মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন

করোনা আতঙ্ক আমাদের ঐতিহ্যগতভাবে লালিত মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দিয়েছে

মো: আবুল হাসেম খান
  • প্রকাশ : সোমবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২১
  • ১৫৬ Time View

আমাদের সমাজে একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে বয়স্ক ব্যক্তিদেরকে মর্যাদার চোখে দেখা হয়। বার্ধক্যকালীন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় এই মানুষগুলো পরিবারের সবার আদর-যত্নে নিজ পরিবারের সদস্যদের কোলে মাথা রেখে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করেন। এটি আমাদের ঐতিহ্যগতভাবে লালিত মূল্যবোধ। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সামনে এই নীতি-নৈতিকতাগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। তাহলে একটা মানবিক পারিবারিক, উন্নত সামাজিক ব্যবস্থা বিকশিত হবে।

নিয়তির অমোঘ নিয়মে আজকের শিশু-কিশোররা যৌবন শেষে বাধ্যর্ক্যে উপনীত হয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেবে। তাই শেষ বয়সে সব মানুষকে তার যৌবনকালের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করতে হবে।

সরকার বয়ষ্ক নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনীর আওতায় এনে বয়ষ্ক ভাতা চালু করেছে। এই মাসিক ভাতার টাকার পরিমাণ এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় আনুকল্যের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী সমাজে বয়ষ্ক মানুষদের প্রতি মানবিক হতে সহায়ক হবে।

কিন্তু নগর সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে ব্যবসায়-চাকুরীর সুবাদে মানুষেরা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাধারনতঃ ঘর ভাড়া নিয়ে শহরে বসবাস করে। নানা কারণে শহুরে মানুষেরা বাসা বদল করে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করে। ফলে একই ফ্লাটে বসবাস করেও একজনের সাথে আরেকজনের গভীর কোন বন্ধুত্ব গড়ে উঠে না। একজনের ঘরে মৃত্যুর কান্নার রোল এর বিপরীতে অন্য ঘরে বিয়ের আনন্দ উৎসবে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। শহুরে পরিবেশে একক পরিবারগুলোতে বয়স্ক বাবা-মা, দাদা-দাদীর প্রতি তেমন নজর দেয়া হয় না। তাদের পারিবরিক বন্ধন খুব দৃঢ় থাকে না। ফলে বয়ষ্ক ব্যক্তিদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

করোনাকালের দূর্যোগে বয়ষ্ক ব্যক্তিরা বেশী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের সামনে একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতি দেখা দেয়। তখন তারা মানসিকভাবে বেঙ্গে পড়ে। তাই করোনাকালে বয়ষ্ক ব্যক্তিদের প্রতি আমদের অধিক যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। করোনাকালে তাদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপত্তার সাথে ঘরে অবস্থান করতে সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন। আমরা বাইরে থেকে এসে সরাসরি তাদের ঘরে যাব না। তারা যাতে করোনা আক্রান্ত না হন সে কারণে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে স্বাস্থ্যবিধি জেনে-বুঝে মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যত নাগরিক। বয়ষ্ক ব্যক্তিরা তাদের সারা জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শিশুদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেন। দেশ ও সমাজ বিনির্মাণে তাদের সারা জীবনের পরিশ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষাকে মর্যাদা দিতে হবে। তাদের চলাচল/যাতায়াত, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ সব ধরনের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। এভাবেই পরিবারে, সমাজে একটা উন্নত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিন্তু করোনাকালে করোনা সন্দেহে বয়স্ক মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে আসার অমানবিক ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। করোনা আতঙ্ক আমাদের ঐতিহ্যগতভাবে লালিত মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ সব ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবন্থা করতে হবে। এ ধরনের বেআইনী ঘটনা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সামনে একটা নেতিবাচক শিক্ষার উদাহরণ, যা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে।

সামাজিক মূল্যবোধের এ অবক্ষয় রোধ করার জন্য স্কুল-কলেজের মাধ্যমে শিক্ষাথীদের নীতি – নৈতিকতা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মায়া-মমতা, ভালবাসার ভিত্তিতে একটা মানবিক সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বার্ধক্যকালীন নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ফিজিওথেরাপি সেবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের সমাজে তেমন সচেতনতা নেই। পেলিয়েটিভ কেয়ার/সাপোর্টিভ কেয়ার/সহায়ক চিকিৎসা/কমফোর্ট কেয়ার এর মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক মূল্যবোধ সুষ্টি করতে সবাই এগিয়ে আসি।

লেখক:
মানটরিং অফিসার
উৎস, চট্টগ্রাম।

Share This Post

আরও পড়ুন