রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন

চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটি নাটকীয় গুণ সম্পন্ন

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : রবিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২১
  • ১৬৪ Time View

বাংলাদেশে ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বহুল সমালোচিত ও অর্থনৈতিকভাবে সফল চলচ্চিত্র ‘অন্তর্যাত্রা’। বাংলাদেশে ডিজিটাল ফর্মেটে নির্মিত প্রথম কোনো চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রাকে ধরা হয়ে থাকে। চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এটি নাটকীয় গুণ সম্পন্ন, সে জন্য অনেকে এটাকে ‘ড্রামা ফিল্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

আমি বলব, দারুণ গল্প অবলম্বনে বিকল্প ধারার একটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের রীল টাইম ৮৬ মিনিট। সুন্দর একটি গল্পকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রটির কাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে গেছে।

অন্তর্যাত্রা’র প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- সময়ে মানুষ অনেক কিছু মেনে নিলেও মনে নিতে পারে না। দীর্ঘ দিন একই সাথে থেকেও কাছের মানুষের অভ্যাসের তারতম্য না বুঝে, নিজের ধ্যান-ধারণা চাপিয়ে দিয়ে, নিজের মতো করে গড়ে তোলার যে প্রবণতা, সে প্রবণতাকে কেউ সাদরে গ্রহণ করে আবার কেউ তা অগ্রাহ্য করে নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। সঙ্গী হিসেবে একাকীত্বকে অনেকে বরণ করে, নতুবা অভ্যাসগুলোর চর্চা করে একাকী জীবন কাটাতে চায়। দিন শেষে বুঝতে পারে, সুখী হতে চাইলে কিছু অভ্যাসকে জলাঞ্জলি দিতে হয়, করতে হয় ব্যক্তিগত কিছু ইগোকে কবরস্থ।

শিরীন-রফিক দম্পতি প্রেম করে বিয়ে করে। তাঁদের সন্তান থাকে একজন, সোহেল (রিফাকাত রশীদ তিয়াস)। সংসার জীবনে শিরিন (সারা যাকের) রফিকের কাছে একান্ত কিছু চাওয়া-পাওয়ায় বাঁধার শিকার হলে, সে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেদের মধ্যে ডিভোর্স নিয়ে নিবে। হয়েছেও তাই, ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর শিরিন বিদেশের মাটিতে সন্তানকে নিয়ে চলে যায়। ছেলেটা বিদেশি সংস্কৃতির সংস্পর্শে বড় হতে থাকে। এরই মধ্যে রফিকও নতুন সংসার পেতেছেন। দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন সালমাকে (রোকেয়া প্রাচী)। তাঁদের সংসারেও একজন মেয়ে রিনি (রাইসা নাওয়ার)। হঠাৎ এক দিন ফোন আসল, স্বামী মারা গেছেন। ছেলেকে নিয়ে শিরিন দেশে ফিরলেন। স্বামীর রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশ বিভূইয়ে ঢাকা হয়ে সিলেটে অনুষ্ঠানে যোগদান করলেন শিরিন ও তার পুত্র। শিরিন আস্তে আস্তে বিদেশ ফেরত হয়ে মা, মাটি ও মানুষের টান অনুভব করতে লাগলেন। কিছু দিন পর ফিরতি ফ্লাইটে ফেরার জন্য সিলেট থেকে ট্রেনে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। ট্রেনে থাকাবস্থায় মা-ছেলে দুই জনই নাড়ির প্রতি সমানে তীব্রভাবে ভালোবাসা অনুভব করতে লাগলেন। দেশে একেবারে ফিরবে কি, ফিরবে না, সেটা নিয়ে মনের সাথে মা-ছেলে মধ্যে মনোযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মায়ের অনুশোচনার কথা ছেলেকে বললেন, ছেলেও পরিস্থিতি বুঝে চুপ করে রইলেন। ট্রেন চলা অবস্থায় চলচ্চিত্রের সমাপ্তি।

অন্তর্যাত্রা চলচ্চিত্র থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মানুষ শিক্ষা-দীক্ষায় যতো উপরে অবস্থান করুক না কেন, যতো দূরে থাকুক না কেন, যতো ধরনের অভ্যস গড়ে উঠুক না কেন; দিন শেষে সে অনুশোচনার শিকার হয়, নীড়ে ফিরতে চায়, আপন ভূমিকে আঁকড়ে পড়ে থাকতে চায়, মনখোলে নিঃশ্বাস নিয়ে আপন মানুষদের সাথে বেঁচে থাকার তাগিদ অনুভব করে।

অন্তর্যাত্রায় অভিনয় করেছেন দেশের খ্যাতিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী সব। সারা যাকের, রোকেয়া প্রাচী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, আব্দুল মমিন চৌধুরী, নাসরিন আর করিম, হারল্দ রাশেদ, লক্ষণ দাশ, রিয়া মাহমুদ ও শিশুশিল্পী রাইসা নাওয়ার ও রিফাকাত রশিদ এবং অতিথি শিল্পী অনুশেষ ও বুনো প্রত্যেকের দুর্দান্ত অভিনয় নৈপূণ্যের কারণে চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠেছে একটি নান্দনিক শিল্প সম্পদ।

বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রে যেরূপ অভিনয় দরকার, সেরূপ অভিনয় দক্ষতা সম্পন্ন শিল্পীরা অভিনয় করে প্রশংসার দাবিদার হয়েছেন। রোকেয়া প্রাচীর কথা আলাদাভাবে না বললে নয়, থিয়েটারের মেয়েদের রক্ত মাংসে অভিনয় মিশে থাকে। ভালো কোনো ডিরেক্টর পেলে, তারা নিজেদের উপস্থাপন করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। অভিনেতার ভেতর থেকে অভিনয় বের করা আনা, একজন নির্মাতার বড়গুণ, সেক্ষেত্রে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ সে গুণে গুণান্বিত বলা যায়।

অন্তর্যাত্রা ২০০৬ সালে বাংলাদেশে মুক্তি পেলেও এক বছর আগে ২০০৫ সালে মুক্তি পায় যুক্তরাষ্ট্রে। চলচ্চিত্রটির সিলেটের আঞ্চলিক বাংলা ভাষা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় নির্মিত হয়েছে, অবশ্য সিলেটি ভাষার দুর্বোধ্যতা ও ইংরেজি ভাষার আধিক্যের কারণে সাব-টাইটেল ব্যবহার করা হয়েছে ,ফলে চলচ্চিত্র প্রেমী ও দর্শক মহলের কাছে চলচ্চিত্রটি অধিক বোধগম্য হয়েছে।

অন্তর্যাত্রা অনেকগুলো পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে সিনেফ্যান – এশিয়ান এবং আরব চলচ্চিত্র উৎসব, বিজয়ী- এশিয়ান এবং আরব প্রতিযোগিতার বিশেষ উল্লেখযোগ্য, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব বাংলাদেশ এ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ।

‘মাছরাঙ্গা প্রোডাকশান্স’ নিবেদিত ‘দি ব্রিটিশ কাউন্সিলের’ সহযোগিতায় তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, প্রযোজনা ও পরিচালনায় ‘অন্তর্যাত্রা’ চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রাহক ছিলেন গায়েতেইন রওসিয়াউ, শিল্প নির্দেশনায় তরুণ ঘোষ ও সিলভেইন নাহমিয়াস, সংগীতে হারল্দ রশীদ ও বুনো, রুপসজ্জায় মোহাম্মদ ফারুক।

রিভিউ দিয়েছেন নুরুন্নবী নুর,
প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Share This Post

আরও পড়ুন