সোমবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২২, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন

ঘুরে আসুন সাজেক, খেয়াল রাখবেন কিছু বিষয়ে

  • প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২০
  • ২৬৪ Time View

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান : মেঘ ও পাহাড়ের লুকোচুরি খেলার এক অনিন্দ নিসর্গ সাজেক। প্রকৃতি এখানে প্রতিক্ষণ তার রূপ বদলায়, মেঘের পাল তোলা তরী এসে ভিড়ে পাহাড়ের গায়ে। কখনো তীব্র শীত আবার মুহূর্তেই বৃষ্টি। চোখের পলকেই চার পাশ ঘোমটা টানে সাদাকালো মেঘে। এ যেন মেঘের উপত্যকা, মেঘেদের রাজ্য আর নিজেকে মনে হয় মেঘের রাজ্যের বাসিন্দা। হয় তো মনের অজান্তেই খুঁজতে থাকবেন সাদা মেঘের পরী অথবা মেঘের মধ্যে পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলা রাজপুত্রকে। মন উদাস হয়ে হারিয়ে যাবে কোন অচিন রাজ্যে, কাউকে খুঁজে ফিরবে। এটা এক ভিন্ন বাংলাদেশ। বর্ষা পেরিয়ে শরৎ এসেছে। এটাই সাজেকে ঘুরার উপযূক্ত সময় যদি আপনি মেঘের আর পাহাড়ের লুকোচুরি দেখতে চান, ছুঁয়ে দেখতে চান মেঘের পরীকে, অবগাহন করতে চান ভেঁজা কুয়াশার অতল গহীনে। এ সময়ে পাহাড় আর মেঘের যে মাখামাখি মিতালী অনূভব, উপলব্ধি করতে পারবেন একান্ত একান্তে।

এবার বলি সাজেকের কথা। সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া কংলাক পাহাড়। চূড়ায় উঠতে উঠতে চোখের সামনে ভেসে উঠবে মিজোরাম সীমান্তের পাহাড় আর সবুজের মোহনীয় মিতালি। কংলাকের চূড়ায় উঠে চারপাশে তাকালে সত্যি সত্যি ভুলে যাবেন কিছু আগেও আপনি ছিলেন কোনো যান্ত্রিক নগরে দূষিত বাতাস, শব্দ এবং কর্কট সমাজে। আপনার মন, প্রাণ, দেহ পুলকিত হবে এক বিশুদ্ধ চিন্তা এবং অনুভূতিতে। সূর্যোদয় ও অস্ত দেখার সুখানুভূতি সারাজীবন মনে রাখবেন। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে অ-কবিও কবি হয়ে ওঠেন, অ-প্রেমিকও হয়ে ওঠেন প্রেমিক, একজন সচেতন ও অবচেতনে হয়ে ওঠেন উন্মাতাল, গুনগুন গান ধরেন মনের অজান্তে। একজন বৃদ্ধও সবুজের সুরা পান করে হয়ে ওঠেন তেজোদীপ্ত তরুণ। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর এবং জনপ্রিয় স্থান সাজেক ভ্যালি। বাংলাদেশের বৃহত্তম ইউনিয়নটি রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত। যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। এ ইউনিয়ন ভারতের ত্রিপুরা-মিজোরাম সীমান্তবর্তী এলাকা। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১৮০০ ফুট। এর অবস্থান রাঙ্গামাটি জেলায় হলেও খাগড়াছড়ি থেকে এখানে যাতায়াত অনেক সুবিধাজনক। কারণ খাগড়াছড়ি দীঘিনালা থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার। তাই ভ্রমণ পিপাসুরা দীঘিনালা থেকেই সাজেক যেতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সময়-সুযোগ পেলে ঘুরে আসতে পারেন এ নৈসর্গিক উপত্যকায়।

কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি রুটে বিভিন্ন পরিবহনের বাস চলাচল করে। গাবতলী, কলাবাগানসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে পরিবহনগুলোর কাউন্টার। ঢাকা থেকে বাস ছেড়ে চট্টগ্রাম রোড হয়ে কুমিল্লা, ফেনী পার হয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই হয়ে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছায়। এতে সময় লাগে ৮ ঘণ্টার মতো। আপনি ব্যক্তিগত গাড়িতেও আসতে পারেন। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যেতে হবে খোলা জিপে, যা চান্দের গাড়ি নামেই পরিচিত। দুদিনের জন্য ভাড়া করলে আপনাকে গুণতে হবে ৬ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা। চান্দের গাড়িতে আসন সংখ্যা ১২টি। সাজেক যেতে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে দীঘিনালা। দীঘিনালা নেমে আধাঘণ্টার জন্য ঘুরে আসতে পারেন হাজাছড়া ঝরনা থেকে। সাথে সেরে নিতে পারেন গোসলটাও। কারণ সাজেকে পানির খুব অভাব। তবে চিন্তার কিছু নেই, গোসল ও অন্য কাজের জন্য দরকারি পানি প্রতিদিন ট্রাকে করে পৌঁছে যায় সাজেকে। পানি ব্যবহারে সাজেকে আপনাকে মিতব্যয়ী হতে হবে। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালার দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। দীঘিনালায় একটি সেনানিবাস রয়েছে। এর পর বাকি রাস্তা আপনাকে যেতে হবে সামরিক বাহিনীর এসকর্টে। পাহাড়ের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তার স্বার্থে আপনাকে সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হবে। দীঘিনালা থেকে সেনাবাহিনীর এসকর্ট শুরু হয় সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। তাই ওই সময়ের আগেই আপনাকে পৌঁছতে হবে খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালায়। নইলে একবার সকালের এসকর্ট মিস করলে আবার এসকর্ট পেতে অপেক্ষা করতে হবে বিকাল অবধি। দীঘিনালা থেকে প্রথমে যেতে বাগাইহাট, তারপর মাচালং হাট হয়ে সরাসরি পৌঁছে যাবেন সাজেক। খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাজেক যেতে সময় লাগবে প্রায় আড়াই ঘণ্টার মতো। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলা এ ছোট জার্নিটি সাজেক ট্যুরের অন্যতম আকর্ষণ। চার দিকে শুধু পাহাড় আর হরিতের সমারোহ আপনাকে ভুলিয়ে দেবে পথের ক্লান্তি।

কিভাবে ঘুরবেন: সাজেক পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া করার পর দীর্ঘ যাত্রার শেষে আপনাকে একটু বিশ্রাম নিতেই হবে। এ ছাড়া সাজেকের কাঠফাঁটা দুপুরের রোদে না ঘোরাঘুরি করে রোদ পড়ার জন্য অপেক্ষা করাই ভালো। বিকালে জিপে করে আপনি ঘুরে আসতে পারেন সাজেক ভ্যালির আরও ভেতরে। সেখানে একটু উঁচু টিলায় উঠলেই উপভোগ করতে পারবেন সূর্যাস্ত। সাজেকের সন্ধ্যা নামে অপরূপ এক সৌন্দর্য নিয়ে। দেখবেন মেঘ মুক্ত নীলাকাশ একটু একটু করে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে আর মিটিমিটি করে জ্বলে উঠছে একটি দুটি করে তারা। দেখবেন অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে একটি-দুটি থেকে সহস্র তারা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠবে। হয়তো আপনি এরকম তারা ভরা আকাশ জীবনেও দেখেন নি। সন্ধ্যার তারা ভরা আকাশ দেখতে দেখতে মৃদুমন্দ হাওয়ায় চায়ের কাপে চুমুক দিলে আপনার হৃদয়ে যে অনুভূতি আসবে, সেটাই হতে পারে আপনার সাজেক ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আনন্দ। যারা ‘তারা’ দেখতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য সাজেক খুবই আদর্শ একটি জায়গা। এমন কি যারা এখনও মিল্কিওয়ে বা আকাশ গঙ্গা ছায়াপথ দেখেননি, তারাও সাজেক ভ্যালিতে এসে জীবনে প্রথম বারের মতো দেখা পেতে পারেন আকাশ গঙ্গার। ভোরে সূর্যোদয় দেখতে চাইলে হ্যালিপ্যাডে চলে যাবেন অবশ্যই। সে জন্য উঠতে হবে খুব ভোরে আর চলে যেতে হবে এক বা দুই নম্বর হ্যালিপ্যাডে। সাজেকে সূর্যোদয়ের সময় সোনালি আভা সাদা মেঘের ওপর যখন ঠিকরে পড়ে, তখন অসাধারণ এক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

কি কি বিষয় খেয়াল রাখবেন : •সঠিক সময়ে এসকর্ট স্থলে হাজির হওয়া। •মনে রাখবেন সেনা বাহিনীর ক্যাম্পের ছবি তোলা যাবে না। •স্থানীয় লোকজনের ছবি তোলার আগে সৌজন্য করে অবশ্যই অনুমতি নিয়ে নেবেন। •ছুটির দিনে কটেজ পাওয়ার ঝামেলা এড়াতে বেশ কয়েক দিন আগে (এক মাস) বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। •যোগাযোগের জন্য রবি, এয়ারটেল বা টেলিটক সিম সঙ্গে রাখবেন। •সঙ্গে অবশ্যই অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র রাখবেন। •সঙ্গে করে পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে যাবেন। কারণ বুঝতেই পারছেন সব সময় বিদ্যুৎ নাও পেতে পারেন। •জিপের ছাদে বা মোটরসাইকেলে অবশ্যই সতর্ক থাকবেন। •দুই-তিন দিনের জন্য সাজেক গেলে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করার দরকার নেই, সাধারণ যাত্রীর মতই যাবেন, গাড়ি পর্যাপ্ত আছে, পয়সা বাঁচবে। •শুধু যাওয়ার জন্যই গাড়ি নিবেন। আসার সময় অন্য গাড়িতে আসতে পারবেন। •জেনে রাখা ভাল দীঘিনালা থেকে ফোন করেও গাড়ি নেওয়া যাবে।

বাড়তি পাওনা হিসেবে দেখতে পারেন: খাগড়াছড়ি জেলার দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা, দেবতার পুকুর, হর্টিকালচার পার্ক, তৈদুছড়া ঝরনা, বিডিআর স্মৃতিসৌধ, মায়াবিনী লেক ও শান্তিপুর অরণ্য কুঠির। সাজেকের পাশাপাশি এ সব জায়গাও ঘুরে দেখতে পারেন।

লেখক : উপ প্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, পিআইডি, চট্টগ্রাম।

Share This Post

আরও পড়ুন