বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ০৯:৩৪ অপরাহ্ন

‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র গণ প্রয়োগ: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল যাত্রা / ১০৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১
মোস্তফা কামাল যাত্রা

মোস্তফা কামাল যাত্রা: মানসিকভাবে প্রশান্ত নয়; মনোচাপ, মানসিক সমস্যায় দিনাতিপাত করছে এমন মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে উপজিব্য করে সৃজনশীল শিল্পকলার অভিব্যক্তিমূলক প্রকাশ ও প্রদর্শনের মাধ্যমে মনোবিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে অধিবেশন বা সেশন পরিচালিত হয়, তাকে বলা হয়ে থাকে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন।’

অর্থাৎ মনো-দৈহিক বা মনো-সামাজিক সংকট উত্তরণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি (ক্লাইন্ট) বা এক দল লক্ষ্য জনগোষ্ঠীর (গ্রুপ বা কমিউনিটি) সতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমের একক ও সমন্বিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সঞ্চালিত সৃজনশীল ও মনোবৈজ্ঞানীক অধিবেশনকেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’ হিসেবে।

স্বর, শরীর, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সতস্ফূর্ত ও সৃজনশীল ব্যবহারে শিল্পকলার মনোবিশ্লেষক চর্চা বা অনুশীলনের ধারাবাহিকতায় সম্পাদিত এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরা একক বা দলীয়ভাবে যে যৌথসৃজন সু-সম্পন্ন করে, তার অভিব্যক্তিধর্মী উপস্থাপনাই ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’ হিসাবে পরিগণিত।

নাচ, গান, অভিনয়, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, দৃশ্য ও কাব্যকলার সংশ্লিষ্টতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনোতাপ, মনোবেদনা, মনোচাপ দূরিকরণের অভিব্যক্তিমূলক প্রদর্শনের আনুপূর্বিক চক্রকে যখন মনোস্তাত্বিক বিশ্লেষণের প্রক্রিয়ায় অনুধাবনপূর্বক নবতর অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তি মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়াকেই মূলত ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’ বলা হয়ে থাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে সৃষ্ট মানসিক অবস্থা-অবস্থান ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধারার মনোবৈজ্ঞানীক স্বাস্থ্য সেবার সূচনা হয়েছিল। থিয়েটারের বহুমাত্রিক মনস্তাত্বিক ব্যবহারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সাইকো-ড্রামা, সোসিও-ড্রামা অভিধায় এ ধারার সাইকোথেরাপির প্রবর্তন করেন জেকব লিভি মরিনো।

বিগত এক শতাব্দী সময় ধরে শিল্পকলার অপরাপর মাধ্যমের মনোবৈজ্ঞানীক ও অভিব্যক্তিমূলক প্রয়োগের ধারায় যা ডান্স থেরাপি, মিউজিক থেরাপি, আর্ট থেরাপি, পয়েট্রি থেরাপি, সেডো থেরাপি, কালার থেরাপি, মাইম থেরাপি, ড্রামা থেরাপি, থিয়েটার থেরাপি, লিভিং নিউজপেপার থিয়েটার, প্লেবেক থিয়েটার প্রভৃতি শিরোনামে বিশ্বব্যাপী অনুশীলিত হচ্ছে ।

উল্লেখিত শিল্পকলাবিদ্যার থেরাপিউটিক ব্যাবহার প্রচলিত সাইকোথেরাপির সম্পূরক প্রক্রিয়া হিসাবে পৃথিবীর দেশে দেশে বিকল্প মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষাবিজ্ঞান হিসাবে সফলভাবে প্রযুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশে এ ধারার মনোবিশ্লেষক শিল্পশৈলীর আনুষ্ঠানিক চর্চা আরম্ভ করে ‘ইউনাইট্ থিয়েটার ফর সোশ্যাল অ্যাকশন্ (উৎস) নামের একটি বেসরকারী মনোবিশ্লেষক উন্নয়ন সংস্থা। ১৯৯৭ সাল থেকে ‘ইউনিট থিয়েটার কনসেপ্টে’ গঠিত ‘উৎস’ আওতাভূক্ত বিভিন্ন ‘থিয়েটার ইউনিট’ কর্তৃক লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক এ ধারার অভিব্যক্তিধর্মী কলাবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছিল।

থিয়েটার সব শিল্প মাধ্যমের যুথবদ্ধ একটি মৃজনশীল কলাবিজ্ঞান। যার থেরাপিউটিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক পরিচালিত থিয়েটার ইউনিটগুলোর মনোবিশ্লেষণ কর্ম প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভার্বাল ড্রামা, বাক প্রতিবন্ধীদের জন্য মিটিং প্লে, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের জন্য থেরাপিউটিক থিয়েটার ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ড্রামা থেরাপির অনুশীলনের পাশাপাশি এতিম শিশু, পথ শিশু ও মাদকাসক্তদের লক্ষ্য জনগোষ্ঠী হিসাবে ‘উৎস’ মিউজিক থেরাপি, আর্ট থেরাপি, মুভমেন্ট থেরাপি, মাইম থেরাপির প্রয়োগ করে সাফল্য লাভ করেছে।

লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক সেই প্রয়োগ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ‘উৎস’ প্রতিষ্ঠা করে ‘থিয়েটার থেরাপি সেন্টার অব দি ডিজএ্যাবল্ড (টিটিসিডি)’ ও ‘বাংলাদেশে থেরাপিউটিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট (বিটিটিআই)।’

২০০৩ সাল থেকে ‘উৎস’ এর সুপারভিশনে টিটিসিডি পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন, ইউসেপ, ইপসা, সিডিসির উপকারভোগী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অভিব্যক্তিমূলক সৃজনশীল কলাবিদ্যার মনোবিশ্লেষক প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দাতা সংস্থাদের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে।

গণমূখী ওই প্রয়োগের পরম্পরায় ‘উৎস’ ২০০৭ সালে প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘুর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৮ সালে ঘুর্ণিঝড় আয়লায় ক্ষতিগ্রস্তদের লক্ষ্য জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ডিজাস্টার ইউকে, একশন এইডের সহযোগিতায় ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র কমিউনিটি লেভেলে সফল প্রয়োগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দেয়।

‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র গণ প্রয়োগকে আরো সু-সংহঠিত করতে ‘উৎস’ প্রতিষ্ঠীত ‘বিটিটিআই’র প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিস্টরা ২০০৯ সালে মানবসৃষ্ট দূর্যোগ কেডিএস গার্মেন্টস অগ্নিকান্ড এবং ২০১১ সালে সৃষ্ট মানব দূর্যোগ মিরসরাই ট্রাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিয়েছিল।

অপর দিকে ২০১৩ সালে সৃষ্ট বিশ্বের সর্ববৃহৎ মানব দূর্যোগ সাভার ট্রাজেডীতে ক্ষতিগ্রস্তদের মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘উৎস’ ‘এক্সপ্রসিভ সাইকোথেরাপি’র সফল গণ প্রয়োগ করেছিল আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, আইএলও, একশনএইড বাংলাদেশ ও ডিয়াকোনিয়া বাংলাদেশের সহযোগিতায়।

‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র নানা অনুষঙ্গ ব্যাবহার করে ২০১১ সালে ‘উৎস’ পাচারের স্বীকার শিশুদের মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডিয়াকোনিয়া বাংলাদেশের সহযোগিতায় একটি পাইলট প্রকল্প পরিচালনা করেছিল। যার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২ সাল থেকে এক দশক সময় ধরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এলাকায় নির্যাতিত নারী, কিশোর-কিশোরী ও যুব সমাজকে লক্ষ্য জনগোষ্ঠী করে ‘হার্ট’ প্রকল্প নামে ডিয়াকোনিয়ার সহযোগিতায় ‘উৎস’ বাস্তবায়ন করছে একটি দীর্ঘ মেয়াদী মনোসাস্থ্য সেবাধর্মী কার্যকান্ডের গণ প্রয়োগ।

হার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে নগরীর নির্বাচিত তিনটি ওয়ার্ডের কমিউনিটি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ক্ষতিগ্রস্তদের মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষায় থিয়েটারের মনোবিশ্লষক বহুমাত্রিক অভিব্যক্তিধর্মী অনুশিলন অব্যাহত আছে।

২০১৮ সাল থেকে ‘উৎস’ বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডিয়াকোনিয়া বাংলাদেশ ও ইউনাইটেড পারপাসের সহযোগিতায় ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র অন্যতম অনুসঙ্গ সাইকো-ড্রামা, লিভিং নিউজপেপার থিয়েটার ও প্লেবেক থিয়েটার অধিবেশন বা সেশন আয়োজনের মাধ্যমে গণ প্রয়োগ চলমান রেখেছে; যা সুধিমহলের কাছে একটি প্রশংসিত মনোবিশ্লেষক প্রয়োগবিদ্যা হিসাবে মনোবিদের স্বীকৃতি পেয়েছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমন, বসবাস ও তার প্রভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক অসন্তোষ কাজ করছে। যার ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নিচ্ছে নানা ধরণের মনোবৈকল্যতা। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বহুমাত্রিক মনোসামাজিক বিপর্যয়। যা যথাযথ সময়ে মনোবৈজ্ঞানীক স্বাস্থ্য সেবার আওতায় না আনলে অদূর ভবিষ্যৎ এ উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৃষ্টি করবে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ।

উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২১ সালে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র গণ প্রয়োগ সু-নিশ্চিত করতে দক্ষ এক্ষপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিস্ট গড়ে তুলতে ‘উৎস’ এবং কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (সিবিআইইউ) যৌথভাবে চালু করেছে ত্রৈমাসিক ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ বিষয়ক একটি একাডেমিক কোর্স।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে চালু হওয়া উল্লেখিত কোর্সের শিক্ষার্থীরা দক্ষ এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিস্ট হিসাবে সংক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর মনোবৈকল্যতা দূরিকণের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবেন।

সর্বোপরী ওই কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থী এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিস্টবৃন্দ সৃজনশীল মনোবিশ্লেষক এ কলাবিদ্যার গণ প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমানে দেশে চলমান করোনা অতিমারীতে ক্ষতিগ্রস্তদের মনোস্বাস্থ্য সুরক্ষয়ও রাখতে পারবে অনন্য ভূমিকা।

বাংলাদেশে এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপির গণ প্রয়োগের ব্যাপ্তি ও পরিসর বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতা ও সমর্থন একান্তভাবে কাম্য।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অতিথি শিক্ষক, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি কোর্সের সমন্বয়ক।

add

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র গণ প্রয়োগ: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ”

  1. Mostafa+Kamal+Jatra says:

    এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র
    দর্শন ও প্রয়োগ প্রক্রিয়া
    ●●●●●●●●●●●●●
    – মোস্তফা কামাল যাত্রা
    বর্তমান বিশ্বে বিগত এক শতাব্দী সময়কাল ধরে সৃজনশীল শিল্পকলার মনোবিশ্লেষক অভিব্যক্তিধর্মী কলাবিদ্যার প্রয়োগ কার্যকরভাবে অনুশীলিত হচ্ছে। মনোবৈজ্ঞানীক দিক থেকে মনোবিশ্লেষক অভিব্যক্তিধর্মী কলাবিদ্যার এ প্রয়োগ প্রক্রিয়ার মৌলিকত্ব হল- অভিনব এবং অনন্য। যার ভিত্তি হচ্ছে একশন থেকে রি-একশন এবং তার ধারাবাহিকতায় কো-ক্রিয়েশন।
    এ ক্রিয়াত্মক কর্মশৈলীত্রয়কে এ ধারার মনোবিশ্লেষণ পদ্ধতিতে দলীয়ভাবে সৃজনশীল শিল্পযজ্ঞের অভিব্যক্তিপূর্ণ অনুশীলনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের অন্তর্জগৎকে উন্মোচিত করতে সহায়তা করা হয়ে থাকে।
    প্রথমত এ ধারার মনোবিশ্লেষক অধিবেশনে (সেশন) একজন অংশগ্রহণকারী প্রাসঙ্গিক একটি একশন করে থাকে। যার বিপরীতে দ্বিতীয় ধাপে অপরাপর অংশগ্রহণকারীরা প্রতিক্রিয়া হিসাবে একটি রি-একশন প্রদর্শন করে। যাকে পর্যালোচনা সাপেক্ষে তৃতীয় ধাপে- অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে সমর্থ হন। যাকে বলা হয়ে থাকে কো-ক্রিয়েশন।
    উল্লেখিত স্বতস্ফূর্ত ও সৃজনশীল সমন্বিত ক্রিয়াত্বক উপস্থাপনা অভিব্যক্তিমূলক মনোবিশ্লেষণধর্মী এ বিকল্প ধারার শিল্পযজ্ঞ পর্যায়ক্রমিক চক্রাকার আবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। অর্থাৎ কো-ক্রিয়েশন পর্যায়ের পর্যালোচনা থেকে সৃষ্টি হয় নতুন একশন এবং তা পুনঃরায় সৃষ্টি করে নবতর রি-একশন এবং সেই রি-একশনকে উপজীব্য করে গড়ে ওঠে নবতর কো-ক্রিয়েশন পর্ব।
    অনুপর্বিক এ মনোবৈজ্ঞানিক সৃজনশীল অভিব্যক্তিধর্মী ত্রিমাত্রিক অধিবেশনকে বলা হয়ে থাকে গ্রুপ সাইকোথেরাপি। আর যেহেতু অংশগ্রহণকারীদের অভিব্যক্তিকে প্রধানতম অনুষঙ্গ বিবেচনা করে সৃজনশীল ক্রিয়াত্বক শিল্পযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে এ ধারার অধিবেশন পরিচালিত হয়- সেহেতু তাকে বলা হয় ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি (সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, প্লেবেক থিয়েটার, ড্রামা থেরাপি, ডান্স থেরাপি, মুভমেন্ট থেরাপি, ব্রিদিং থেরাপি, মিউজিক থেরাপি, আর্ট থেরাপি, পয়েট্রি থেরাপি, মাইম থেরাপি, প্লে থেরাপি, গেইম থেরাপি, সেডো থেরাপি, ক্লাউন থেরাপি, কালার থেরাপি ইত্যাদি)।
    মূলত: এ যুথবদ্ধ শৈল্পীক প্রকাশধর্মিতায় অংশগ্রহণকারীদের অন্তরাত্মাকে প্রসন্ন করার মধ্য দিয়ে পারস্পরিক আন্তঃসস্পর্ক সুদৃঢ় করা হয়। ফলে অংশগ্রহণকারীদের মনো-দৈহিক ও মনো-সামাজিক অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে প্রশান্ত। আর এ স্তরকে স্বায়িত্বশীলতা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই সম্পাদিত হয়ে থাকে আলোচ্য পর্যায় (একশন থেকে রি-একশন এবং রি-একশন থেকে কো-ক্রিয়েশন) ত্রয়ের পর্যায়ক্রমিক অভিব্যক্তিমূলক মনোবৈজ্ঞানিক অনুশীলন তথা ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ সেশন।’
    এ অধিবেশনে (সেশন) অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতার মাত্রা বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে- সম্মিলিতভাবে তারা তাদের আবেগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে অভিব্যক্তি আকারে উপস্থাপন বা প্রদর্শন করে। যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ‘পুরানো পরিস্থিতির প্রতি একটি নতুন সাড়া’ হিসাবে যেমনি তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে; তেমনি ‘নতুন পরিস্থিতির প্রতি একটি যথার্থ সাড়া’ হিসাবে সু-সমন্বিত প্রদর্শনমূলক ভাব প্রকাশ করে থাকে। যাকে বিশ্লেষকগণ মনোবিশ্লেষণধর্মী অভিব্যক্তিমূলক সৃজনশীল কলাবিদ্যা তথা ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র দর্শন হিসাবে মান্যতা দিয়েছেন।
    যে দর্শনের উপর নির্ভর করে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র প্রয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। সেখানেও পর্যায়ক্রমে তিনটি স্তর অবশ্য-অবশ্যই অনুসরণ করতে হয়। সেগুলো হল- ওয়ার্ম আপ, একশন ও শেয়ারিং।
    যদিও প্রচলিত কাউন্সিলিং বা সাইকোথেরাপির প্রয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে থাকে শেয়ারিং স্তর দিয়ে। কিন্তু আলোচ্য ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’র প্রয়োগ প্রক্রিয়ায় এ স্তরটি ঘটে থাকে সবার শেষে। যাতে অংশগ্রহণকারীরা লাভ করে নতুন ও বৈচিত্রময় অনুধাবন। প্রাপ্ত সমন্বিত ও বহিমাত্রিক অভিব্যক্তিগুলো থেকে অংশগ্রহণকারী নির্বাচন করে থাকে তার জন্য প্রযোজ্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিকদর্শন।
    অংশগ্রহণমূলক সৃজনশীল ও অভিব্যক্তিমূলক বর্ণিত প্রক্রিয়ায় প্রযুক্ত স্তর (ওয়ার্ম আপ, একশন ও শেয়ারিং) ত্রয় অংশগ্রহণকারীদের মনোবিশ্লেষণে একটি স্বতঃস্ফূর্ত অভিপ্রায় নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করে। সম-সমস্যায় থাকা বিভিন্ন পরিস্থিতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নবতর সম্মিলিত সৃজনশীল মনোবিশ্লেষক অভিব্যক্তিগুলোর মূল্যায়নপূর্বক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যক্তিক পর্যালোচনার জন্য বহুমূখী ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। যেখান থেকে ব্যক্তি তার জন্য প্রযোজ্য যথার্থ ও যৌক্তিক কার্যকারণটি বেছে নিতে সমর্থ হন। স্মরণীয় যে, বর্ণিত প্রয়োগ প্রক্রিয়া সম্পাদিত হয়ে থাকে প্রারম্ভিক কথনে আলোকপাতকৃত দর্শনের ভিত্তিতে।
    লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অতিথি শিক্ষক, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির `এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি‘ কোর্সের সমন্বয়ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ