শিরোনাম
দুঃস্থ নারীদের নগদ টাকা উপহার দিল হিউম্যান সাপোর্ট ফাউন্ডেশন খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় বায়েজিদ থানা ছাত্রদলের মিলাদ ও ইফতার বিতরণ স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা হেলাল উদ্দিনের অর্থায়নে ফ্রি সবজি বাজার আন্দরকিল্লায় রমজানে ডায়াবেটিস রোগীর সমস্যা, সমাধানে করণীয় ও হোমিওপ্রতিবিধান ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন চট্টগ্রামে আজ মাহে রমজানের শেষ জুমা; জেনে নিন জুমাতুল বিদার মহত্ত্ব আলোচিত ‘নয়া দামান’ গানের মূল শিল্পী তোসিবা বেগম উপেক্ষিত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত থেকে প্রবেশ বাড়ছে আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা কেন করবেন? সরকারিভাবে অন্তত ৯০০ টন অক্সিজেন মজুত আছে
শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন

জীবন থেকে নেয়া: অস্তিত্ব রক্ষার কথা, সঙ্কট থেকে মুক্তির কথা

নুরুন্নবী নুর / ১৬৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০

নুরুন্নবী নুর: বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। মুক্তিযু্দ্ধপূর্ব মুহূর্তে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন এদেশীয় তথা বাংলাদেশী চলচ্চিত্রগুরু জহির রায়হান। পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম কাহিনীচিত্র ‘কখনো আসেনি’ দিয়ে শুরু এবং শেষ কাহিনীচিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’।

অবশ্য পরবর্তী সময়ে নির্মাণ করেন অনেকগুলো কালজয়ী চলচ্চিত্র, যা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে তিনি এবং তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো খুবই মূল্যবান। অবশ্য প্রথম চলচ্চিত্রে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের মুন্সিয়ানা ভাব ফুটিয়ে তোলেন। চলচ্চিত্র বানিয়েছেন, মনের খোরাকের জায়গার পাশাপাশি সময়ের চাহিদা ও শোষক শ্রেণি থেকে শোষিতদের রক্ষা করার জন্য। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রে দেশপ্রেম থেকে শুরু করে দেশের মুক্তির কথাই উল্লেখ করেছেন। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্র তেমনই সাক্ষ্য বহন করে। অস্তিত্ব রক্ষার আহ্বান যেন বারবার তাঁর চলচ্চিত্রে প্রতিধ্বনিত হয়।

‘জীবন থেকে নেয়া’ একটি বাংলা চলচ্চিত্র। জহির রায়হান নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ১৯৭০ সালের এপ্রিলে মুক্তি পায়। সামাজিক এই চলচ্চিত্রে তৎকালীন বাঙালি স্বাধীনতা আন্দোলনকে রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি চরিত্রই রুপক, বিশ্লেষণ করলে, উঠে আসবে নানা তথ্য। জহির রায়হান যেমন লেখক, চলচ্চিত্রকার পাশাপাশি একজন দার্শনিকও বটে। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র স্বীয় দর্শন ও মনস্তত্ত্ব ফুটে উঠে।

‘একটি দেশ
একটি সংসার
একটি চাবির গোছা
একটি আন্দোলন
একটি চলচ্চিত্র…’
‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে স্লোগানটিতে তিনি একটা দেশের তৎকালীন যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা, তা খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। বলতে চেয়েছেন, অস্তিত্ব রক্ষার কথা, সঙ্কট থেকে মুক্তির কথা। আমরা চলচ্চিত্রটি দেখলে বুঝতে পারি, মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশের মানুষের যে দুরাবস্থা, তা তিনি ক্যামেরার ফ্রেমে ফ্রেমে তুলে এনেছেন। দ্বন্দ্ব কোনদিন সুফল বয়ে আনে না। আমিত্ব থেকে বের হয়ে আসাটাই মুক্তি বলে চিহ্নিত করেছেন। আর শোষকরা চিরদিনই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে গা ঘেষে। পরাজিত হয়।

সারসংক্ষেপ: সিনেমার কাহিনী গড়ে উঠেছে বাংলার অতি সাধারণ এক পরিবারকে কেন্দ্র করে। একটি পরিবারে দুই ভাই আনিস (শওকত আকবর) ও ফারুক (রাজ্জাক), বড়বোন রওশন জামিল এবং বোনের স্বামী খান আতাউর রহমান। বড়বোন রওশন জামিল বিবাহিত। তিনি থাকেন বাবার বাসাতেই। তার স্বামী অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। সংসারের সব ক্ষমতা রওশন জামিলেরই হস্তগত। এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তিনি তার স্বামীসহ নিজের দুই ভাইদের উপর এক রকম স্বৈরশাসন চালিয়ে থাকেন। আঁচলে চাবির গোছা নিয়ে ঘোরেন তিনি। পেছনে পেছনে পানের বাটা নিয়ে ঘোরে বাড়ির গৃহ পরিচারিকা। তার দোর্দন্ড প্রতাপে অস্থির সবাই। তৎকালীন পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদেরই মূলত রুপক আকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ চরিত্রটিতে। রওশন জামিলের স্বামী খান আতাউর রহমান আদালতের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। খান আতাউর রহমান তার এক বন্ধুর পরামর্শে তার শালা শওকত আকবরের বিয়ে ঠিক করেন। পাত্রী সাথী (রোজী সামাদ) নামের এক শান্ত শিষ্ট মেয়ে। কিন্তু রওশন জামিল সম্পূর্ণ বেঁকে বসলেন। তিনি তার ভাইয়ের বিয়ে দিতে একদমই নারাজ। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে সংসারের চাবি না আবার তার হাত ফস্কে নতুন বউয়ের হাতে উঠে যায়। ফলশ্রুতিতে রওশন জামিলকে না জানিয়েই তার ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে দেন খান আতাউর রহমান। সাথী বউ হয়ে ঘরে আসলে তার উপর রওশন জামিলের অত্যাচারের খরগ নেমে আসে। অপর দিকে সাথীর ছোট বোন বীথির (সুচন্দা) প্রেমে পরে যান ফারুক ওরফে রাজ্জাক। দুলাভাই আর বড় ভাই অনুমতি দিলে বীথিকে বিয়ে করে ফেলেন তিনিও। সাথী এবং বীথির বড় ভাই আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেন ছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। স্বাধীকারের আন্দোলনে তিনি কারারুদ্ধ হন। অন্যদিকে সাথী তথা সুচন্দার নেতৃত্বে বাড়ির সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। নিজেদের বাড়ির ভেতরেই দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়। রওশন জামিলের চাবির গোছা চলে আসে দুই বোনের কাছে। পানের বাটা ঘুরতে থাকে তাদের পেছনে পেছনে। ক্ষমতা হারিয়ে পাগলের মত হয়ে যান রওশন জামিল। নতুন নতুন ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেন। এরই মাঝে সাথী ও বীথি সন্তান সম্ভবা হয়ে পরলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে মৃত সন্তান জন্ম দেয় সাথী। ডাক্তার আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এ শোক হয়তবা সাথী সহ্য করতে পারবে না। তাই বীথির সন্তানকে তুলে দেয়া হয় তার কোলে। নিজের সন্তান ভেবে তাকে লালন পালন করতে শুরু করে সাথী। রওশন জামিল ষড়যন্ত্র করে দুই বোনের মাঝে বিবাদ বাঁধিয়ে দেয়। কৌশলে বীথিকে বিষ খাওয়ান তিনি আর সেই দোষ চাপান সাথীর উপর। বীথি সুস্থ হয়ে বেঁচে উঠলেও বিষ খাওয়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় সাথী। আদালতে মামলা উঠলে নিজের স্ত্রীকে দোষী মনে করে শওকত আকবর তার বিরুদ্ধে মামলা লড়েন, আর সাথীর পক্ষের উকিল হন খান আতাউর রহমান। খান আতাউর রহমান আদালতে প্রমাণ করে দেন যে তার নিজের স্ত্রী রওশন জামিলই আসলে বিষ প্রয়োগের মূল হোতা। এভাবেই সিনেমার কাহিনী শেষ হয়।

জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্র যে ক’জন গুণী অভিনেতা অভিনয় করেছেন, নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। প্রত্যেকে নিজের জীবনের কথায় যেন বলেছেন। একটুও মনে হয়নি অভিনয় করছেন। খান আতাউর রহমান একজন সংগীত শিল্পী হিসেবেই বেশি জানতাম, কিন্তু চলচ্চিত্রে অভিনয় দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি এবং নতুন করে চেনারও সুযোগ হয়েছে। রাজ্জাক বরাবরই ভালো অভিনয় করে, তবে আবেগের জায়গায় কোথায় জানি একটু ঘাটতি রয়েছে মনে হলো, অর্থাৎ সঠিক জায়গায় সঠিক ভাব প্রকাশ করতে কিছুটা স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে হয়নি। সুচন্দা, রোজী সামাদ অসাধারণ। বোনের চরিত্রে এতোটাই মানিয়েছে, যেন অন্য কাউকে দিলে অসম্পূর্ণ থেকে যেত। দু’জনের অভিনয়ও ভালো ছিলো।

রংশন জামিল ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি নেগেটিভ রোল চমৎকারভাবে উপস্থাপন করতে। একটি টাইপ চরিত্র বলা যায়। সংলাপের সাথে অর্থপূর্ণ ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন অভিনয়কে অন্যতম একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন। একটি নেগেটিভ রোল দর্শকের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন, তিনি তেমনটাই করতে পারেন। অভিনয়ে মুন্সিয়ানা আছে বলতে হয়। শওকত আকবরের অভিনয়ও খুব ভালো। রাজার চরিত্রে তিনি আরও বেশি নিজেকে মেলে ধরতে পারেন, এখানেও শান্ত-শিষ্ট। খারাপ না, যেমনটা হওয়া উচিত, ঠিক তেমনটাই দিয়েছেন। বেবী জামান থেকে শুরু করে ঘরের চাকর চরিত্রসহ অন্য সব চরিত্রগুলোর অসাধারণ অভিনয়, যেন চলচ্চিত্রটিকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে। প্রশংসা না করে পারা যায় না।

সংগীত ও আবহসংগীত বেশ ভালো ছিলো। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ৪টি গান ব্যবহার করা হয়েছে- এ খাঁচা ভাঙ্গব আমি কেমন করে, আমার সোনার বাংলা, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো এবং কারার এ লৌহ কপাট। অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত পরিচালনা করেছেন খান আতাউর রহমান। এই এচলচ্চিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি পরবর্তী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এছাড়াও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’
গানটির সুর দিয়েছেন আলতাফ মাহমুদ।

১০৬ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের সিনে ওয়ার্কশপ থেকে নির্মিত, জহির রায়হান রচিত, এফডিসি স্টুডিওতে গৃহীত-মুদ্রিত-পরিস্ফুটিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’, সম্পাদনায়-মলয় বন্দোপাধ্যায়, চিত্রগ্রাহক- আফজাল চৌধুরী এবং চিত্রনাট্য-প্রযোজনা- পরিচালনায় জহির রায়হান।

১৭ নভেম্বর ২০২০
পশ্চিম মেখল, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ