মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন

জাতীয় নাট্য ঘরনা: নাট্যযুধিষ্টির জিয়া হায়দার থেকে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন

মোস্তফা কামাল যাত্রা
  • প্রকাশ : সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪৭৪ Time View

মোস্তফা কামাল যাত্রা: স্বাধীনতা পূর্বে ১৯৬৯ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) বাংলা বিভাগে নাট্যতত্ত্বের শিক্ষক হিসাবে নাট্যযুধিষ্টির জিয়া হায়দারের যোগদানের মধ্যে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার সূচনা হয়েছিল। মূলত তিনি বাংলা বিভাগের

শিক্ষার্থীদের নাট্য সাহিত্যের বিশ্লেষণে নাট্যতত্ত্বের প্রয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তাত্ত্বিক বিষয়ে পাঠদান করতেন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৭০ সালে যখন চবিতে চারুকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন জিয়া হায়দার নাট্যকলা শাখার শিক্ষক হিসাবে সেই বিভাগে স্থায়ী শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেছিলেন এবং বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করেন; যা প্রধানত ছিল তাত্ত্বিক। চারুকলা বিভাগের চিত্রকলা শাখার শিক্ষার্থী ছাড়া নাট্যতত্ত্বের সেই কোর্স ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে পড়তে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

১৯৮৬ সালে তাত্ত্বিকের সাথে প্রয়োগিক বিষয়বস্তু যুক্ত করে চারুকলা বিভাগের অধীনেই জিয়া হায়দার নাট্যকলা শাখায় চালু করেছিলেন নাট্যতত্ত্বের এমএফএ কোর্স। স্নাতকোত্তর মানের এই কোর্সই বাংলাদেশে প্রথম নাট্যকলা বিষয়ক বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষা হিসাবে স্বীকৃত। নাট্যজন জোবায়দুর রশীদ এই কোর্সের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। সেই সময় নাট্যকলা শাখার শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন নাট্যশিক্ষক কামাল উদ্দিন নীলু।

১৯৯১-৯২ শিক্ষা বর্ষে নাট্যকলা শাখা দেশে সর্ব প্রথম নাট্যকলায় বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার স্নাতক কোর্স চালু করে। নাট্যযুধিষ্টির জিয়া হায়দার ও নাট্যশিক্ষক কামাল উদ্দিন নীলুর সাথে তখন শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন রহমত আলী। পরবর্তী নাট্যকলা শাখার অধীনে ১৯৯৪-৯৫ শিক্ষা বর্ষে চালু হয়েছিল স্নাতকোত্তর কোর্স।

বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার এই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্সের একজন শিক্ষার্থী হিসাবে ব্যক্তিগত পঠন-পাঠন এবং পরবর্তী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যাচার্য সেমিন আল দীনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত প্রথম নাট্যকলা বিভাগের নাট্যশিক্ষাক্রম প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একজন প্রত্যক্ষ দর্শী স্বাক্ষী হিসাবে আমার যে ব্যক্তিগত প্রতিতি জন্মেছে এবং পরবর্তীকালে বাংলা নাট্যের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যিক ধারার স্বীকৃতি অর্জনে বাস্তসর্প হিসাবে আবির্ভূত নাট্যাচার্যের নাট্যকৃতি পর্যবেক্ষণসহ তারই প্রভাব বর্তমানে চলমান নাট্যচর্চার ইতিবৃত্ত আমাকে আজকে আলোচ্য শিরোনাম জাতীয় নাট্য ঘরনা: জিয়া হায়দার থেকে সেলিম আল দীন নির্বাচনে উদ্ধুদ্ধ করেছিল।

ব্যক্তিগতভাবে প্রগতিশীল সাংষ্কৃতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে যখন আমি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী তখন ১৯৮৭ সালের শেষের দিকে নগরীর ইস্পাহানি বিল্ডিংস্থ জিয়া হায়দারের বাস ভবনে তাঁকে কোনো এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে সেখানে দেখেছিলাম, তৎকালীন স্বনামধন্য নাট্যকার সেলিম আল দীনকে। চট্টগ্রাম এলেই নাট্যকার সেলিম আল দীন সময় কাটাতেন নাট্যশিক্ষক জিয়া হায়দারের সঙ্গে। তাদের দুজনের মধ্যে বয়সের পার্থক্য থাকলেও ছিল ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব। অন্তত আমার পর্যবেক্ষণ এবং দুজনের সাথে ব্যক্তিগত আলোচনায় তাই অনুধাবন করেছি। একজন আর একজনের ছিলেন হরিহর আত্মা।

যখনই সেমিন আল দীন চট্টগ্রামে আসতেন তখনই তিনি জিয়া হায়দারের বাসভবনে, চারুকলা বিভাগ বা চট্টগ্রাম ক্লাবে একান্তে সময় কাটাতেন। একজন গ্রুপ থিয়েটার কর্মী এবং নাট্যকলার শিক্ষার্থী হিসাবে উভয়ের মধ্যকার যে আলোচনা, আড্ডা হতো তার বেশ কিছু আলাপচারিতায় আমার উপস্থিতি আমাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছিল; তেমনি বৈশ্বিক নাট্যকলা, দেশজ নাট্যচর্চা এবং সেলিম আল দীনের যে শেকড় সন্ধানী নাট্যভাবনা ও দর্শন তা অনুধাবন সহায়ক হয়েছিল।

সেলিম আল দীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত থাকলেও একটি স্বতন্ত্র নাট্যকলা বিভাগ চালুর বিষয়ে প্রস্তুতি ও প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। প্রস্তুতি পর্বের জন্য অর্থাৎ বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষার জন্য একটি পাঠ্যক্রম প্রণয়নে জিয়া হায়দারের শরণাপন্ন হলেও ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা এবং দেশজ নাট্য আঙ্গিক নির্মাণে স্বশিক্ষিত নাট্যচেতনার উন্মেষ ঘটাতে সেলিম আল দীন যে সচেষ্ট বা অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন; তা তাদের আলোচনায়ই শুধু নয়, সেলিম আল দীনের লেখনি ও নাট্য প্রযোজনায় তার প্রভাব ছিল প্রকট। প্রকৃতপক্ষে, তিনি নতুন নাট্যকলা বিভাগের জন্য যে পাঠ্যক্রম নিয়ে ভাবছিলেন, তা হতে হবে এমন যেখানে থাকবে ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নাট্য ইতিহাস এবং তারই ধারাবাহিকতায় চলমান নাট্যক্রিয়ার বিকাশ ও অনুশীলনের বৈচিত্র্য।

সেলিম আল দীন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন পাশ্চাত্যের ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য ও সভ্যতা, প্রাচ্যের অনুগামী। কারণ প্রাচ্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। এ অঞ্চলে পাশ্চাত্যের আগমন ও উপনিবেশিক শাসন শোষণের কারণেই তাঁর প্রকৃত ইতিহাস ও নিদর্শন নিয়ে পঠন পাঠন না থাকায় আমাদের দেউলিয়াত্ব গড়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের অনুসন্ধানী মন ও মানসের বিকাশ ঘটাতে হবে। তাই সেলিম আল দীন মনে করতেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নব প্রতিষ্ঠিত নাট্যকলা বিভাগের পাঠ্যক্রমে প্রণয়নে সেই দিকটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।

বিদেশ থেকে বিদ্যায়তনিক নাট্য শিক্ষায় শিক্ষিত দেশের প্রথম নাট্যশিক্ষক হিসাবে জিয়া হায়দারকে বরাবরই দেখেছি এই প্রসঙ্গে সেলিম আল দীনকে উৎসাহিত করতে, পরামর্শ দিতে। কারণ জিয়া হায়দারও বিশ্বাস করতেন আমাদের ভৌগলিক ইতিহাস এবং নাট্য ইতিহাস ও নাট্যক্রিয়ার বহুমাত্রিক শৈলী নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। যা আমাদের দেশীয় নাট্যচর্চার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে একান্ত প্রয়োজন।

জিয়া হায়দারের তত্ত্বাবধানে বিদ্যায়তনিক নাট্যকলার যে বৈশ্বিক পাঠ্য আমরা পেয়েছি এবং তাকে বাংলা প্রণয়নে আমৃত্যু তাঁর যে প্রচেষ্টা বর্তমান ছিল, সেই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে পদ্ধতিগতভাবে সেলিম আল দীনের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশজ নাট্যাভিমুখি বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষা; আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধান অভিমুখি চর্চা ও নবতর নির্মাণে দৃষ্টান্তমূলক উদাহারণ।

যার ফলাফল হচ্ছে বিগত দুই দশকে আমাদের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের প্রচেষ্টায় যুক্ত হওয়া সেলিম আল দীনের ভাবশিষ্যগণ। তারা হলেন মুলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সম চিন্তা-চেতনার ধারক ও বাহক নাট্যযুদ্ধাবৃন্দ। যারা সেলিম আল দীনের নাট্যদর্শনের আলোকেই ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার অনুসন্ধান, গ্রন্থনা, চর্চা এবং দেশজ নাট্য আঙ্গিক নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বিদ্যায়তনিক নাট্যকলা শিক্ষার যে পাঠ ও পাঠ পরিকল্পনা এবং সেলিম আল দীন প্রবর্তিত দ্বৈতদ্বৈতাবাদ প্রধান শিল্পতত্ত্বের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনে ও নাট্যানুশীলনে যে বহুমাত্রিক ও ঐতিহ্যানুগামী চর্চার মনোভাব গড়ে তুলেছে, তা বর্তমান সময়ে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যদিও এসবের গতি-প্রকৃতি ও বৈচিত্র্যময়তা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনার দাবি রাখে। সময়ের প্রয়োজনে তা হবেও বটে।

কিন্তু দিক নির্দেশক হিসাবে অনিবার্যভাবে সেলিম আল দীন কৃর্তিত হবেন যুগ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে। সেই সাথে বিদ্যায়তনিক নাট্যশিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ চিহ্নিত হবে আলোকবর্তিকা রূপে। অন্তত সাম্প্রতিক সময়ের নাট্য বিষয়ক রচনা, উপস্থাপনা ও সমালোচনা সেই অবস্থানকেই তুলে ধরে।

এখানে বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য যে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে আরো বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যায়তনিক নাট্যকলা বিষয়ক বিভাগ চালু হয়েছে এবং পাঠদান হচ্ছে। তাদের পাঠক্রমে আমাদের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী নাট্য ইতিহাস ও চর্চার ধারা পাঠ্যসূচী হিসাবে সন্নিবেশিত হয়েছে গুরুত্বসহকারে।

অপর দিকে, ঢাকা থিয়েটার, গ্রাম থিয়েটারসহ সেলিম আল দীনের নাট্য দর্শনে উদ্ভুদ্ধ বেশ কিছু নাট্য সংগঠন ও নাট্যবোদ্ধা ইতিমধ্যে দেশজ নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের সড়ক ধরে হাঁটতে শুরু করেছে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই সড়কের পথ বেয়ে আমরা একদিন আমাদের অভিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব। যার কিছু নমুনা আমরা ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছি। উদাহারণ হিসাবে বলা যেতে পারে, ড. জামিল আহমেদসহ বিশিষ্ট নাট্যজন কর্তৃক প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রণিত ইংরেজি গ্রন্থ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ-নিবন্ধ। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক নাট্য ও ক্রীড়া উৎসবে আমাদের দেশজ নাট্যশৈলির উপস্থাপনা।

পদ্ধতিগতভাবে এই অঞ্চলের ভৌগলিক প্রাচীনতা, ইতিহাস, সমাজ-সভ্যতা, শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে নাট্যবিজ্ঞানকে তুলে ধরতে হলে; বিদ্যায়তনিক নাট্যকলার শিক্ষা ও তার ধারাবাহিকতায় ব্যাপক চর্চা অনিবার্য। নাট্যযুধিষ্ঠির জিয়া হায়দার এবং নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন তাদের জীবদ্দশায় পর্যায়ক্রমে যে দক্ষ জনশক্তি প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গড়ে তুলেছেন এবং বর্তমানে দেশব্যাপী তারই ধারাবাহিকতায় যে অনুশীলন প্রক্রিয়া চলমান আছে; তাতে এটা খুব জোর দিয়েই বলা সম্ভব যে, খুব নিকট ভবিষ্যতে আমরা পেতে যাচ্ছি; আমাদের শেকড় সন্ধানী ও ঐতিহ্যবাহী অথচ আধুনিক এক জাতীয় নাট্য ঘরনা।

জয়তু নাট্যযুধিষ্ঠির জিয়া হায়দার, জয়তু নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন।

লেখক: নির্দেশক, অভিনেতা ও উন্নয়নকর্মী।

Share This Post

আরও পড়ুন