বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ১২:১৩ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরের ৭০ কোটি টাকার ১০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ২৩টি ক্রেন ক্রয় দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

পরম বাংলাদেশ
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩৯৭ Time View

চট্টগ্রাম: নিয়মিত কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে প্রায় ৭০ কোটি টাকার ১০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ২৩টি ক্রেন কিনছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক)।

এর জন্য আগামী ২৫ নভেম্বর দরপত্র (টেন্ডার) জমা দেয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ক্রেন কেনার লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হলেও করিগরী শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৩০ মিটার বুমের স্থলে ১৮ মিটার বুমের ক্রেন সরবরাহের সংশোধনীও জারি করা হয়।

এ দিকে টোন্ডার আহ্বানের পর দরপত্র দাখিলের আগে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দিতে কারিগরী শর্তের বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কারণে ক্রয় কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে গোপন সমঝোতা করে গত ৮ নভেম্বর ক্রেনের ৩০ মিটার বুমের স্থলে ১৮ মিটার বুমের ক্রেন সরবরাহের সংশোধনীও জারি করা হয়।

বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে উচ্চমূল্যে কাজ দিতে প্রথম থেকেই চবকের দীর্ঘ দিনের প্রচলিত দরপত্র নীতিমালা উপেক্ষা করে দরপত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট দেশের নাম নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে এমন সিদ্ধান্তের কারণে এক দিকে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। অপর দিকে ইউরোপের দেশ ইতালিকে দরপত্রের বাইরে রাখায় আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হবে চবক- এমনটি বলেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

তবে এমন অনিয়মের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান আইনের আশ্রয় নিলে চবকের ৭০ কোটি টাকার দরপত্রের কার্যক্রম ঝুলে যেতে পারে। ফলে মালামাল হ্যান্ডলিংয়ের সরঞ্জাম সংগ্রহে দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

অপর দিকে প্রতিযোগিতা সীমিত করার কারণে চবকের আর্থিক অপচয়ের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।

দরপত্রে নির্ধারিত করে দেয়া অধিকাংশ দেশই এ ধরনের ক্রেন প্রস্তুতে অনভিজ্ঞ। ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্রেন প্রস্তুকারী দেশ ইতালির নামও দরপত্রে বাদ দেওয়া হয়। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে সফলতার সাথে দীর্ঘ দিন ব্যবহার হচ্ছে- এই ধরনের বিশ্বখ্যাত ক্রেন প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ দরপত্র দাখিলের অযোগ্য হওয়ায় প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বিশেষ প্রতিষ্ঠান তাদের ইচ্ছামত উচ্চমূল্যে দর উদ্বৃতি করার সুযোগ পাবে। এতে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হবে সরকারের, বন্দর নিম্ন মানের ইকুইপমেন্ট পাবে বলেও অনেকের ধারনা।

এ বিষয়ে ইতালির খ্যাতনামা মোবাইল ক্রেন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘লোকাটেলি ক্রেন’ এর স্থানীয় প্রতিনিধি মেসার্স এমএনএস এর মালিক মিজানুর রহমান এবং ম্যানেজার মো. তারেখ জানান, এ দরপত্র বন্দরের ক্রয় কাজের জন্য একটি নজির। বন্দরের এই ক্রয় কাজের শর্তের কারণে দরপত্র দাখিলের সুযোগ থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

তারা আরো জানান, দরপত্র দাখিল প্রতিযোগিতামূলক হবে এমন আশংকায় কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে উচ্চমূল্যে ক্রয় কাজ পাইয়ে দিতে তাদের প্রিন্সিপালে দরপত্র দাখিলের সুযোগ রাখেনি। আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে দরপত্র দাখিলের সুযোগ রাখেনি।

যে প্রতিষ্ঠানটি বন্দরে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন করে একচ্ছত্তভাবে ৭০ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, সে প্রতিষ্ঠানটি ইতিপূর্বে চবকের মোবাইল ক্রেন ক্রয়ের আরেকটি দরপত্রে সর্বনিম্ম দরদাতা মনোনীত হয়েছিল।

এর আগে চবকের ১০টি মোবাইল ক্রেন সরবরাহ কাজের চুক্তিতে ইকম ট্রেড হোল্ডিং (প্রা.) লিমিটেডের পক্ষে ইকম ট্রেড ইন্টারন্যশনালের মালিক মো. রফিকুল ইসলাম প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের ঢাকার গুলশান শাখায় দুই কোটি ৭৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকার জাল পারফরমেন্স চট্টগ্রাম বন্দরে দাখিল করেছিল। এ অভিযোগে ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এর উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম সিএমপির বন্দর থানায় প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা (নং-০৪/২০১৫) দায়ের করেন। এর পর ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারী আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

ওই মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার কারণে বন্দর কাজে অযোগ্য হওয়া ইকম হোল্ডিং (প্রাঃ) লিমিটেড ও ইকম ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম একই ঠিকানা ও মালিকানা নিয়ে ‘বাংলামার্ক’ নামক ভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে পুনরায় নতুন করে বন্দরের কাজ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলামার্কের ট্রেড লাইসেন্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামই বাংলামার্কের প্রোপাইটার।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির প্রাণ কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে ব্যাপক সুনাম অর্জনকারী একটি প্রতিষ্ঠান। এই বন্দরের দরপত্রের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দীর্ঘ দিনের প্রচলিত নিয়ম নীতি রয়েছে। তাছাড়া গত কয়েক বছর প্রভাবমুক্ত থাকায় কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই চবক তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট ক্রয় করে নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ২৩টি ক্রেনের এই দরপত্রের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে উচ্চমূল্যে কাজ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ক্রয় প্রতিযোগিতা সীমিত করার জন্য নিয়ম বর্হিভূতভাবে ইউরোপের নির্দিষ্ট ক্রেন প্রস্তুতকারী দেশ ইতালিকে বাদ দেওয়া এবং প্রি-বিড কনফারেন্সে অগ্রহণযোগ্য শর্তে গোপন সমঝোতায় পরিবর্তন করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

Share This Post

আরও পড়ুন