ঢাকাসোমবার, ৮ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এ কোন আওয়ামী লীগ?

ফজলুল কবির মিন্টু
জানুয়ারি ৩০, ২০২১ ২:৫৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ বুকে পিঠে লিখে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন শহিদ নূর হোসেন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় নূর হোসেনের বুক। নূর হোসেনের বুক হয়ে উঠে বাংলাদেশের হৃদয়। নূর হোসেন হয়ে উঠে গণন্ত্রের প্রতীক। রাউফুন বাসুনিয়া, মোজাম্মেল হোসেন, কমরেড তাজুল ইসলাম এবং ডাক্তার মিলনসহ অসংখ্য শহীদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ পাড়ি দিয়ে সুদীর্ঘ নয় বছর লড়াই সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়।

এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে দেশবাসীর অন্যতম দাবি ছিল নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করা। সব নির্বাচনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলো তিনটি জোটে বিভক্ত ছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল এবং ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ মিলে করেছিল পাঁচ দলীয় জোট। নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ ও স্বাধীন করার লক্ষে তৎকালীন আন্দোলনরত তিন জোট একটি অভিন্ন রূপরেখা দিয়েছিল। ওই রূপরেখার অন্যতম প্রধান দাবি ছিল নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ হতে হবে এবং সংসদ নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

এরশাদের পতনের পর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সাহাব উদ্দিনের অধীনে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচন ছিল এযাবৎ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে বেশী অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন। পরবর্তী ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। যদিও প্রত্যেক নির্বাচনের পর পরাজিত দলের পক্ষ থেকে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ ছিল।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বাতিল করলো। অতঃপর তাদের অধীনে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে দুটি সংসদ নির্বাচন এদেশের জনগন প্রত্যক্ষ করেছে। আমার দেখা মতে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম নির্বাচন। দেশবাসী দেখেছে নির্বাচনের পূর্ব রাতেই ব্যালট বাক্স পূর্ণ হয়ে গেছে। এতে এক দিকে দেশবাসী যেমন খারাপ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করেছে, তেমনি নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা এবং আগ্রহ একেবারে শুন্যের কোঠায় চলে গেছে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি ২৭ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে।

আমি ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডে অবস্থিত বাগমনিরাম বালক বিদ্যালয় কেন্দ্রের একজন ভোটার। এবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রতি আমার খুব বেশী আগ্রহ ছিল না। তারপরও নির্বাচনী পরিবেশ বুঝার জন্য বেলা ১২টার দিকে বের হয়েছিলাম এলাকার দুয়েকটা কেন্দ্রের পরিবেশ অবলোকন করার জন্য। তবে এলাকার বন্ধুবান্ধবদের চাপে ভোট দিতেও বাধ্য হয়েছি।

ভোট দিতে গিয়ে একটা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। যা আমার কাছে এবারের নির্বাচনের একটি ইতিবাচক দিক বলে মনে হয়েছ। ভোটের প্রতি আগ্রহ না থাকায় আমার ভোটার নম্বর জানতাম না আবার আমি জাতীয় পরিচয়পত্রও সাথে নিয়ে যাইনি। এই অবস্থায় আমার পক্ষে ভোট দেয়া একটু কঠিন বৈকি। কিন্তু দেখলাম ভোট কেন্দ্রের সামনে দুজন তরুণ মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমার জন্ম তারিখের মাধ্যমে আমার ভোটার নম্বর বের করে দিতে সক্ষম হলো। ফলে আমি জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া এবং ভোটার নম্বর না জেনেও কেবলমাত্র জন্ম তারিখের মাধ্যমে আমি ভোট দিতে পেরেছি। নিঃসন্দেহে বলা যায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে এটা একধাপ অগ্রগতি।

আলোর অপর পিঠে যেমন অন্ধকার থাকে, ঠিক তেমনি ইতিবাচকের বিপরীতে যেন নেতিবাচক দিকও থাকে। কেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে ভোটার নম্বর বললাম। তিনি আমার আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ইভিএম ওপেন করলেন। গোপন কক্ষে বাটন চাপতে গিয়েই বড় ঢাক্কা খেলাম। দেখি বাটন চাপার গোপন কক্ষে আমার ছেলের বয়সী একজন ১৫/১৬ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে নৌকার বাটন, ঘুড়ির বাটন এবং বই এর বাটন দেখিয়ে দিল। আমি সেভাবেই ভোট দিয়ে এলাম। অথচ ওই ছেলেটা না বললেও আমি ওই তিনজনকেই ভোট দিতাম। তবুও আমি ভোটার হিসাবে ভীষণ অপমানিত বোধ করলাম। কী আশ্চর্য পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েও আমার মনে হলো আমি যেন আমার পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারিনি। এমন গর্হিত কাজটি হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগের কর্মী বাহিনী দ্বারা।

ভোট কেন্দ্র হতে বের হয়েই বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। মনে মনে ভাবতে থাকলাম এ কোন আওয়ামী লীগ? যে দলটি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এরশাদের বিরুদ্ধে নয় বছর লড়াই করেছে। এমনকি ৯৬ এবং ২০০৬ সালেও বিএনপির বিরুদ্ধে লড়াই করে এদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা জারী রেখেছিল। যে দলটি ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। যে দলের নেতৃত্বে ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান হয়েছিল। যে দলটি ৭০’র নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। যে দলের মূল ভিত্তি ছিল জনগণ। সে দলটি আজ এত অসহায় কেন? যে দলটি সব সময় মনে করতো নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই তারা বিজয়ী হবে। সে দলটি আজ নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে এত ভয় পাচ্ছে কেন? তাহলে কি আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে? বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের কি তাহলে অপমৃত্যু ঘটেছে? এ আওয়ামী লীগকে বড় অচেনা লাগে।

শহীদ নুর হোসেনসহ শত শহীদের রক্তে অর্জিত নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়ার দায়ে আওয়ামী লীগকে একদিন ইতিহাসের কাটগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। ইতিহাস বড়ই নির্মম। ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

লেখক: সংঠক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Facebook Comments Box