় খানিকক্ষণ থেমে ছিল নিরুপমা বোস আর আগন্তুকের বাক্যালাপ। বগির দরজার সামনে দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে। কারো মুখে কোন সাড়া শব্দ নেই। চুপচাপ একমনে দুজনে নিজেদের মত করে ভেবে চলেছে। যদিও আগন্তুকের মনের কথা মিস বোস জানতে না পারলেও আগন্তুকের জানতে খুব একটা সময় লাগে নি।

‘আমার জন্য আপনার রাতে বিশ্রাম নেয়া হয় নি। আপনি কেবিনে গিয়ে বিশ্রাম নিন, এখনো বেশ কিছু পথ বাকি।’ গম্ভীর গলায় নীরবতার আস্তর ভেঙে দিয়ে আগন্তুক বলে উঠল।

মিস বোস আগন্তুকের কথা কানে না নিয়ে মুখে একটা হাসি রেখে বলল, আপনাকে আমি চিনি না হেতু আপনি খুব সহজে ‘অপরিচিত’ বলে নিজেকে দাবি করেছেন আমার কাছে। অথচ কখনো কখনো খুব পরিচিত আমরা সময়ের ব্যবধানে অপরিচিত হয়ে যাই একে অপরের কাছে।

মিস বোসের আঁখি ছলছল। এ হল মেয়েদের এক সমস্যা, হুট করে কি করে যে এরা এত কাঁদুনি হয়ে যায়, এরা নিজেরাই হয়তো জানে না।

ঢুক গিলে নিয়ে মিস বোস আবার বলতে শুরু করল, জানেন? চেনা মুখ যে শুধু অচেনা হয়, তা নয়। চেনা আদর করে দেয়া ডাক নামগুলো অচেনার আড়ালে হারিয়ে যায় আপন মনে। বহু পরিচিত অভ্যাসগুলো তখন অনুভূতির পাতা থেকে নিজ দায়িত্বে প্রস্থান করে।

আগন্তুক মিস বোসকে থামিয়ে বলল, আপনি বড্ড অভিমানী।

হা হা হা হা হা হা হা করে মিস বোস হেসে উঠল।

আগন্তুক নরম সুরে বলল, অভিমান কি আজো সে একই জায়গায় থাকবে?

থাক না, ক্ষতি কি বলতে পারেন…? এ একটা সম্পদ নিজের বলে দাবি করতে পারি আমি।অভিমানটার অধিকার লাগে না প্রয়োজন হয় অভিযোগের। কিছু সামান্য অভিযোগ যদিও সে সব অহেতুক। যাদের প্রতি এ অভিযোগ বা অভিমান হয়, তারা কিন্তু ছেড়ে গিয়ে ভাল থাকে।

ঘড়ির কাটা ৪:৩০। রাত শেষ হয়ে প্রকৃতির সাথে দিনের আলোর প্রেম হবে। পাখিরা আবার মনুষ্যজাতির মত ব্যস্ত হবে। হাজারো ইতি ঘটবে এ ভোরের আলোয়।

চোখের দৃষ্টিতে যা দূরে মনে হয়, মনের দৃষ্টিতে তা খুব কাছে- দীর্ঘশ্বাস ফেলে আগন্তুক বলল।

যথার্থ বলেছেন মশাই, বলেই হাসির রেখা ফুটে উঠল মিস বোসের ঠোঁটে।

‘আমরা সবাই অপরিচিত অতিথি, ক্ষণিকের জন্য একটা গভীরতা তৈরি করে তুলি, যা বিদায় বেলায় আপনাতে ছিন্ন হয়ে যায়, থেকে যায় সামান্য চোখের জল আর অস্থায়ী পিছুটান’- আগন্তক খুব সহজে বলে উঠল।

ভুল বললেন, আমরা সবাই অস্থায়ী না এমন কেউ থাকে যে মৃত্যুর পরেও স্থায়ী হয়- উত্তরে মিস বোস।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, দূর থেকে আযানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। নতুন আরেকটি দিন শুরু হতে যাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাসে মিস বোস নিজেকে আর সামলাতে না পেরে কেবিনে যাবার অনুমতি নিতে পাশে ফিরতেই আগন্তুক নেই।

এ অভ্যাসটা মিস বোস একদম পছন্দ করে না। বলে যেতে সমস্যা কি হয় এদের। কেমন যেন ঘাড় ভর্তি এটিটিউড।

কেবিনে গিয়ে মিস বোস কাউকে দেখতে পায়নি। সেখানে মিস বোসের প্রয়োজনীয় ব্যাগ ছাড়া আর কিছু নেই। আগন্তুক কি তবে চলে গেল..!

ওয়েটিং বয়কে ডেকে উঠল মিস বোস। ভোর পাঁচটা পাঁচ মিনিট।

ওয়েটিং বয় ঘুম চোখে ঢুলতে ঢুলতে মিস বোসের সামনে এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে হামানি দিয়ে উঠল। ঘুম চোখে তাকাতেই মিস বোসের কপালে ভাজ পড়া চশমার আড়ালে তাকিয়ে থাকা এক জোড়া চোখ, বেশ রাগি একটা মুখ দেখা গেল। ওয়েটিং বয়ের ঘুম ভাব রীতিমত হাওয়া।

‘ম্যাম কি লাগবে? কফি না স্যান্ডউইচ? আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি’- ভাঙ্গা কাপা গলায় বলল ওয়েটিং বয়।

মাথা কিছুটা ঠান্ডা রেখে, নরম গলায় মিস বোস বললেন- আমার সাথে যে আগন্তুক ছিল, সে এখন কোথায়? তা জানার ছিল?

ওয়েটিং বয় চুপ করে শুষ্ক এক জোড়া চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে মিস বোসের দিকে। তার চোখ দেখে বুঝা যাচ্ছে সে এ বিষয়ে কিছুই জানে না।

চুপ করে থাকা সব থেকে অসহ্যকর মিস বোসের কাছে। ‘আগন্তুক হঠাৎ করে কি করে উধাও হয়ে যেতে পারে। কিছুক্ষণ আগেও আমার সাথে সে ছিল।’ চিৎকার করে বলতে থাকলেন মিস বোস।

ওয়েটিং বয় ভয়ে ভয়ে বলল, ম্যাম গতকাল রাত থেকে কোন আগন্তুক আপনার সাথে ছিল না।আপনি একাই ছিলেন কেবিনে। আমরা আপনাকে বগির দরজার সামনে একা কথা বলতে এবং হাসতে দেখেছি।’

প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেল মিস বোস। এদের কোনো কথাই মিস বোস বুঝতে পারছে না। মিস বোস তবে এতগুলো কথা কাকে বলছে। গুলিয়ে যাচ্ছে সব কিছু। তবে মাউথ অর্গানের সুর সেটাতো সবাই শুনেছে?

‘ম্যাম গতকাল রাতে কোন সুর বা গান ট্রেনে হয় নি। বগির সামনে কেবিনে আপনি একা ছিলেন।’

মিস বোস প্রচন্ড ক্ষেপে গেল। ‘কি বলতে চাচ্ছ তুমি?’

ম্যাম, আপনি কি কোনভাবে অসুস্থ?

এমন প্রশ্ন মিস বোসকে আরো রাগান্বিত করে তুলল। মিস বোস কাল সারারাত আগন্তকের সাথে গল্প করে পার করেছে আর এখন শুনছে মিস বোস অসুস্থ।

ওয়েটিং বয়ের সাথে চিৎকার চেচামেচি হল মিস বোসের। ট্রেনে থাকা বাকি লোকেরা মিস বোসের কেবিনের সামনে জড় হল।

মিস বোস জড় হওয়া মানুষদের আগন্তুকের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে থাকল। কিন্তু মিস বোসের বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রেনে থাকা কেউ অই আগন্তুককে দেখতে পাই নি। মিস বোস কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না কি হচ্ছে। ‘কে ছিল মিস বোসের সাথে….হুট করে কেন চলে গেলেন আগন্তুক? জল জ্যান্ত একটা মানুষ কি করে নাই হয়ে গেল? এতগুলো লোক কেউ দেখতে পাই নি আগন্তুককে! কি করে হতে পারে?
কেউ মিস বোসের সাথে মজা করছে না তো? (আপন মনে এ সব হাজারো প্রশ্ন মিস বোসের, কিন্তু উত্তর কিছুতেই মিলছে না)

কিন্তু মিস বোস তার কথা কোনভাবেই ফিরিয়ে নেয়ার মেয়ে নন। সে একটা কথাই বার বলে যাচ্ছিল, তার সাথে আগন্তুক ছিল।

…………….চশমার ফ্রেম পালটে গেছে দুই বছর হল। মাথার চুলে খোপা করে তাতে দুটো কাঠমালতী গুজে দেয়া হয়েছে। কপালে টিপ পড়া এখন আর হয় না। চোখে কাজল দেয়ার অভ্যাসটাও হারিয়ে গেছে হুট করে। এখন পোশাক বলতেই সুতি পাতলা সাদা রঙের শাড়ি।

রুমে একটা বেড আর পাশে থাকা একটা স্ট্যান্ড রাখা যদিও ব্যবহৃত হয় না। তার পাশে রাখা ছোট মাঝারি সাইজের একটি টেবিল তার উপর ঢাকনা দেয়া পানি ভর্তি গ্লাস, কিছু মেডিসিন রাখা আছে আর একটি টেবিল ল্যাম্প রাতে খুব প্রয়োজন না হলে সেটাও ব্যবহৃত হয় না। দেয়ালে ঝুলছে একটা ওয়াল ক্লক, কোন রকমে চলছে।

(চলবে)

Share This Post

আরও পড়ুন