সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ০৬:৩৬ অপরাহ্ন

করোনায় ভাল নেই মানুষের মন; তবুও আনন্দময় হোক আমাদের ঈদ উৎসব

আবছার উদ্দিন অলি
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ জুলাই, ২০২১
  • ৭৯ Time View
আবছার উদ্দিন অলি

আবছার উদ্দিন অলি: বছর ঘুরে আবার এল পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। সুখ, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে এ উৎসব। সব ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত হওয়ার দিন। পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ অমলিন হোক। ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সব মুসলমান মিলেমিশে ঈদের আনন্দ সমভাগ করে নেন, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ভুলে খুশি মনে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করেন। করোনাকালীন এ কঠিন সময়ে আমাদের সবাইকে মানবিক হতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের চিন্তা ভাবনায়ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস সবকিছুই উলটপালট করে দিয়েছে। এবার অন্য রকম ঈদ-উল-আযহা উদযাপিত হবে। স্বাস্থ্য বিধি ও সামাজিক দূরত্ব আর সরকারের দেওয়া নিয়ম-কানুনের মধ্য থেকে ঈদ-উল-আযহা পালন করতে হবে। একেবারে গরুর হাটে গরু কেনা থেকে শুরু করে জবােই এবং বিতরণ পর্যন্ত সবকিছুতেই মানতে হবে সরকারের দেওয়া নিয়মনীতি।

২১ জুলাই বুধবার ১০ জিলহজ্ব পবিত্র ঈদ-উল-আযহা। ঈদ-উল-আযহা মূলত: ধর্মীয় উৎসব হলেও বাহ্যিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানের দিক থেকে এটি প্রায় ঈদুল ফিতরের অনুরূপ। ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এ দিনেও থাকে আনন্দ উৎসব। ঈদ-উল-আযহা মানে শুধুমাত্র গরু-ছাগলের মাংস ভক্ষন নয়, ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ারও সময়। তাই কোরবানীর মূল দর্শন থেকে সরে গিয়ে ঈদ-উল আযহাকে অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় না নেয়াই ভাল। করোনার কারণে সারা পৃথিবী জুড়ে পরিবর্তন এসেছে। আমরাও এর বাহিরে নয়। তবে ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনেই আমাদের সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

করোনার কারণে বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার, বিমানের অগ্রিম টিকিট বিক্রির কোন হাকডাক নেই। নেই মসলা বাজারের উত্তাপ। কোরবানীর সংখ্যাও এবার কমে এসেছে। মানুষের হাতে টাকা নেই। নেই আয় রোজগার। দীর্ঘ দেড় বছরের করোনার যুদ্ধে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। আয় কমেছে অনেকের। করোনা ভাইরাস যেহেতু এখন আন্তর্জাতিক ভাইরাসে পরিণত হয়েছে, সেখানে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থেরও গতি কমেছে। তাই করোনা ভাইরাসের কারণে এবারের ঈদ-উল-আযহায় ঘটেছে ব্যাপক ছন্দপতন। স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে গরুর হাটগুলোতেও এসেছে নতুন নিয়মনীতি। সবাইকে অনলাইনে গরুর কেনার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। গরু জবাই করার পর কসাইকে দিয়ে এত দিন কাজ করানো হলেও এবার অনেকেই নিজেরাই কাজ করবে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য বিধির কারণে। তবে গরুর হাটে কতটুকু স্বাস্থ্য বিধি মানা হচ্ছে, সেটাই এখন প্রশ্নের বিষয়?

ঈদ মানে খুশী। এক অনাবিল আনন্দ বছরে অনন্ত: এ একটা দিন সবাই মিলে উপভোগ করে খাওয়া-দাওয়া এবং বেড়ানোর নির্মল আনন্দ। এবারের ঈদ-উল-আযহাও চিরায়ত আনন্দ উৎসবের আমেজে থাকবে পরিপূর্ণ। বছরের সবচেয়ে ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহার দিনে সবচেয়ে বড় আনন্দ পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলিত হওয়া। আর ঈদ মওসুমের বড় বিড়ম্বনা দূর-দূরান্ত থেকে বাড়ী ফেরা। শিক্ষা কর্মসূত্র বা বিভিন্ন উপলক্ষে যারা চট্টগ্রামে অবস্থান করেন তারা সবাই ফিরবেন বাড়ীতে পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী পরিবার-পরিজনের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগের জন্য। কিন্তু যাত্রাপথে হয়রানীর কি শেষ আছে? নানা ঝামেলা হয়রানিতেও আনন্দ প্রায় ম্লান হয়ে যায়। রেলে, বাসে হয়রানী, দূর্ঘটনা আরো কত কি? তবে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে লোকজন অন্য জেলায় যাওয়ার ব্যাপারেও সরকারের বিধি নিষেধ রয়েছে। তা নাহলে করোনা সংক্রামক আবারো বেড়ে যেতে পারে। কোরবানীর ঈদে মানুষের বাড়ী যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে করোনার বিস্তার ঘটবে।

ঈদ-উল-আযহার কোরবানিকে ঘিরে জমে উঠেছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পশুর হাট সাগরিকা ও বিবিরহাট গরুর বাজার। ইতোমধ্যে উত্তরবঙ্গ থেকেও গরু নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার খামার থেকেও গরু আনা হয়েছে বিক্রির জন্য। মাঝারি এবং ছোট সাইজের গরু বিক্রি বেশি হচ্ছে। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে বাজারে ক্রেতা সমাগম নেই। যারা বাজারে না গিয়ে গরু কিনতে চাইছেন, তারা ঝুঁকেছেন ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন পেইজ ও গ্রুপের দিকে। সেখানে পোস্ট করা কোরবানির গরুর পছন্দ করে মুঠোফোনেই সেরে নিচ্ছেন দর-দাম। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সর্বোচ্চ গরুটি এবার কোরবানীর ঈদে বিক্রি করা হবে। গরুটির নাম রাখা হয়েছে বাদশা আলী। দাম ২৫ লাখ টাকা দাম হাকিয়েছে। যার ওজন ৩১ মন। আরেকটি গরু ফয়েজ’ লেকে পাওয়া যাচ্ছে, গরুটির নাম বিজয়, দাম ২৬ লাখ টাকা। এভাবে নগরীর অসংখ্য খামার গুলোতে ছোট বড় গরু ঈদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ গরু রয়েছে। দামও রয়েছে ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত গরু থাকাতে এবার তেমন একটি দাম বাড়বে না গরুর।

দেশের অন্য স্থানের চেয়ে চট্টগ্রামে পবিত্র ঈদ-উল-আযহার উৎসব পালিত হয় একটু ভিন্নভাবে। বিশেষ করে নগরীতে এবং বর্তমানে গ্রামেও কোরবানীর পশু কেনা নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা পড়ে যায়। পশুর সাইজ (আকার) নিয়েই মূলত: এ প্রতিযোগিতা অর্থাৎ বিত্তবানরা কে কত বড় পশু ক্রয় করলো, কে কত বেশী দাম দিয়ে ক্রয় করলো এসব নিয়ে নগরীর বিভিন্ন পাড়ায়-পাড়ায়ও চলে আলাপ। এ ধরনের প্রতিযোগিতা অনাকাঙ্খিত এবং বাড়াবাড়ি। এতে হয় কি কোরবানীর বড় বাজেটের জন্য অনেক বড় রকম দুর্নীতিও করেন। দূর্নীতি করে কোরবানীর পশুর সাইজ বড় করার কি দরকার? বেশী করে মাংস খাওয়ার জন্য? যারা সারা জীবনই মাংস খাওয়া থেকে বঞ্চিত তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

গরু, ছাগল বেচা-কিনার পালা শুরু হয়েছে। এবার এগুলো জবাই করে কোরবানী দেওয়া আর সেই কোরবানীর পশু অধিকাংশ জবাই করা হয়ে থাকে নগরীর বিভিন্ন রাস্তা-ঘাটে। গরু-ছাগলের মলমূত্র নানা রকম ময়লা আবর্জনায় নগরীতে এক বিশ্রি দুর্গন্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়। যত্রতত্র ময়লা ফেলে পরিবেশটা নষ্ট করা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একটু সচেতন ও বাড়তি কিছু পরিশ্রম করলে সমস্যাটা হয় না। জবাই করার পর ভাল করে পানি দিয়ে ধুয়ে ব্লিসিং পাউডার ছিটিয়ে দিলে অনেকটা ভাল থাকে পরিবেশ।

আপনার আশে-পাশের পরিবেশ আপনারই। সিটি কর্পোরেশনের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা জানান, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত লোকবল এবং গাড়ী ভ্যানসহ ময়লা আবর্জনাবাহী গাড়ীগুলোকে খুব দ্রুত কাজ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নগরীকে পরিস্কার রাখতে সিটি কর্পোরেশন যাবতীয় ব্যবস্থা ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে। যেখানে সেখানে গরু জবাই এবং চামড়া বিক্রি রোধ করার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিম ঈদের দিন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়োজিত থাকবে। পরিবেশটা সুন্দর রাখতে আমরা একটু সিরিয়াস হলে হয়। নগরীর সৌন্দর্য আপনার সৌন্দর্য আমার সৌন্দর্য। আপনি আপনার আশে-পাশের পরিবেশ সুন্দর রাখতে সহায়তা করুন। মুসলিম সম্প্রদায় তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা উদযাপন করবে। ঘরে ঘরে ত্যাগের আনন্দে মহিমান্বিত হবে মন। মুসলমানদের মহা উৎসবের এ দিন পালনের প্রস্তুতি চলছে বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রামেও। নগরীর ঘরে ঘরে এখন ঈদের আমেজ। সাজ সাজ রব সর্বত্রই। ঈদে নানা রকম খাওয়া-দাওয়া, বেড়ানোর আনন্দ অফুরান। এ আনন্দের অংশীদার সবাই। করোনাকালীন মানুষের মন মানসিকতাও ভাল নেই, তবুও আনন্দময় হোক আমাদের ঈদ উৎসব। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি বিভেদ ভূলে আমরা সুন্দর মনে এক হয়ে মিলিত হই ঐক্যের বন্ধনে। উপভোগ্য হয়ে উঠুক ঈদ আনন্দ। ভাল থাকতে, সুস্থ থাকতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলি। মাস্ক ব্যবহার করি এবং সাবান ও হ্যান্ডসেনেটাইজার দিয়ে হাত পরিস্কার রাখি।

লেখক: সাংবাদিক ও গীতিকার

Share This Post

আরও পড়ুন