বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০৯:১০ অপরাহ্ন

ধারাবাহিক গল্প: হঠাৎ দেখা । পর্ব চার

শাশ্বতী ভট্টাচার্য্য
  • প্রকাশ : সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১
  • ৯২ Time View

ঘড়ির কাঁটা টিক টক টিক টক করে রাত এখন তিনটা ৩৩ মিনিট জানান দিচ্ছে।

ট্রেন ততক্ষণে একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে অনেক দূর পথ অতিক্রম করে এসেছে।

রেল গাড়ির কেবিনের জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা অন্ধকারে ডুব দিতেই মনে পড়ছে সেই পুরোনো স্মৃতির শহর। যে শহর একান্ত নিজের ছিল, খুব যত্ন নিয়ে গড়া ছিল, সেখানে আবদার ছিল, অধিকার ছিল। নিজের গড়া শহরটায় ছিল হাজারো আদর মাখা স্বপ্ন, কাছের মানুষদের নিয়ে ছোট একটা শহর। কিন্তু শহরে সব থেকে প্রিয় মানুষটা তার ছিল না।

পুরোনো স্মৃতির শহরটা জুড়ে খুব মায়া জড়িয়ে আছে, নিজেকে হাজার বার সরাতে চেয়েও সরানো হয়ে উঠেনি। এতটা সহজ হয়ে উঠলে হয়তো পৃথিবীর সব অপছন্দ থেকে নিজেকে খুব সহজে আড়াল রাখা যেত।

ডান হাতের মধ্য আঙ্গুল দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু হালকা করে মুছে নিল নিরুপমা বোস।

প্রশ্নের উওর না পেয়ে অনেকটা রেগে গিয়ে জানালা থেকে মুখ সরিয়ে পিছন ফিরে বলতে গিয়ে দেখল, কেবিনটা ফাঁকা……..

নিশ্চুপ নিরুপমা বোস..! রাগের মাথায় ওভাবে বলা ঠিক হয় নি আগন্তুকের সাথে। নিরুপমা অনেক চেষ্টা করেও তার হুট করে রেগে যাওয়া বাজে স্বভাবটা বদলাতে পারে নি।

অথচ এ রাগ নিরুপমাকে আজ সম্পূর্ণ একা করে দিয়েছে, তবুও রাগ ছাড়তে পারেনি।

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে হালকা করে নিল নিরুপমা বোস।

ট্রেনের ঝিক ঝিক আওয়াজের সঙ্গে রাতের নীরবতায় হঠাৎ ভেসে এলো অচেনা মাউথ অর্গানের সুর….
মাউথ অর্গানে নিরুপমার আলাদা প্রেম আছে। যদিও সব সময় তা প্রকাশ করা হয়ে উঠেনি কারো আছে কিংবা লুকিয়ে রাখাটাই পছন্দ ছিল নিরুপমা বোসের।
ব্যক্তিগত জীবনে কত কিছুই তো আমাদের সাথে আষ্টেপৃষ্টে মিশে থাকে, সবটাই বাহিরে উন্মোচন করে দিতে হবে, তার কোন মানে হয় না, কিছুটা একান্ত ব্যাক্তিগত হলে খুব একটা মন্দ হয় না।

নিরুপমা অনেকক্ষণ ধরে কেবিনে বসে আছে, এবার উঠে দাঁড়াল। আঁচলটা হাত বুলিয়ে আরেকবার ঠিক করে নিল। চশমার গ্লাসটা আরেক বার মুছে চোখে পড়ল। তারপর কানের এক পাশে ছোট কাট করা চুল গুজে নিজেকে তৈরি করল।

আসলে এই সবটাই মাউথ অর্গানের জন্য।এত দিন পর মাউথ অর্গান শুনে নিরুপমা বোস নিজেকে বদ্ধ কেবিনে আটকে রাখতে চাইছিল না। তাই এবার কেবিন থেকে বের হয়ে সুর শুনে শুনে পৌঁছে গেল বগির দরজার সামনে। আসলে ওখানেই কেউ দাঁড়িয়ে খুব যত্ন নিয়ে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছিল।

প্রথমে হয়তো খেয়াল করেনি নিরুপমা বোস কিংবা অন্ধকারে খুব একটা ভালো দেখতে পাই নি। গভীরভাবে তাকিয়ে থাকার পর উপলব্ধি করল, এই ভদ্রলোক তার খুব চেনা। আরেকটু ভালো করে বুঝতে গিয়েই ঘটে গেল নিরুপমা বোসের সব। অবাক চোখে তাকিয়ে ডান হাতের তর্জনী তুলে বলল, আপনি…?

ঠোঁট মুচকি হাসি রেখে নরম গলায় লোকটি বলল, কি ভেবেছিলেন? চলে গেছি…!

নিরুপমা সত্যি আগন্তককে কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারছে না। ভিন্ন চরিত্রের এই মানুষটা, সহজ সরলতার মাঝে কেমন যেন জটিলতাকে বেশি পছন্দ করে এই মানুষটি।

মিস ‘বোস’ হঠাৎ আমায় কেন সন্ধান করছিল, জানতে পারি?

উত্তর দিতে গিয়ে নিরুপমা বোস খানিকটা আটকে গেল, আপনি কি করে জানলেন, আমি ‘বোস’?

হা হা হা হা হা হা, আবার সেই জোরালো গলায় হাড় কাঁপানো হাসি।

এই হাসিটা নিরুপমা বোসের ভীষণ রকম চেনা।তবুও কোথাও যেন অচেনা আরা অজানা দুটো শব্দ গেঁথে আছে খুব শক্তভাবে।

এমন সময় আগন্তুক গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল, ‘সোনার মেয়ে, তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি,
তোমায় দিলেম মধ্যদিনের, টিনের চালের বৃষ্টি রাশি, আর দিলেম রৌদ্রধোঁয়া, সবুজ ছোঁওয়া পাতার বাঁশি, মুখে বললাম না, বললাম না ভালবাসি। সোনার মেয়ে, তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি।’

মধ্য রাতে আগন্তুকের কন্ঠে এমন গান শুনতে পাওয়া নিরুপমাকে আগন্তুকের বিষয়ে জানার আগ্রহ আরেকটু বাড়িয়ে তুলেছিল। যদিও মিস বোস খুব ভালোভাবে জানতেন, আগন্তুককে জানা এত সহজ কার্য হবে না।

তবে যাই হোক, কেবলাকান্ত হলেও মনে যে প্রেম আছে সেটা গান না শুনলে বুঝা যেত না…(মনে মনে বললেন নিরুপমা বোস)।

এবার একটু রেগে গেলেন ভদ্রলোক, দেখুন মিস বোস, আমি আপনাকে আগেও বলেছি আমি কেবলাকান্ত নই।

তাহলে আপনি কোন একজন বড় ডিগ্রী ধারী ‘মাইন্ড রিডার’।

আগন্তুক গম্ভীর গলায় বলল, না, আমি আপনার কাছে এই মুহুর্তে শুধুই একজন অপরিচিত..।

(চলবে)

Share This Post

আরও পড়ুন