শিরোনাম
স্যামসাং ও ডেইলি স্টারের যৌথ ক্যাম্পেইন ‘শিখরে ওঠার প্রত্যয়’ সিভাসুর বিভিন্ন সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা ১৫ জুন থেকে অনলাইনে কবিতা: আমার আমি । ইমতিয়াজ মাহমুদ নাঈম পরিকল্পিতভাবে ভাইকে ফাঁসানোর আগেই র‌্যাবের হাতে ধরা করোনাকালে ঈদুল ফিতরে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের করনীয় মোমেনবাগ ক্লাবের উদ্যোগে দুস্থ পথচারীদের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ মুরাদপুরে রক্তাক্ত গন্ডামারা: এক । শুরু থেকেই স্থানীয়রা এস আলম গ্রুপকে অবিশ্বাস করতে থাকে সিএমপির সন্ত্রাসী তালিকায় আবুল হাসেম বক্কর ও হাসান মুরাদ; যুবদলের নিন্দা ও প্রতিবাদ ফেনীতে ইসলামী হোমিওরিসার্চ সেন্টারের ৪১ দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন করোনা: দেশে ২৪ ঘণ্টায় মৃত ৩৩; নতুন সনাক্ত এক হাজার ২৩০ জনের
বুধবার, ১২ মে ২০২১, ০৫:০৮ অপরাহ্ন

চলচ্চিত্র রাজা রামমোহন: ধর্মকে প্রকৃতভাবে পালন করতে হলে প্রকৃত শিক্ষিত হতে হয়

নুরুন্নবী নুর / ৪৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১
রাজা রামমোহন চলচ্চিত্রের পোস্টার

নুরুন্নবী নুর: `রাজা রামমোহন’ একটি জীবনীভিত্তিক ঐতিহাসিক ভারতীয় বাংলা শিশুতোষ চলচ্চিত্র। ১৯৬৫ সালে ১৩৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের নাট্যধর্মী চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে রাজা রামমোহন রায়ের জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় ও কাজ, যেখানে ছিল তার তৎকালীন রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয় এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব। পাশাপাশি সবচেয়ে আলোচিত বিষয়, ‘সতীদাহ প্রথা’ বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টা। তখন হিন্দু বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে যেতে বা আত্মহুতি দিতে বাধ্য করা হত।

‘রাজা রামমোহন’ চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য বিষয় হল- ‘ধর্ম অবশ্যই শান্তির হবে। চাপিয়ে দেয়া কোন যৌক্তিক বিষয় না। স্বেচ্ছায় মানুষ ধর্ম ও নৈতিকতা চর্চা করবে। অহেতুক মানুষের বানানো কিছু গোঁড়ামি বা সংস্কার যখন একজন মানুষের উপর হস্তক্ষেপ করা হয়, তখন ধর্মের প্রতি মানুষের আস্থা কমে আসে। প্রত্যেকটা ধর্মের সুর একই, কোন ভেদাভেদ নেই। ধর্মকে প্রকৃতভাবে পালন করতে হলে প্রকৃত শিক্ষিত হতে হয়। অজ্ঞ, অশিক্ষিতরা কিছু মানুষের স্বার্থে তৈরি করা সংস্কার গলার তাবিজ বানিয়ে রাখে, ফলে বিভেদ তৈরি হয় মানুষে মানুষে, ধর্মে ধর্মে। ধর্ম বিভেদ তৈরি করে না, সাম্য তৈরি করে।’

‘রাজা রামমোহন’ চলচ্চিত্রের সারসংক্ষেপ: বাংলার নবজাগরণের স্রষ্টা ভারতের প্রথম আধুনিক পুরুষ ছিলেন রাজা রামমোহন রায় (বসন্ত চৌধুরী)। ১৭৭৪ সালে হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে তার জন্ম অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। বিশেষ করে আরবি, ফারসি, উর্দু, ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষায় তিনি অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি বেদান্তসূত্র ও বেদান্তসারসহ উপনিষদের অনুবাদ প্রকাশ করেন। তার অন্য রচনার মধ্যে আছে তুহ্ফাতুল মুজাহ্হিদদীন (একেশ্বরবাদ সৌরভ), মনজারাতুল আদিয়ান ( বিভিন্ন ধর্মের উপর আলোচনা), ভট্টাচার্যের সহিত বিচার, হিন্দুদিগের পৌত্তলিক ধর্মপ্রণালি ইত্যাদি। তাছাড়া তিনি সম্বাদ কৌমুদী, মিরাতুল আখবার ও বাহ্মণিকাল ম্যাগাজিন নামে তিনটি পত্রিকার প্রকাশকও ছিলেন।

আধুনিক ভারতের রুপকার রাজা রামমোহন তৎকালীন সমাজের সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গতিধারা গভীরভাবে পর্যবরক্ষণ করেন। নিজের চিন্তাধারার আলোকে নতুন সমাজ গঠনে প্রয়াসী হন। তিনি হিন্দু সমাজের সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা ও অন্য কুসংস্কার দূর করতে প্রচেষ্টা চালান। তাছাড়া তিনি সব কুসংস্কার দূর করে আদি একেশ্বরবাদের ভিত্তিতে হিন্দুধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। হিন্দু ধর্মের সংস্কার তথা নিজ ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে আত্মীয় সভা নামে একটি সমিতি গঠন করেন। ১৮২৮ সালে ২০ আগস্ট তিনি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এর পরে ব্রাহ্মসমাজের উপসনালয় স্থাপন করেন। তার ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা উপমহাদেশের ধর্মীয় ইতিহাসে এক নব যুগের সুচনা করে। শুধু সামাজিক আর ধর্মীয় বিষয় নয়, শিক্ষা বিস্তারেও তার অবদান ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজন ইংরেজি শিক্ষার। এ কারণে তিনি নিজে সংস্কৃত পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও ১৯২৩ সালে প্রস্তাবিত সরকারি সংস্কৃত কলেজের বিরোধিতা করেন। রাজা রামমোহন ১৮২২ সালে কলকাতায় ‘অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইংরেজি, দর্শন, আধুনিক বিজ্ঞান পড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। এ দেশের মানুষকে সংস্কৃত শিক্ষার বদলে আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লেখেন। তাছাড়া ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য ইংরেজ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত এক লাখ টাকা তিনি সংস্কৃত ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ব্যয় না করে আধুনিক শিক্ষায় ব্যয় করার জন্যও আবেদন করেন।

১৮৩৩ সালে ভারতীয় রেনেসাঁর স্রষ্টা রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর দুই বছর পর ১৮৩৫ সালে তার স্বপ্ন সফল হয়। ভারতীয়দের পাশ্চাত্য ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়।

‘রাজা রামমোহন’ চলচ্চিত্রে রাজা রামমোহন একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র। সেই চরিত্রে অভিনয় করেছেন বসন্ত চৌধুরী। রাজা রামমোহনের চরিত্র তিনি এতোটাই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, কখনো মনে হয়নি তিনি বসন্ত চৌধুরী। বসন্ত চৌধুরীর চমৎকার অভিনয়, সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তার পিতা রামকান্ত রায় চরিত্রে কমল মিত্রের অভিনয় সকলকে মুগ্ধ করে। তিনি ছিলেন একজন গোঁড়া হিন্দু ধর্মের উপাসক এবং বৈষ্ণবী। ছিলেন ধর্মীয় সংস্কার বিশ্বাসী একজন ব্রাহ্মণ। মাতা তারিণী দেবী চরিত্রে ছায়া দেবীর অভিনয় অসাধারণ। রামমোহনের মাতা ছিলেন ঘোর তান্ত্রিক ঘরের কন্যা। রামমোহন থাকতেন ব্রাহ্মসমাজ নিয়ে আর মা থাকতেন হিন্দুর সংস্কারের বিধি নিয়ে। দুইজনের মধ্যে একটা বিরাট দূরত্ব থাকলেও, মায়ের মন সব সময় ছেলের প্রতি উদাসীন ছিল। পরিবার তথা হিন্দু ধর্মের যাজক থেকে শুরু করে স্বধর্মালম্বীদের চোখে নাস্তিক বনে গেলেও রামমোহন নিজ দর্শন বা সত্য নিয়ে থাকতেন।

এ ছাড়াও অন্য পার্শ্ব অভিনেতাদের অভিনয় নিপূণতার কারণে ‘রাজা রামমোহন’ চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে সবার কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু। অন্য অভিনেতাদের মধ্যে ছিলেন বনানী চৌধুরী, রাজলক্ষী দেবী, উত্তরা দাস, রত্না ঘোষাল, বাসবী নন্দী, ছন্দা দেবী, রমা দাস, বাণী চট্টোপাধ্যায়, গীতা গুপ্তা, অসিত বরণ, তরুণ কুমার, প্রেমাংশু বসু, তিলক চক্রবর্তী, নীতিশ মুখোপাধ্যায়, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, কালী সরকার, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, হারাধন বন্দোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা, তরুণ বন্দোপাধ্যায়, নির্মল চট্টোপাধ্যায়, হরেন মুখোপাধ্যায়, নির্মল বন্দোপাধ্যায়, বঙ্কিম ঘোষ, ঠাকুরদাস মিত্র, মনি শ্রীমানী, সৌরেন ঘোষ, শিবেন বন্দোপাধ্যায়, মুকুন্দ চট্টোপাধ্যায়, বলাই মুখোপাধ্যায়, বিভূতি বন্দোপাধ্যায়, নীলকৃষ্ণ বন্দোপাধ্যায়, শ্রীপতি চৌধুরী, কার্তিক সরকার, নিমু ভৌমিক, জীবন ঘোষ, প্রদীপ দত্ত, গোপাল গঙ্গোপাধ্যায়, সুকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুবোধ মুখোপাধ্যায়, শৈলেন চট্টোপাধ্যায়, তাপস চট্টোপাধ্যায়, দেবনারায়ণ শর্মা, ভবশঙ্কর চৌধুরী, সরোজ মিত্র, কান্তি দত্ত, নির্মল ঘোষ, করণ বন্দোপাধ্যায়, কেনারাম বন্দোপাধ্যায়, পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, গণেশ সরকার, শক্তিপদ দত্ত, বিজয় সেন, মধু দত্ত, সুশীল রায়, বিশু চক্রবর্তী, চন্দ্রশেখর রায়, অরবিন্দ ভট্টাচার্য, রজত বসু, সুশীল রায়, সমরকুমার, মিন্টু চক্রবর্তী, সুনীতি দত্ত এবং অতিথি শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন ক্ষিতীশ ঘোষ, রঞ্জন সেন, বীরেশ্বর মিত্র, অংশু বন্দোপাধ্যায়, অনিল বরণ বোস ও নবীন পাইন প্রমূখ।

চলচ্চিত্রে আবহ সংগীত ও সংগীতের ব্যবহার খুবই বিচিত্র। নানা ধর্মীয় আবহে তৈরি চলচ্চিত্রের আবহ সংগীত ও সংগীত। যেহেতু রামমোহন জন্মে ছিলেন হিন্দুধর্মে, সেহেতু সেই সনাতন ধর্মের ধর্মীয় আবহটা একটু বেশি। চলচ্চিত্রে সনাতন হিন্দু ধর্মের উপসনালয়ের সুর ও ধর্মীয় শ্লোক ব্যবহার হয়েছে। নেপথ্য কণ্ঠদান করেছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু চৌধুরী, মিন্টু দাশগুপ্ত এবং ডক্টর গোবিন্দগোপাল। সংগীতে ছিলেন রবি রায় চৌধুরী এবং সংগীত পরিচালনায় রবীন চট্টোপাধ্যায়।

‘রাজা রামমোহনের জীবন যেমন বিচিত্র তেমনি পরিব্যাপ্ত। তার অখণ্ড রুপায়ণ আমাদের সাধ্যাতীত। এ শুধু সেই চিরঞ্জীব মহাপুরুষকে আমাদের প্রণাম নিবেন। অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন নিবেদিত চলচ্চিত্র ‘রাজা রামমেহন’। চলচ্চিত্রে গ্রন্থনায় ছিলেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, চিত্রগ্রহণে অজয় মিত্র, সম্পাদনায় বিশ্বনাথ মিত্র, শিল্প নির্দেশনায় কার্তিক বসু ও আরো অন্য কলাকুশলীবৃন্দ; সর্বশেষ চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন বিজয় বসু।

রিভিউয়ার: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

add

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ