ঢাকাসোমবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’ পরিচালনায় প্রযোজ্য নিয়মাবলি

মোস্তফা কামাল যাত্রা
এপ্রিল ২৮, ২০২১ ২:৪০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মোস্তফা কামাল যাত্রা: প্রতিবিধানমূলক অভিব্যক্তিধর্মী সৃজনশীল কলাবিদ্যার প্রয়োগ করে ব্যক্তিগত জীবনকে সুস্থির ও সুগঠিত করার জন্য যে নিরাময়ী শিল্পযজ্ঞ বর্তমান বিশ্বে মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যসেবা হিসাবে স্বীকৃত, তা প্রথাবদ্ধ অপরাপর প্রয়োগ প্রক্রিয়া থেকে স্বতন্ত্র ও বৈচিত্রপূর্ণ।

আলোচ্য মনোবিশ্লষক শিল্পযজ্ঞের প্রয়োগ প্রক্রিয়া সু সম্পন্ন হয়ে থাকে অধিবেশন বা অধিবেশন বা সেশন ভিত্তিক, যে সেশনগুলো হয়ে থাকে সুনির্দিষ্ট দর্শন ও প্রয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘অভিব্যাক্তিধর্মী মনোবিশ্লেষক অধিবেশন’ বা ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন‘।

আর এ সেশন বা অধিবেশন পরিচালনায় প্রয়োজন হয়ে থাকে স্বাস্থসম্মত ও পরিবেশবান্ধব একটি কর্মক্ষেত্র। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি ল্যাব’। যে ল্যাবে অংশগ্রহণকারীদের জন্য থাকবে পর্যাপ্ত সৃজনশীল উপাদান ও উপকরণ। যা ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীগণ তাদের সৃজনশীলতা বিকাশ ও বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়ে থাকেন।

এ কর্ম পরিবেশে অংশগ্রহণকারীরা সহজেই তাদের উপলব্ধিগুলোর ইঙ্গিতপূর্ণ অন্বেষণের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে থাকেন। ক্রিয়াত্বক একটি স্বতঃস্ফুর্ত ও সৃজনশীল ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন‘ পরিচালনায় প্রযোজ্য ও অবশ্য মান্য পূর্বশর্ত তথা নিয়মাবলি অনুসরণ করে সুসম্পন্ন করতে হয়।

আন্তরিকতার আবর্তে বাধাহীনভাবে যাতে সেশন বা অধিবেশনে অংশগ্রহনকারীরা পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ক্রিয়াত্বক ও মনোবিশ্লেষক শিল্পচক্র কার্যকরভাবে সঞ্চালিত হয়, তার জন্য এ নিয়মকানুন অবশ্য পালনীয়। আর আলোচ্য সেই নিয়মাবলীগুলো হল- স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ, স্বতঃস্ফূর্ততা, নিরাপত্তা, মতামত নিরপেক্ষতা, গোপনীয়তা।

এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন‘ আরম্ভের পূর্বেই সঞ্চালক অংশগ্রহণকারীদের অবশ্যই পালনীয় তথা অনুসরণীয় ওই শর্তাবলি তথা নিয়মাবলি অবহিত করে তার প্রতি সব অংশগ্রহণকারী যেন মনোনিবেশ করেন, তার জন্য চুক্তিবদ্ধ করবেন। সে চুক্তি যথাযথভাবে অনুসরণ বা পালিত না হলে প্রকৃতপক্ষে সেশন কখনোই সফল হবে না।

তাই একটি সফল ও সার্থক ‌`এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন‘ নিশ্চিত করতে হলে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষকেই আলোচ্য নিয়মাবলির মান্যতা দিতে হবে এবং সেশনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি অন্তর্জাগতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ: অংশগ্রহণকারীরা সেশনে সম্পাদিত ক্রিয়াত্বক কর্মপ্রচেষ্টায় যদি স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করতে না চান, তবে তাকে তা করতে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কেউ কাউকে অংশগ্রহণের জন্য প্রভোগ বা উৎসাহিত করতে পারবেন না। সে বা তারা তাদের মত করেই অপরাপর নিয়মাবলির শর্তগুলোকে অনুসরণ করেই সেশন পরিচালনায় সহযোগিতা করবেন। অর্থাৎ অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীর অবস্থানই চূড়ান্ত।

স্বতঃস্ফূর্ততা: সেশন চলাকালীন সব অংশগ্রহণকারীকে সর্বোচ্চ স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে হবে। যাতে অংশগ্রহণকারীগণ নিজস্বতার সার্বিক সৃজনশীলতা বাধাহীনভাবে প্রকাশ ও প্রদর্শন করতে সমর্থ হন। কারণ বিষয়টি একান্ত এবং স্বতন্ত্র। দলীয়ভাবে সঞ্চালিত কর্ম অধিবেশনে সকলের স্বতঃস্ফূর্ততা একটি সফল ও কার্যকর সেশন সার্থকভাবে সু-সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নিরাপত্তা: সেশন চলাকালীন সেশনে অংশগ্রহণকারী সবার নিরাপত্তা বিধান করার জন্য একক বা দলীয়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। কারণ এটা খুবই প্রয়োজন। নিরাপত্তাহীনতার আবহে আসলে কেউ নিজেকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে নাও চাইতে পারে। যা সফল একটি সেশন এর জন্য অন্তরায়মূলক কর্ম পরিবেশ হিসেবে বিবেচিত।

নিরাপত্তার এ বিষয়টি তিনটি পর্যায়ে বিবেচিত, যেগুলো হল- শারীরিক নিরাপত্তা; মানসিক নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তা।

শারীরিক নিরাপত্তা: ‌এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’ যেহেতু একশন ধর্মী এবং প্রদর্শনমূলক, সেহেতু অংশগ্রহণকারীদের নানা ধরণের ক্রিয়া কর্মের পাশাপাশি সেশনস্থলে প্রচুর মুভম্যান্ট করতে হয়। সেশনে অংশগ্রহনকারী সকলকেই এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। যেন তার কোন মুভম্যান্ট ও ক্রিয়াকর্ম যেন অন্য অংশগ্রহণকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ না হয়।

মোদ্দাকথা সেশনে যেন কোন শারীরিক সংঘর্ষ না ঘটে সে বিষয়ে সকলকে সর্বদাই সজাগ থাকতে হবে। কারণ অন্যথায় নিরাপত্তাহীনতার সংশয় অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ততা বিঘ্ন ঘটাতে পারে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়-দায়িত্ব অংশগ্রহণকারীদের উপরই বর্তায়।

মানসিক নিরাপত্তা: সেশনে উপস্থাপিত ক্রিয়াত্বক ও আবেগীয় মুহূর্তগুলো একান্ত ও ব্যক্তিগত। কোন অংশগ্রহণকারীর মনে যদি এমন সংশয় থাকে যে, তার শেয়ার করা প্রসঙ্গে পরবর্তী অপর কোন অংশগ্রহণকারী কর্তৃক সেশনের বাইরে অন্য কোথাও অন্য কারো কাছে প্রকাশ বা প্রচার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে- তবে তা তার জন্য মানসিক বিপর্যস্ততা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া সেশনে তার করা কোন আচার আচরণের কারণে অন্য কেউ যেন তার প্রতি বিরূপ মন্তব্য বা মতামত না দেয়- যা তার জন্য নতুন মানসিক চাপ হিসেবে বিবেচিত হবে বা হতে পারে।

অর্থাৎ সেশনে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষেরই দায়িত্ব হল- এমনভাবে স্ব-স্ব অভিব্যক্তি প্রকাশ করা, যাতে তার কারণে অন্যের কোন ধরনের মানসিক পীড়ার সুযোগ সৃষ্টি বা ক্ষেত্র তৈরি না হয়। মানসিকভাবে প্রশান্ত থাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ যেন সকলের জন্যই সেশনে বজায় থাকে, সে দিকে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে মনোযোগী থাকতে হবে। যেটাকে মানসিক নিরাপত্তা হিসেবে পরিগনিত করা হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা: সেশনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থাপিত কোন প্রসঙ্গ সেশনের বাইরে চলে গেলে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে- এমন সম্ভাবনা থাকলে কোন অংশগ্রহণকারীই তার মনোপীড়ার কারণ সেশনে উপস্থাপন করতে আগ্রহী হবে না। কারণ অংশগ্রহণকারী যদি মনে করে যে, সেশনে উপস্থাপিত কোন আন্তঃব্যক্তিক, ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক ইস্যু সেশনে যোগদানকারী অন্য কোন অংশগ্রহণকারী দ্বারা পরবর্তী সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যেতে পারে- যা তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার সম্ভাবনা আছে, তবে সে সেশনে নিজেকে উজাড় করে উপস্থাপন করবে না। তাই সেশনে প্রদর্শন বা শেয়ার করা কোন প্রসঙ্গই তার সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে না মর্মে সমর্থন পায়- তবে সে সচেতনভাবে তার অভ্যন্তরীণ তথা গোপন অনেক বিষয়ই সেশনে তুলে ধরবে। যা একটি কার্যকর সেশন পরিচালনার পূর্বশর্ত। এ কারণে যে কোন সেশন শুরুর পূর্বাগ্রে সামাজিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি কোনভাবেই ঝুঁকিতে নেই- এমন একটি অঙ্গীকার সব অংশগ্রহণকারীকে ঘোষণা দিয়ে করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু। এটার প্রতি সকলকেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। সব প্রকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা একটি কার্যকর ‌‌‌‌‌‌`এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’র জন্য অতীব জরুরী।

মতামত নিরপেক্ষতা: সেশনে অংশগ্রহনকারী সকলে যদি অঙ্গীকার করে যে- একে অপরের উপস্থাপিত বিষয়, মন্তব্য, অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি, আচরণ নিয়ে কখনোই কোন বিরূপ মতামত দিবেন না বা নেতিবাচক কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে না- তবে সকলেই স্বস্তি বোধ করবে। কারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা কোন বিষয় নিয়ে যদি কেউ মতামত দেয় এবং তা তার সাথে একাত্মমূলক নয়; তখন তা অংশগ্রহণকারীর আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সেশনে অংশগ্রহণকারী সকলেই অপরের কোন বিষয়ে মতামতে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। অর্থাৎ অন্যের বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল ও নিরপেক্ষ অবস্থান প্রদর্শন করে সেশনটি সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করতে হবে। শুধু তাই নয়, একে অন্যের উপস্থাপনা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও দেখার পাশাপাশি ইতিবাচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে হবে- যাতে পক্ষালম্বন না হয় বা ব্যক্তিগত অনুভূতি ও বিশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি ও কার্যকরণকে বিবেচনা করা না হয়- সেটা সকলকেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর এমন মতামত নিরপেক্ষতামূলক পরিবেশ ও প্রতিবেশ বহাল থাকলে সেশন সফল ও কার্যকর হতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গোপনীয়তা: সেশনে অংশগ্রহণকারীদের একক ও দলীয় জীবন ও জীবনাচার এবং গোপনীয় অনেক প্রসঙ্গ নিয়ে যেহেতু আলোকপাত তথা শেয়ারিং হবে সেহেতু সেই বিষয়গুলো সেশনের বাইরে অন্য কারো কাছে প্রকাশ হবে না- এমন নিশ্চয়তা বিধান অত্যাবশ্যক। যা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি সামাজিক আবহ বিনির্মাণ করবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। যার জন্য সব অংশগ্রহণকারীকে এ প্রসঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করতে হবে। ব্যক্তিগত আনন্দ, বেদনা, আবেগ, অনুভূতি সেশনে অংশগ্রহণকারীদের সামনে উপস্থাপিত হিবে- যা একান্ত ও গোপনীয়। যা সেশনের বাইরে অন্য কেউ জানলে মানসিকভাবে, শারীরিকভাবে বা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা সংকটে পরার সম্ভাবনা থাকলে- সে তা প্রকাশ করতে আগ্রহী হবে না। তাই এ নিশ্চয়তা সব অংশগ্রহণকারীকে দিতে হবে যে- সেশনের কোন প্রসঙ্গ কেউই বাইরে নেবেন না বা জানাবেন না, যাতে এতে কোন ধরনের সংশয় না থাকে- এমন একটি অঙ্গীকার সেশন শুরুর আগেই করতে হবে সব অংশগ্রহণকারীকে।

উপসংহার: বর্ণিত উল্লেখিত শর্তগুলো তথা নিয়মাবলি মান্যতায় নিয়ে সব অংশগ্রহণকারী সেশনে স্বতঃস্ফূর্ত ও পূর্ণ সৃজনশীল থেকে অংশগ্রহণ করবেন- এমন একটি কর্মপরিবেশ ও কর্মক্ষেত্র সুনিশ্চিত করতে সকলকে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। সেশনের কাজ শুরু করার পর ক্ষণে ক্ষণে তা মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে অভিব্যক্তিমূলক মনোবিশ্লেষক ক্রিয়াত্মক অধিবেশন এগিয়ে নিলে তা সফল হবেই। সেশনের অভ্যন্তরে অর্থাৎ সেশন চলাকালে ও সেশন শেষে আলোচ্য সংশয়মূলক বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সেশন পরিচালনা করলে বা পরিচালিত হলে অংশগ্রহণকারীদের অন্তরাত্মা দ্বিধাহীন চিত্তে সেশনে বিরাজমান থাকবে। যা এক ধরনের উদ্দীপক তথা প্রণোদনামূলক অভিপ্রায় সৃষ্টি করবে। যেটা বৈচিত্র্যময় সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটায়। শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে অবগাহনের পরম্পরা সৃষ্টি সহায়ক হবে।

আলোকপাতকৃত নিয়মাবলি সার্বিক অর্থে মেনে নিয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে সেশনে অংশগ্রহণ করলে একটি কার্যকর ও আস্থাপূর্ণ ‌‌‌`এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি সেশন’ সম্পাদিত হওয়া সম্ভব।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অতিথি শিক্ষক, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি কোর্সের সমন্বয়ক।

Facebook Comments Box