মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২, ০৪:০৪ অপরাহ্ন

ধারাবাহিক গল্প: তোমায় ভালোবেসে । শাশ্বতী ভট্টাচার্য

শাশ্বতী ভট্টাচার্য
  • প্রকাশ : বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৩২৩ Time View

মাথার উপর প্রখর রোদ, এ দিকে বাসের অপেক্ষায় পা ব্যথায় টনটন করছে। এবার মনে হচ্ছে রোদে পুড়ে গায়ের রঙটা পুরোই যাবে।ওইতো শ্রীমঙ্গলের বাস দেখা যাচ্ছে।
উঠে পড়ি, পরে যা হবার হবে।

বাসে উঠে দেখলাম ডান পাশের মাঝ খানের দুটো সিট খালি। যা গরম পড়েছে, জানলার পাশের সিট নিলেই ভালো হয়। এদিক ওদিক না ভেবে সিটে বসে পড়লাম। বাস তার মতো করে চলতে শুরু করলো।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সুমধুর শব্দে নিজেকে ঘুম রাজ্য থেকে জাগ্রত করলাম। পাশে তাকিয়ে দেখলাম শ্যাম বর্ণের মাঝারি গড়নের এক রমণী আমায় অতি মধুর সুরে ডেকে বলছে-
–আমি জানালার পাশ ছাড়া বসতে পারি না, আপনি কি দয়াকরে এই পাশে সিটে বসবেন।
এত মিষ্টি করে অনুরোধ করা দেখে
আমি তাকে জানালার পাশের সিট ছেড়ে দিয়ে বিপরীত পাশে বসলাম।

আমার একটা বদ অভ্যাস হচ্ছে যেখানে সেখানে সিগারেট খাওয়া। তাই ঘুম থেকে উঠার পর সিগারেট যেই ধরাতে যাবে ঠিক তখনি পাশ থেকে ‘কন্ট্রাক্টার’ বলে চিৎকার করে আওয়াজ ভেসে এলো। আমি রীতিমত ভয় পেয়েয়ে তাকে জিজ্ঞাস করলাম – কি হয়েছে?
সে তখনি আমার দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে বলছে-
–বাসে সিগারেট খাওয়া অন্যায়, আপনি কি জানেন না..?
আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি।
–কি হলো, চুপ করে আছেন কেনো..? তার উপর একটা মেয়ের পাশে বসে আপনি সিগারেট খাচ্ছেন, আশ্চর্য !

-আমি তো সিগারেট ধরাই নি, খেলাম কখন..?
–বের করে হাতে তো নিয়েছেন।
-আচ্ছা, আমি রেখে দিচ্ছি। সিগারেট খাব না, খুশি?
(মুখে ভেংচি কেটে জানালার দিকে মুখ করে বসে রইলো)

ভেবেছিলাম গল্প করতে করতে সারা রাস্তা পার করবো। কিন্তু এই তো দেখছি ধানিলঙ্কা, গল্প তো দুরের কথা, ভুলে যদি গায়ের সাথে গা লেগে যায় সোজা জেলে ভরে দিবে মেয়ে।

কিছু দূর যাওয়ার পর বাস ড্রাইভার রুলস ভেঙ্গে গাড়ি চালানো শুরু করলো। বাস যাত্রী বার বার বলার পরেও ড্রাইভার একই কাজ করলো। মাঝপথে নেমে যাওয়াটাও বোকামি হবে। সন্ধ্যা সাতটা, এই সময় নেমে গাড়ি পাওয়াটা এত সহজ হবে না। তাই চুপ করে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নেই।

রাত ১২ টা, শ্রীমঙ্গল বাস স্টেশন গাড়ি থামলো।সবাই যে যার মতো নেমে যাচ্ছি।
রাস্তা পার হবার সময় হঠাৎ একটা প্রাইভেট কার……..
………………………………………………
ভাইয়া উঠনা, ভাইয়া। আর কতো ঘুমাবি, অনেক বেলা হলো। এরপর বাবা বকবে, ভাইয়া।
– হুম,,সকাল হয়ে গেছে..?
–জ্বি, জাঁহাপনা সকাল হয়ে গেছে। তোর চোখ মুখের এই অবস্থা কেনো, ভয় পেয়েছিস তুই ভাইয়া..?
– না, ও কিছু না..
— রাতে তুই আবার একই স্বপ্ন দেখেছিস, তাই না..
– আমিতো সেই রাতের কথা মনে করতে চাই না, তবুও কেনো বার বার ভেসে উঠে বলতে পারিস..?
— এখন থাক এগুলো, তুই রেডি হয়ে নে। আম্মুকে নিয়ে আসার জন্য তোকে ঢাকা যেতে হবে আজ। বেশি দেরি হলে বাস ধরতে পারবি না।
– বাস…….ঢাকা,, এই খান থেকেই তো সব শুরু হয়েছিল…
— ভাইয়া প্লিজ, এইসব বাদ দে। আমি নাস্তা দিচ্ছি, রেডি হয়ে খেয়ে নেয়।

ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে দেখি, আব্বু খাবারের টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে হাতে খবরের কাগজ নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা খুঁজছে। আব্বুকে সালাম দিয়ে খাবারের টেবিলে বসলাম।
খানিকটা গম্ভীর গলায় কেশে নিয়ে আব্বু বললো – তোমার খালামণি একটু আগে ফোন দিয়েছিলো। শুক্রবার শেলীর বিয়ে, তাই তোমাদের আম্মুকে বিয়ের পর নিয়ে আসার অনুরোধ করলো।
– আব্বু, আমি কি আজকে তাহলে যাচ্ছি না..?
— না, দুদিন পর আমরা সবাই এক সাথে বিয়েতে যাবো।
– জ্বি, আব্বু।
রুপ্সা খুব খুশি। বড় ভাইয়ার পর আমাদের বাড়িতে এটা দ্বিতীয় বিবাহ। তবে আমি ভাবছি বড় ভাইয়া কি জানে শেলীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।যদিও জানলে তেমন কিছু করার নেই ভাইয়ার।
………………………
চাচ্চু, চাচ্চু তোমার ফোন নিবা না…?
‘ঈশান’ বড় ভাইয়ার ছেলে। আর আমাদের সবার চোখের মণি।
একটা সময় এই বাচ্চাটার উপর অনেক চিৎকার,, রাগারাগি করছি। এখন সেগুলো ভাবলে নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী মনে হয়। এখন আর ফোন চাইলে বলি না চার্জ দিতে হবে। কারণ এখন আমি জানি কেউ আর আমার ফোন কলের অপেক্ষায় রাতের প্রহর গুনে না।রাত জেগে কথা না বললে কারোর এখন আমার উপর অভিমান হয় না। কেউ এখন মুখ ভার করে বসে থাকে না আমার জন্য দিন রাত এক করে। এক রাশ কষ্ট লুকিয়ে রেখেছি মনের খুব গভীরে।চাইলেও কাউকে ধার দিতে পারছি না,, মুছেও ফেলতে পারছি না তোমার রেখে যাওয়া শুকিয়ে থাকা দাগ।

‘ভাইয়া’ এই ভাইয়া..
– হা বল, শুনছি।
— কোথায় হারিয়ে গিয়েছিস তুই..?
– কই, না তো। কফি দে..

‘অদ্রিজ’ অনেকদিন হলো। লাইফটা নতুন করে শুরু করো। এভাবে আর কতো দিন..?

আমি মাথা নিচু করে আছি, আব্বুর কথার উপর কখনো আমরা কেউ কথা বলি না। জীবনে প্রথম যে দিন আব্বুর মুখের উপর কথা বলেছিলাম সে দিন বুঝতে পারিনি, কতো বড় অন্যায় কাজ করেছি। আমার একটা ভুলের জন্য সে দিন আব্বুকে হারাতে বসেছিলাম আমরা সবাই।
খানিকটা চুপ থেকে, মাথা নেড়ে আব্বুর প্রশ্নের জবাবে ‘হা’ বললাম।

আব্বু চেয়ার থেকে উঠে নাস্তা না করেই চলে গেলো।

‘ভাইয়া’ তোকে কতো বার বলেছি, আব্বুর সামনে উদাসীন হস না।

– কফিটা খাবো না। ভালো লাগছে না।
টেবিল থেকে উঠে রুমে চলে আসলাম। অফিসের অনেকগুলো কাজ জমা পড়ে আছে। তাই ল্যাপটপ নিয়ে কাজে বসলাম। কাজ করতে করতে হঠাৎ করে একটা ইমেইল আসলো। ইমেইল সিন করতে গিয়ে দেখলাম নামটা খুব পরিচিত। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। চোখের সামনে এভাবে অতীত আরো একবার দেখা দিবে তা কল্পনা করিনি কোনো দিন। আজ এত বছর পর আবার সেই পুরোনা স্মৃতি একটা একটা করে মনে পড়ছে।

‘ভাইয়া’…….
রুপ্সার ভয়েস শুনে ল্যাপটপ অফ করে দিলাম।
– কিছু বলবি..?
— আজ বিকেলে একটু বের হবো। নিয়ে যেতে পারবি তুই..
– আচ্ছা, তুই রেডি হয়ে থাকিস।

রুপ্সা খুশিতে লিস্ট করতে করতে নিচে চলে গেলো।

অথচ একটা সময় নিজের বোনের এই খুশিটা আমার কাছে বিরক্ত মনে হতো। আবদার ছিল অনেক কিন্তু পূরণ করতে পারিনি কিছুই। যদি সেই ছোট বেলার সময়গুলো আরো একটি বার ফিরে পেতাম! তাহলে তোমার সাথে রোজ বিকেলে হাঁটতে বের হওয়ার জন্য বোনকে ‘কাজ’ নামক মিথ্যা কথা বলতাম না। তোমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখার সুযোগ নিতে বোনের চোখে অশ্রু ঝরতে দিতাম না। যদি আরো একটি বার সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম, তাহলে বোনের জমানো টিফিনের টাকা চুরি করে তোমায় নিয়ে ফুচকা খেতে বের হতাম না। বোনের হাতের চুরি কিনে দেবার নাম করে তোমার ফোনে ফ্লেক্সিলোড করতাম না। যদি সত্যি সেই সময়গুলো ফিরে পেতাম, তাহলে দিনের পর দিন প্রাইভেটের নাম করে বাবার থেকে টিউশন ফিস নিয়ে তোমার জন্য দামি গিফট কিনতাম না, ‘স্নিগ্ধা’।

তুমি যখন ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, তখন নিজেকে খুব শুন্য মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বুজতে পেরেছিলাম, সকল শুন্য জীবনে শুন্যতা তৈরি করার জন্য আসে না। কিছু শুন্য পূর্ণতা করতেও সাহায্য করে।

(চলবে…)

[আপনার লিখা অপ্রকাশিত গল্প এই rinquoctg@gmail.com ই-মেইলে পাঠান। নাম, পরিচিতি, ঠিকানা, ছবি ও মোবাইল নাম্বারসহ। লিখা অবশ্যই ইউনিকোডে হতে হবে]

Share This Post

আরও পড়ুন