বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন

ধারাবাহিক উপন্যাস: আলোর পথে রাজা চেরুমন: পর্ব-৩

সেলিম ইসলাম খান
  • প্রকাশ : রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৬৮ Time View

সমুদ্র তীরবর্তী সুন্দর ও মনোরম একটি শহর কোদনগুল্লু। এই শহরে দেশ-বিদেশের নামজাদা মানুষ আর ব্যবসায়ীদের সমাগম দেখা যায়। ফলে নানা রকম দেশী-বিদেশী পণ্যে কোদনগুল্লুর বাজার বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা সে সব পণ্য কিনে স্থানীয় বাজারগুলোতে নিয়ে যায়।

রাজকুমার চেরুমন এই শহরে বেশ যত্নআত্মি নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগলেন। অন্যান্য রাজ আমাত্যদের ছেলে-মেয়েদের সাথে খেলাধুলা ও যুদ্ধবিদ্যা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি কিশোর থেকে তরুণ বয়সে পদার্পণ করলেন। এখন তিনি বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই কোদনগুল্লুর প্রতিটি জায়গায় ঘুরে বেড়ান। আর প্রজাদের সুখ-দু:খ নিজের চোখে অবলোকন করেন। এতে করে প্রজা সাধারণের সাথে তার বেশ ভাব বিনিময় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তিনি প্রায়ই কোদনগুল্লুর বন্দরে আরব বণিকদের সাথে দেখা করতে যান। তাদের জ্ঞান ও পণ্য সামগ্রী তাকে বেশ চমৎকৃত করে।

কোদনগুল্লুর ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ আরব বণিকরা। তারা জাহাজে পাল তুলে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে আসে। সিংহল তাদের ব্যবসায় ও কৃষি কাজের মূল কেন্দ্র। সিংহলে তারা নারকেল, আখ ও মসলাপাতির চাষাবাদ করে। এ সব কাজের জন্য তারা আফ্রিকার জিবুতি ও মোম্বাসা বন্দর থেকে নিগ্রো কৃতদাসদের কিনে আনে। তাদের দিয়ে সুমাত্রা ও জাভার গহীন জঙ্গলে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোল মরিচ ইত্যাদির সন্ধান করে। তাছাড়া রেঙ্গুন নামে এক সমৃদ্ধ নগরও তারা গড়ে উঠেছে। রেঙ্গুন তাদের ব্যবসার অন্যতম আরেকটি কেন্দ্র। এভাবে সিন্দাবাদ জাহাজীরা পুরো ভারত মহাসাগর চষে বেড়ায়।

আরব বণিকরা ঝাল তরকারি রান্নার জন্য যেমন- দারুচিনি, এলাচ, গোল মরিচ ও তেজপাতার মত মশলাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি মিষ্টি জাতীয় খাবার রান্নার জন্য ছড়িয়ে দিয়েছে আখ ও নারকেল। এই সব পণ্যের ব্যবসায় তারা ইউরোপ থেকে ইন্দোচীনের সর্বত্র বিস্তৃত করেছে। জনসংখ্যা কম ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চল হওয়ায় ইউরোপ অপেক্ষা ভারতেই বেশি আরবদের ব্যবসায়ের প্রসার ঘটেছে।

খাবার-দাবারের পাশাপাশি কাপড়-চোপড় ও সৌখিন জিনিসপত্রের ব্যবসায়ও আরবরা সুনামের সাথে করে থাকে। কোদনগুল্লুর রাজপ্রাসাদে আরবদের সততা ও বিশ্বস্ততার বেশ খ্যাতি রয়েছে। রাজা জান্দার আরবদের বিভিন্ন সরকারি উচ্চ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। বিশেষ করে সাহসী আরবদের সংখ্যা মালাবারের সেনাবাহিনীতেও কম নয়। রাজা জান্দার ও আরবদের সম্পর্ক তাই বেশ মধুর।

কিন্তু মালাবারের বামুন সম্প্রদায় আরবদের প্রতি রাজার এই সম্পর্ককে কখনোই ভালভাবে নেয় নি। যদিও বামুনদের অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতায় রাজা অতিষ্ঠ হয়েই আরবদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তেমনি বামুনদের মধ্যে সংস্কারের চেষ্টাও তিনি করেছেন। কিন্তু বামুনরা সব সময় নিজেদের স্বার্থেই নানা রকম গালগল্পের নিয়ম-কানুন দিয়ে এক অদ্ভুত ধর্মরীতি তৈরি করেছেন। যা নিম্ন বর্ণের মানুষদের সাথে তাদের দূরত্ব তৈরি করেছে। দিনে দিনে তারা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে।

এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে আরবরা। তারা ধীরে ধীরে মালাবারের সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে।

(চলবে)

Share This Post

আরও পড়ুন