রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন

কবি ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত: সাম্যের পৃথিবী তার পরম কামনা

আহাম্মদ কবীর
  • প্রকাশ : শনিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৫০৪ Time View

ধলঘাট গ্রামটিকে কে না চেনে? বৃটিশরা চিনেছে, এপার বাংলা ওপার বাংলার অনেকেই চেনে, অনেক অনেক ভারতবাসীও চেনে। চিনতো পাকিস্তানি অনেক লোকজনও। বৃটিশ বিতাড়নের অগ্নিগর্ভ সময়ে যে স্ফুলিঙ্গ সাহেবদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, দেশমাতার সেই মহাশক্তির আবির্ভাবে উজ্জীবিত এই জনপদকে কমবেশি সকলেই চিনে বৈকি।

১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি দামণি কবি ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্তের জন্ম এই নিবিড় পল্লীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতা অবিনাশচন্দ্র দাশগুপ্ত ও মাতা হেমপ্রভা দাশগপ্তা।

নিজ গ্রামের ইসকুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনান্তে পড়তে চলে যান কোলকাতায়। কলেজী শিক্ষা সমাপন করেন স্কটিস চার্চ কলেজ ও বিশ্বভারতীতে। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ নিজ কাকা বাবু দীনেশ দাশগুপ্তের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিবেশে তার বেড়ে উঠা। কতো সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদের সান্নিধ্য তিনি লাভ করেছেন ইয়াত্ত নেই। তার মাধ্যমিক স্কুল কালীধন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী সত্যপ্রিয় রায়ের সান্নিধ্য পেয়েছেন প্রচুর- যিনি একধা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, ছিলেন কানুনগোপাড়া স্কুলেরও প্রধান শিক্ষক।

বিপ্লবী দলের রাজনীতি, পিতৃগৃহের নিকটস্থ সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে সংঘটিত ঐতিহাসিক ধলঘাট যুদ্ধ, বাড়ির অদূরে জন্ম নেয়া বীরকন্যা প্রীতিলতার ১৯৩২ সালে আত্মবলিদান, ১৯৩৪ সালে মাস্টারদা সূর্যসেন ও তারেকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি, আরো অসংখ্য বিপ্লবীদের মৃত্যুদন্ড, দীপান্তর যুবক অরুণ দাশগুপ্তের মনে প্রভাব ফেলেনি? নিশ্চয়ই ফেলেছিল। তাই রাজনৈতিক কাকার বাড়িতে বড় বড় রাজনীতিবিদদের খুব কাছে বড় হলেও তিনি যুক্ত হন কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ফেডারেশনে। শ্রমিক সংগঠনে সক্রিয় থেকে হন কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। কমিউনিস্ট রাজনীতি, দর্শন ও নেতৃবৃন্দের সাহচর্য তার মেধা, মনন গঠনে গভীর ভূমিকা রাখে। ফুল পড়া, পাতা নড়ার দৃশ্য অনেক দেখেছেন তিনি। দেখেছেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট রাষ্ট্র, বিভক্ত বাংলাকে। ‘৭১ এ যখন ডাক এলো স্বাধীনতার ও মুক্তির, ঝরে গেল লাখ লাখ প্রাণ- কষ্টার্জিত স্বাধীনতা লাভ তাকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল বৈকি। কিন্তু মুক্তির স্বাদ পেলেন না। দেখলেন খাণ্ডবদাহন।

‘জ্বলিতেছে। যে নীড় একদা অন্তরীক্ষ দিয়াছিল তাহাতে শঙ্খচূড় বিষ ঢালিতেছে। কুয়াশা নক্ষত্রবীথির পথ রোধ করিয়াছে। নদী হারাইতেছে মোহনা। মোহনা হারাইয়াছে সমুদ্র। শব্দ ও নীরবতার মধ্যবর্তী মুহূর্ত কেবলই বলিতেছে- জ্বলিবে জ্বলিবে, জ্বলিবে। তিন সত্য যদ্যপি এক হয় গোধুলি কি চন্দ্র অঙ্কনে কদাচ সমর্থ হইবে!’

সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মায় প্রথিতযশা সাহিত্যিক, গবেষকদের পরম সান্নিধ্য পেয়ে, তাও তার সাহিত্যিক কাকা দীনেশ দাশগুপ্তের কল্যাণে। ড. সুকুমার সেন, ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত, প্রমথনাথ বিশী প্রমূখ সাহিত্যিকগণ ছিলেন তো তার কাকার আড্ডার রথী মহারথী। তাদের সাহিত্য চিন্তা, গবেষণা, অবিনাশী কথা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অতীত-বর্তমান, হালচাল নিয়ে যুক্তিতর্ক, ভবিষ্যৎ পথরেখা বিনির্মাণে নানাবিধ আলোচনা তিনি তাদের কাছ ঘেঁষেই শুনেছেন। সমৃদ্ধ হয়েছেন। সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন কোলকাতার প্রখ্যাত ওস্তাদ শৈলজারঞ্জন ও শুভগুহ ঠাকুরতার কাছে।

পড়ার বিকল্প নেই, তাই পড়েছেন প্রচুর। কবিতা, ছোটগল্প, সঙ্গীত, চিত্রকল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে তার বিচরণ যেমন ছিল, লেখালেখিও করেছেন অনেক। প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথের ছয় ঋতুর গান ও অন্যান্য (২০১৭), নবীনচন্দ্র সেন (২০১৮)। কবিতাগ্রন্থ খাণ্ডবদাহন(২০২০)।

শিক্ষক হিসেবে কিছুকাল কাটালেন দেশে ফেরার পর। সরকারহাট, নিজামপুর, বামনসুন্দর হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা পেয়েছিল এক সরস শিক্ষক অরুণ দাশগুপ্ত মহোদয়কে। ১৯৭৩ এ এসে যোগ দেন দৈনিক আজাদীতে। তিন যুগের অধিক সময় কেটে যায় সাংবাদিকতা পেশায়। ছিলেন দৈনিক আজাদী পত্রিকার সিনিয়র সহকারী সম্পাদক ও সাহিত্য সম্পাদক। নবীন প্রবীন অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী তার সহায়তা ও সান্নিধ্য লাভ করে যশস্বী হয়েছেন। তিনিও লাভ করেছেন সাহিত্য- সংস্কৃতিবানদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। সাম্যের পৃথিবী তার পরম কামনা। কিন্তু কবে আসবে সেই দিন?

আমাদের দামণি অরুণ দাশগুপ্ত- আপনাকে অভিবাদন। আপনার ৮৭তম জন্মবার্ষিকীতে আপনাকে অভিনন্দন।

সাহিত্য সভার পক্ষ থেকে জানাচ্ছি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: নাট্যকার, গবেষক

Share This Post

আরও পড়ুন