মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন

গরীবের ঈদ যাত্রায় লাশের স্তুপ

ফজলুল কবির মিন্টু
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ মে, ২০২১
  • ১৬৬ Time View
ফজলুল হক মিন্টু

বাংলাদেশে এখন করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। এ অবস্থায় জনস্বার্থে সরকার দেশ ব্যাপী বিধি-নিষেধ ঘোষণা করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনা মহামারির আগে দেশে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী সাড়ে তিন কোটি ছিল। করোনার আঘাতে গত এক বছরে আরো দুই কোটি ৪৫ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে। সে হিসাবে দেশে এখন অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রায় পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ। এ পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং তাদেরকে জীবন জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিনই ঘর হতে বের হতে হয়। বিধি-নিষেধ ঘোষণার আগে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা নিয়ে সরকারের একটা পরিকল্পনা থাকা খুব জরুরী। কিন্তু আমাদের সরকার হতভাগ্য এসব দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকার বিষয়টা খুব বেশি গুরুত্ব সহকারে ভাবেনি বলে অবস্থা দৃষ্টে প্রতীয়মান হয়। ফলে কখনো শীতল বিধি-নিষেধ কিংবা কখনো কঠোর বিধি-নিষেধ দিয়েও সরকার পুরো বিষয়টা লেজে গোবরে করে ফেলেছে। তার সর্বশেষ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে, দেশের হত দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের ঈদ যাত্রায়।

সরকারের পক্ষ থেকে বিধি-নিষেধ ঘোষণা দিয়ে দিন মজুর, নির্মাণ শ্রমিকসহ যারা দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল, যারা ঘর থেকে বের না হলে জীবন চলবে না, তাদেরকে বলা হল ঘরে থাকতে হবে। আবার পোশাক কর্মীসহ অন্য সেক্টরে যারা কলকারখানায় চাকরি করে, তাদের বলা হল কাজে যেতে হবে। এ যেন সরকারের দ্বিমুখী নীতি। ফলে সরকারের কখনো নরম কখনো গরম বিধি-নিষেধ ঘোষণা কার্যত নিষ্ফল বিধি-নিষেধে পরিণত হল। দিন মজুররা জীবন বাঁচাতে আর কলকারখানা শ্রমিকরা চাকুরী বাঁচাতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কাউকে ঘরে আটকে রাখা গেল না।

সরকার আন্ত:জেলা বাস চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, যাতে মানুষ ঈদে গ্রামের বাড়ি যেতে না পারে। কিন্তু প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস চলাচল উম্মুক্ত করে দেয়। অর্থাৎ যাদের কার বা মাইক্রোবাস আছে তাদের জন্য গ্রামে ঈদ উদযাপনে আর বাধা রইল না। তাই সোভাগ্যবান কোন এক মাইক্রো বাস মালিকের আত্মীয়কে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ১১ মে বেলা সাড়ে ১১টায় পাঁচ নম্বর ফেরি ঘাট দিয়ে ঢাকায় ফিরছিল জনৈক মাইক্রোবাস ড্রাইভার। তীব্র কাল বৈশাখীর ঝড়ে ফেরির তার ছিঁড়ে গেলে ফেরির প্লটুনে দাঁড়িয়ে থাকা মাইক্রোবাসটি নদীতে চলে যায়। মাইক্রোবাসের ভিতরে থাকা হতভাগা ড্রাইভারের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো জানা যায়নি। এখনো পর্যন্ত ড্রাইভারের কোন হদীস পাওয়া যায়নি। যদি অলৌকিক কিছু না ঘটে তাহলে হয়তো ড্রাইভারের নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে। কাল শুক্রবার ঈদ উদযাপন হবে। সবাই যে যার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে কিন্তু হতভাগা ড্রাইভারের পরিবারের খবর কেউ কি রাখবে?

গত কয়েক দিন ধরে দেখছি, ফেরিতে কী দুঃসহ গাদাগাদি করে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। তদ্রূপ গাদাগাদি করে ছুটে চলা মানুষের ঢল ১২ মে মাদারীপূরেরে বাংলা বাজারে ফেরি থেকে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ঘটনাস্থলে পাঁচ জন এবং পরবর্তী আরো দুইজনসহ মোট সাত জনের মৃত্যু ঘটে। মুহুর্তেই গরীব মানুষগুলোর ঈদ যাত্রা লাশের স্তুপে পরিণত হয়। নিহতদের দাফন কাফন ও সৎকারের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আর কোন সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া যায়নি। অসহায় মৃত মানুষগুলোর আপাতত মূল্য ২০ হাজার টাকা মাত্র। ভবিষ্যতে আরো বাড়ে কিনা সময় বলে দিবে।

লেখক: সংগঠক, টিউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Share This Post

আরও পড়ুন