শিরোনাম
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জরুরী রোগী ব্যবস্থাপনার দুই দিনের প্রশিক্ষণ শুরু চা শ্রমিক নেতা বাবুল বিশ্বাসের মৃত্যুতে চা শ্রমিক নেতাদের শোক প্রকাশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর ভ্যাট চায় না চট্টগ্রাম সিটি ছাত্রদল বিডার কাছে ব্যবসায় সহজীকরণের উদ্যোগ চায় বিজিএমইএ মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে বেপজার প্লট পেল বঙ্গ প্লাস্টিকসহ দেশি বিদেশি দশ প্রতিষ্ঠান ভারতীয় ভেরিয়েন্ট দেশে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে কাউন্সিলর শহিদুল আলম টেকনাফে কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৮০০ পিস আন্দামান গোল্ড বিয়ার জব্দ প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা তহবিলে এক কোটি টাকা অনুদান দিল চট্টগ্রাম চেম্বার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের ছুটি বাড়ল ৩০ জুন পর্যন্ত
সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ০২:১৯ পূর্বাহ্ন

ধারাবাহিক গল্প: তোমায় ভালোবেসে: পর্ব দুই

শাশ্বতী ভট্টাচার্য / ১৪০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২১

দুপুরের খাবার শেষ করে বিকালের দিকে রুপ্সাকে নিয়ে বের হবো এমন সময় ঈশান এসে বায়না করলো আমাদের সাথে যাবে। আব্বুর অনুমতি নিয়ে আমি ঈশান আর রুপ্সাকে নিয়ে বের হলাম।

বেশ কিছু দিন ধরে রুপ্সার মাঝে পরিবর্তন আমার চোখে পড়ছে, যদিও জিজ্ঞাস করতে চেয়েছি হাজারো বার। কিন্তু রুপ্সা আমার কাছে কিছুই লুকায় না বলে সেভাবে গুরুত্ব দেইনি।

কিন্তু রুপ্সার তৈরি করা লিস্ট দেখে মনে খটকা লাগলো। বিয়ের কেনাকাটা লিস্টে রুপ্সা স্মার্ট ওয়াচের কথা উল্লেখ করেছে। এই ব্রান্ড্রের স্মার্ট ওয়াচ আমরা কেউ পরিধান করি না। আড় চোখে রুপ্সার দিকে তাকিয়ে ওকে জানার এবং বুঝার দুটোই চেষ্ট করছি। রুপ্সা এখনো স্কুল পাশ করে নি। কিন্তু মাঝেমধ্যে ওর কথা শুনলে লোকে বলবে মেয়ে পরিপক্ব হয়ে গেছে। আবার মাঝে মধ্যে ওর ছেলে মানুষিগুলো দেখলে মনে হয়, ঈশান আর ওর মাঝে কোনো তফাৎ নেই।

‘চাচ্চু,গাড়ি থামাও। আমি আইসক্রিম খাবো।’ – শপিং শেষ করে তারপর কিনে দেই..
— না, আমি এখন খাবো…
-আচ্ছা, ঠিক আছে।

গাড়ি সাইড করে…..আইসক্রিম আনার জন্য গাড়ী থেকে নেমে দোকানে গেলাম। দোকানদারের হাতে কিছু কাজ থাকায় পাঁচ মিনিট দেরি হলো। তবে এর মধ্যে লক্ষ্য করলাম, দোকানে থাকা পিচ্চি ছেলেটা গাড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

– এই ছেলে, ওই দিকে কি দেখো?
— না কিছু না। আপনার গাড়িটা খুব সুন্দর।
– আচ্ছা, হয়েছে। এখন তিনটা আইস্ক্রিম দাও তাড়াতাড়ি।

আইসক্রিম দিলো, টাকাও নিলো আমার থেকে, কিন্তু গাড়ি থেকে চোখ সরায় নি।

আইসক্রিম নিয়ে গাড়ির দিকে যেতেই হঠাৎ করে মাঝখানে একটা রিকশা চলে এলো।
– কি ভাই! এটা কোনো কাজ হলো?
–ভাই, মাফ কইরা দেন। গরিব মানুষ ভুল কইরা ফেলাইছি।
– আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন সাইড করেন।

গাড়ীতে উঠে রুপ্সা আর ঈশানকে দুটো আইসক্রিম দিলাম। তবে লক্ষ্য করলাম, এখানে আমাদের তিন জন ছাড়াও আরো একজনের উপস্থিতি ছিল। রুপ্সা স্বাভাবিক আচরণ করলেও ঈশানের ঠোঁটে লেগে থাকা চকোলেট আমার চোখ এড়িয়ে যেতে পারি নি। আমি রুপ্সাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঈশান চকোলেট কোথায় পেলো?’

রুপ্সা বললো, ‘এখান দিয়ে একজন হকার যাচ্ছিলো, তার কাছে থেকে ঈশানকে কিনে দিয়েছি।’

বুঝতে পারলাম, রুপ্সা মিথ্যা বলছে। একজন হকারের গায়ে থেকে কখনো এত দামি পারফিউমের সুবাস আসবে না। তাছাড়া ঈশানের মুখে লেগে থাকা চকোলেট পাঁচ টাকা কিংবা দশ টাকার চকোলেট না। আমি আর কথা না বাড়িয়ে মার্কেটের পথে গাড়ি ছাড়লাম।

মার্কেট থেকে শেলীর বিয়ের লিস্ট অনুযায়ী সবগুলো জিনিস কেনা হলো। ইচ্ছে করেই আমি ওয়াচের দোকানে যাই নি। কিন্তু রুপ্সা বার বার ওয়াচ কেনার কথা বলছিল। আমি সুন্দর করে এড়িয়েও যাচ্ছিলাম কয়েক বার। কিন্তু রুপ্সা ওয়াচ না কিনে বাড়ি যাবে না। তাই ওকে শান্তভাবে বাড়ি নেওয়ার জন্য ওয়াচের দোকানে গেলাম। রুপ্সা ওয়াচ পছন্দ করছে খুব যত্ন নিয়ে।

এর মধ্যে হঠাৎ করে ওপাশ থেকে এক যুগল প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের ব্রেক আপ রচনা শুরু করেছে।

ব্রেক আপের কারণ খুব সিম্পল, ‘সময় না দেওয়া।’ ছেলেটা মেয়ের হাতে পায়ে ধরছে, রিকোয়েস্ট করছে, কিন্তু কোনো কাজ হয় নি।মেয়েটা তার মতো করে চিৎকার করে ব্রেক আপ ব্রেআপ বলে ছেলেটার কাছ থেকে মুক্তি চাইছে। ছেলেটা দামি গিফট, পুরোনো স্মৃতি, আবেগ এসব দিয়ে ম্যানেজ করার অনেক চেষ্ট করেছে। কিন্তু তাতে অবশ্য কোনো কাজ হয়নি।

এসব দেখে মনের অজান্তে নিজেরই হাসি পাচ্ছে। একটা সময় আমি নিজেই এই সময়টা পার করে এসেছি।

আমি জানি, ছেলেটা এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর সিগারেটের ধোঁয়ায় সব আবেগ উড়িয়ে দিবে। আর নয়তো বন্ধুদের পার্টিতে মুখ লুকাবে। অন্য দিকে, মেয়েটা নতুন কাউকে পেয়ে পুরোনো প্রেম ভুল গিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখার নেশায় মেতে ওঠবে।

রোজ এভাবে হাজার সম্পর্ক ভাঙছে আবার একই সাথে সম্পর্ক গড়েও উঠছে। মানুষের জীবনে দৈনিক কর্মকান্ডের মতো সম্পর্ক ভাঙা গড়াও এখন মানুষের নিত্য কর্মকান্ডে পরিণত হয়েছে।

এ দিকে, যখন এদের ব্রেক আপ সম্পন্ন, অন্য দিকে, তখন আরেক যুগল প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের একে অপরের হাতে শক্ত কতে ধরে রেখেছে। তাদের চোখে শুধু একটা ইচ্ছে, এমন দিন তাদের যেন দেখতে না হয়।

এসব দেখে নিজের হাসি আর লুকিয়ে রাখতাম পারলাম না। আমিও দেবদাসের মতো আমার পুরানো প্রেমে ডুব দিলাম। এদের না হয় ব্রেক আপের অনেক কারণ আছে। কিন্তু আমায় ছেড়ে যাওয়ার কারণ কি ছিল স্নিগ্ধার? সময়, টাকা, গিফট কোনো কিছু কি কম ছিল? হয়তো আমার মতো করে তোমায় ভালোবেসে ছিলাম, যেটা তোমার কাছে কম মনে হয়েছিল। কিন্তু না, তুমি তো যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলে, আমি কোনো কালেই নাকি তোমার যোগ্য ছিলাম না। আর যোগ্য হয়ে উঠতেও পারবো না। যদিও এটা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অজুহাত। সেটা বললে ভুল বলা হবে। কারণ প্রতিটা মেয়ে ব্রেক আপের সময় এ উক্তি ব্যবহার করে।

তবুও আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমি কোথায় তোমার বেমানান ছিলাম? কেনো আমার উপর তোমার দয়া হয়েছিল? কেনো তুমি আমাকে সে দিন অযোগ্য বলে অপমান করছিলে? কেনো বলেছিলে, সে দিনের পর থেকে আর কোনো দিন তোমার উপর আমার অধিকার দাবি না করতে? আজো খুঁজি এসব প্রশ্নের উত্তর, কিন্তু পাইনি ।

‘চাচ্চু, চাচ্চু… ফুফি কান্না করছে।’

ঈশানের কথা শুনে রুপ্সার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওর চোখ দিয়ে অজস্র অশ্রু কণা বয়ে যাচ্ছে। এটুকু একটা মেয়ে ব্রেক আপের কি বুঝে সেটা ভাবতেই অবাক লাগলো!

-কিরে, কি হয়েছে?
-কিছু না, আমি বাড়ি যাবো ভাইয়া।

রুপ্সার কান্না দেখে আমার মনে ভয় কাজ করতে শুরু করলো। চার মাস পর ওর মাধ্যমিক পরীক্ষা। কিন্তু ওর এমন আচারণ অকল্পনীয়।

বাড়ি আসতে আসতে ঠিক করলাম, শেলীর বিয়ের ঝামেলা শেষ করে রুপ্সার স্কুলে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে হবে।

বাড়ি ফিরে রুপ্সা কারো সাথে কোনো কথা না বলে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।

এ দিকে, ওর এ রকম ব্যবহার আমি বুঝে উঠতে পারছি না। আম্মা বাসায় থাকলে হয়েতো কিছু একটা করা যেতো। বাড়ির মধ্যে রুপ্সার সব থেকে কাছের ছিল, বড় ভাবী। কিন্তু সেও সাত বছর আগে সে দিনের রাতে রোড এক্সিডেন্টে আমাদের রেখে চলে যান না ফেরার দেশে।

ঈশান তখন দুই বছরের বাচ্চা। আমি ঢাকা থেকে এমবিএ শেষ করে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলাম। ভাইয়ার সাথে ভাবীও এসেছিলো আমায় রিসিভ করার জন্য। আজও ঈশান জানে না, সে দিন আমার জন্যই আজ ওর মা ওর থেকে বহু দূরে! সে দিন যদি আমি সাবধানে রাস্তা পার হতাম, তাহলে ভাবি সে দিন আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজে প্রাইভেট কারের সামনে এসে পড়তো না। আজও সেই ভয়ংকর দৃশ্য আমায় রাতে ঠিক মতো ঘুমাতে দেয় না। বড় ভাইয়ার চোখের সামনে সব কিছু হচ্ছিলো। ভাইয়া সাথে সাথে মাটিতে বসে পড়লো। এক মিনিটে ভাইয়ার নিথর দেহ পাথরের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।

সে দিনের পর থেকে আজো ভাইয়া আমার সাথে কথা বলে না। ভাইয়ার কাছে বহুবার ক্ষমা চেয়েছি, কিন্তু ভাইয়া শুধু একটা কথাই বলেছিল, ‘ঈশানের কাছে ওর মাকে এনে দেয়।’

আমি চুপ করে ছিলাম। ভাইয়ার মনে ভাবীর জায়গা কতোটুকু সে দিন তা উপলব্ধি করেছি।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে দু চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছে, টের পাইনি।

ভাইয়ার রাত করে বাড়ি ফেরা। ঈশানের মনে তার মাকে নিয়ে হাজার প্রশ্ন, ওর বাবার কাছ থেকে সময় না পাওয়া এ সব আমার জন্য হয়েছে।

‘অদ্রিজ’……….।
– আব্বু, ভিতরে এসো।
— কান্না করছিলি?
– না, আব্বু। তুমি কিছু বলবে?
— আমি দেখলাম, তুই চোখের পানি মুছলি।
– না, ও কিছু না। চোখে যেনো কি পরেছে। তুমি কিছু বলবে?
— রাত তো অনেক হলো, তোরা খাবি না? লতিফ যে বসে আছে খাবার নিয়ে।
– না আব্বু, আজ খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি লতিফ চাচাকে খেয়ে নিতে বলো।
— আচ্ছা, ঠিক আছে।

আব্বু চলে যাবার পর আমি বাড়ির ছাদে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।

(চলবে)

[আপনার লিখা অপ্রকাশিত গল্প এই rinquoctg@gmail.com ই-মেইলে পাঠান। নাম, পরিচিতি, ঠিকানা, ছবি ও মোবাইল নাম্বারসহ। লিখা অবশ্যই ইউনিকোডে হতে হবে]

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ