বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২, ১২:১১ অপরাহ্ন

এমন বিদায়ে আমরা মঞ্চশিল্পীরা বাকরুদ্ধ

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০
  • ৩০৬ Time View

নুরুন্নবী নুর: সবেমাত্র লেখালেখি শুরু করেছি। সে জন্য খুব ভয় হয়, কারণ বছরটিতে এমন সব মানুষ সম্পর্কে লিখতে হচ্ছে, যা আমার মতে সাহসিকতার পরিচয়। ইদানীং হাত কাঁপে।

সৌমিত্র বাবু সম্পর্কে লিখতে না লিখতেই আবার লিখতে হচ্ছে প্রিয় একজন মানুষকে নিয়ে। তিনি হলেন মঞ্চ শিল্পী আলী যাকের। আমি রঙ্গালয়ের মানুষ, সে জন্য মঞ্চ শিল্পী বলে মানুষটিকে আগে বিশেষায়িত করেছি।

মঞ্চ শিল্পী বললে অবশ্য অনেকাংশে ভুল হবে, তাঁর প্রথম ও প্রধান পরিচয় তিনি স্বাধীনতার একজন শব্দ সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাছাড়া একজন বাংলাদেশী অভিনেতা, ব্যবসায়ী ও কলামিস্ট। এছাড়াও আলী যাকের টেলিভিশন ও মঞ্চ নাটকে সমান জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।

ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কম-বেশি সবাই জানেন। সে জন্য কলমটাকে ওদিকে নিয়ে যাব না। তাঁর কর্মময় জীবন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও আমার আলী যাকের সাহেবকে চিনে উঠার ছোট একটি গল্প বলার চেষ্টা করব।

আমার জানা মতে, আলী যাকের ছিলেন পুরোদমে একজন মঞ্চ ব্যক্তিত্ব। থিয়েটারেই জীবনের প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাটিয়েছিলেন। মঞ্চ জীবন আরণ্যক নাট্যদলে প্রথম অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু, তারপর নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় পর্যন্ত কাজের ব্যপ্তি। প্রায় দেড় ডজন মঞ্চ নাটকে নির্দেশনা দেওয়া ও অভিনয় করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ‘কবর’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’, ‘বাকী ইতিহাস’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘ম্যাকবেথ’, ‘টেমপেস্ট’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ ও ‘গ্যালিলিও’ অন্যতম।

এইতো কিছুদিন আগে আলী যাকের অভিনীত তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘নদীর নাম মধুমতি’ সিনেমাটি দেখলাম। মোতালেব মোল্লা চরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয়, আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে।

তিনি তানভীর মোকাম্মেলের আরও দু’টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, ‘লালসালু’ ও ‘রাবেয়া’। ‘আগামী’ নামের একটি সিনেমায়ও তিনি কাজ করেছিলেন। তাছাড়া হুমায়ূন আহমেদের টেলিভিশন নাটক ‘বহুব্রীহি’ ও ‘আজ রবিবার’এও অভিনয় করেছেন।

আলী যাকের অনেকগুলো একক নাটকেও কাজ করেছেন, তন্মধ্যে- ‘একদিন হঠাৎ’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’, ‘আইসক্রিম’ ও ‘গণি মিয়ার পাথর’ অন্যতম।

জীবদ্দশায় আলী যাকের অনেকগুলো পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হোন। তন্মধ্যে ১৯৯৯ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদকসহ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদক, ২০১৮ সালে অভিনয়ের জন্য দ্য ডেইলি স্টার-স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সেলিব্রিটিং লাইফ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ।

আলী যাকের ৬ নভেম্বর ১৯৪৪ সালে চট্টগ্রামের রতনপুর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে, তিনি অভিনেত্রী সারা যাকেরকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুই সন্তান, পুত্র ইরেশ যাকের ও কন্যা শ্রিয়া সর্বজয়া। ইরেশ যাকের, মা-বাবার মতোই বর্তমানে মিডিয়া পাড়ার একজন পরিচিত মুখ।

আলী যাকের, ৭৬ বছর বয়সে অর্থাৎ যে মাসটিতে তাঁর জন্ম ঠিক সে মাসের আজ ২৭ নভেম্বর মৃত্যবরণ করেন। একজন গুণী শিল্পীর এমন বিদায়ে আমরা মঞ্চশিল্পীরা বাকরুদ্ধ।

২০২০ সালটা আমাদের কাছ থেকে অনেক বড় মাপের মানুষদের কেড়ে নিয়েছে। আলী যাকের স্যারের প্রয়াণে দেশের সব মঞ্চ শিল্পীই আজ ভাষাহীন, অশ্রুসিক্ত।

ওপারের ভালো থাকবেন, প্রিয় অভিনেতা ও প্রিয় মঞ্চ শিল্পী…

লেখক: তরুণ শিল্প সমালোচক

Share This Post

আরও পড়ুন