শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা তহবিলে এক কোটি টাকা অনুদান দিল চট্টগ্রাম চেম্বার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের ছুটি বাড়ল ৩০ জুন পর্যন্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম’র আইটি বিশেষজ্ঞ গ্রেফতার চট্টগ্রামে সাদার্ন ইউনিভার্সিটিতে দুই মাসব্যাপী আন্তঃবিভাগ বির্তক প্রতিযোগিতা শুরু নাভানাসহ সীতাকুণ্ডের সব কারখানায় ঈদুল আজহার আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দাবি পরিবেশ বিষয়ক গল্প : মন পড়ে রয় । নাজিম হোসেন শেখ পিএইচপি অটো মোবাইলসের তৈরি অ্যাম্বুলেন্স উপহার পেল চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সোতোকান কারাতে স্কুল চট্টগ্রামের কারাতে বেল্ট প্রতিযোগিতা সম্পন্ন চট্টগ্রামের পাহাড় অপরাজনীতি, অপেশাদার আমলাগিরির শিকার হাটহাজারী নাজিরহাট কলেজে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন
রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন

দুর্নীতিতে ডুবে গেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম / ২০৬ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৯ মে, ২০২১

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম: প্রথম আলোর জেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন, হেনস্থা ও জেলে পাঠানোর ঘটনা আমাদের দেশের সংকুচিত বাক স্বাধীনতার নির্মম চিত্র। সংবাদ সংগ্রহে সচিবালয়ের মত স্পর্শকাতর স্থানে গিয়ে তিনি আমলাদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার ও পরে সুবিচারের পরিবর্তে সাজানো মামলায় হাতকড়া পরিয়ে তাকে জেলে ভরা হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব জেবুন্নেছা বেগমের নির্যাতনে তিনি বেহুশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারী সাংবাদিককে গলা চেপে ধরে তাকে হত্যার চেষ্টাও করেন- এ নারী সচিব।

প্রশ্ন হল- রোজিনা ইসলামের উপর আমলাদের এত ক্ষোভের কারণ কি? কারণ- রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের দুর্নীতির হাঁড়ির খবর জাতির সামনে তুলে ধরে দুর্নীতিবাজদের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। করোনকালে নড়বড়ে স্বাস্থ্য খাতে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর সবার জানা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার অভাবে কিছু লোক দুর্নীতির মাধ্যমে সাগর চুরি করে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। নামে-বেনামে দেশে বিদেশে কিনেছেন গাড়ি বাড়ি। দুর্নীতির বরপুত্র সাহেদ করিমের রিজেন্ট হাসপাতাল, মাস্ক কেলেংকারীসহ ভুরি ভুরি দুর্নীতির খবর চাউর হলেও আরো কত হাজার অপ্রকাশিত রয়েছে ।

‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’- এ স্লোগানে দুর্নীতিতে ডুবে গেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়। কেনাকাটা ও নিয়োগসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিবেদেন করেন রোজিনা ইসলাম। এসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অনেকের মুখোশ খসে পড়ে। এতে রোজিনা ইসলামের উপর স্বাস্থ্য খাতের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা অত্যন্ত অখুশী । হাতের কাছে পেলেই পিষে মারবে এমন মনোভাব। কারণ তিনি প্রতিবেদন করে ঘুম হারাম করেন কিন্তু টাকার বান্ডিলে রফাদফা করেন না। শেষমেশ হাতের কাছে পেয়ে একেবারে গলা চেপে মেরে ফেলার চেষ্টা। শেষে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত ১০০ বছরের পুরনো ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মত কালা আইনে জড়িয়ে রোজিনা ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হল।

আজব দেশে বাস করছি আমরা! চোরকে না ধরে প্রহরীকে ধরে জেলে ভরছে। তার বিরুদ্ধে মন্ত্রনালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি ও সচিব জেবুন্নেছোকে খামছি মারার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম আলোর জেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের মত লোক দিন দুপুরে সচিবালয়ের মত জায়গায় তথ্য চুরি করে এমন অভিযোগ ও চরম হাস্যকর জোকসও আমাদের বিশ্বাস করতে হচ্ছে!! এটি মূলত সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণ মাধ্যমের জন্য আশনিসংকেত। যারা সাংবাদিকতা সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞান রাখেন, তারা জানেন- সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী নিউজের তথ্য কোন কর্মকর্তা সেধে কিংবা চাইলে সহজে দেন এমনটি নয়। বিশেষত দুর্নীতির তথ্য তো পাগলেও দেবে না। সাংবাদিকরা মাসের পর মাস খেটে সোর্সের তা মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। সুতরাং এসব সাজানো গল্প মানুষ আর গিলছে না।

জেবুন্নেছা রোজিনা ইসলামকে যেভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরাসহ নির্যাতন করা হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ অযোগ্য ও অমার্জনীয় অপরাধ। জেবুন্নেছা রোজিনা ইসলামের গলা চেপে ধরেনি, ধরেছে মুক্ত গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের। রোজিনা ইসলাম কিংবা সহকর্মী জন্য আদালতের বারান্দায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক আনিসুল হকের অঝোর কান্না মুলত সংকুচিত গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের কান্না।

রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা কিংবা জেলে ভরা ও হাতকড়া পরানো মানে বাক স্বাধীনতাকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। আমরা মুখে যতই দেশের গণ মাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলিনা কেন, সাংবাদিকদের জন্য টাকা ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ করি না কেন, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে মুক্ত গণ মাধ্যমের পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে এসেছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ ও অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩’র মত কালা আইন সাংবাদিকদের কলমের টুঁটি চেপে ধেরেছে। সাংবাদিকরা মামলা,হামলা ও জেলে যাওয়ার ভয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে দুর্নীতিবাজদের জন্য অন্যায় ও দুর্নীতির দুয়ার খোলে গেছে। সুযোগ হয়েছে লুটপাটের। যাদের কারণে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অর্জন ম্নাল।

চলতি মাসের শুরুতে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বহুল ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং হেনস্তার ঝুঁকি নিয়েই পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২০ সালে বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা এবং তাদের সহযোগী অন্যান্যদের হাতে মোট ২৪৭ জন সাংবাদিক শারীরিক আগ্রাসন, হেনস্তা এবং হুমকি-ধামকির শিকার হন বলে জানায় এইচআরডব্লিউ। এছাড়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় ৯০০টি, যেখানে মোট এক হাজার জনকে অভিযুক্ত করা হয়, যাদের অনেকেই ছিলেন সাংবাদিক। এ পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, সাংবাদিকরা এখন কি পরিমাণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন।

গত বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার বিরোধী পোস্ট দেওয়ায় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মোস্তাক আহমেদকে আটক করা হয়েছিল। জেলে অমানুষিক নির্যাতনে কিশোর হারিয়েছে শ্রবণ শক্তি ও লেখক মোস্তাক আহমেদকে দিতে হল প্রাণ। দশ মাস পর কিশোর মুক্তি পেলেও বন্দী অবস্থায় জেলের ভেতর মারা যান মোস্তাক আহমেদ। লেখক মোস্তাক আহমেদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের মুখে ডিজিটাল নিরাপত্তা-২০১৮ আইন সংশোধনের কথা বলা হলেও পরবর্তী তা দেশের চলমান ইস্যূতে চাপা পড়ে যায়।

রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধেও মন্ত্রনালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি ও সচিব জেবুন্নেছোকে খামছি মারার অভিযোগ আনা হয়েছে। রোজিনা ইসলামের মত একজন জেষ্ঠ প্রতিবেদক দিন দুপুরে সচিবালয়ের মত জায়গায় তথ্য চুরি করেন এমন অভিযোগ চরম হাস্যকর ও কাচা হাতের লেখা স্ক্রিপ্ট। একই সুরে কথা বললেন স্বাস্থ্য মন্ত্রীও। রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন ও হাতকড়া পরিয়ে জেলে ভরা দেশের সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য অস্বস্তিকর। জেবুন্নেছেনা বেগম রোজিনা ইসলামকে যেভাবে হত্যার উদ্দেশ্য গলা চেপে ধরাসহ নির্যাতন করেছে, তা ভাষায় নিন্দনীয় ও অমার্জনীয় অপরাধ।

রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন বা গলা টিপে হত্যাচেষ্টা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে বিনা শর্তে মুক্তির বদলে হাতকড়া পরিয়ে জেলে ভরা- মূলত গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতাকে হাতকড়া পরিয়ে জেলে ভরা হয়েছে। তিনি কোন সন্ত্রাসী না হলেও যে তাকে হাতকড়া পরানো হয়েছে। রোজিনা ইসলামকে নির্যাতন ও জেলে ভরা দেশে সাংবাদিকতা ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি খারাপ নজীর হয়ে থাকবে। এ কলংকের ক্ষত সহজে মুছবে না। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। এ জেবুন্নেছাদের বদলী কোন শাস্তি হতে পারে না। দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী এ আমলাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত। নয়তো শকুনের নগ্ন উল্লাসে নিভে যাবে মহৎ প্রাণ।

রোজিনা ইসলামের নির্যাতনে সাংবাদিক সমাজ যেভাবে গর্জে উঠেছে, নিজেদের অস্তিত্ব ও গণ মাধ্যমের স্বাধীনতায় জেগে ওঠেছে-তা অত্যন্ত ভালো একটি দিক। অধিকার আদায়ে সাংবাদিক সমাজের ঐক্যের বিকল্প নেই। এটা যেন কোন অদৃশ্য ইশারা কিংবা লোভের কাছে পরাজিত না হয়। মনে রাখতে হবে, আজকে রোজিনা ইসলাম হেরে গেলে হেরে যাবে বাংলাদেশ। আমরা কখনো বাংলাদেশের হার মেনে নিতে পারি না।

লেখক: গণ মাধ্যম কর্মী, চট্টগ্রাম।

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ