মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন

একজন লালন দাশ ও আজকের থিয়েটার স্লোগান

সবুজ ভদ্র অরণ্
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১
  • ১৪২ Time View
লালন দাশ

সবুজ ভদ্র অরণ্য: লালন দাশ। চট্টগ্রামের গ্রুপ থিয়েটার অঙ্গনে একজন নাট্যঅন্তপ্রাণ তরুণের নাম। নাটক যার ধ্যান, জ্ঞান আর সাধনা। যার শরীরের প্রতিটি রক্ত কণা যেন অবিরত পাঠ করে চলে নাটকের বর্ণমালা। তার কাছে মঞ্চ যেন মায়ের আঁচলে পাতা শান্তির নিবাস। নাটকের পটভূমি, সংলাপ আর নির্মাণ চিন্তন যেন শরীর আর নাট্যভূমে রচিত হয় যার সংসার। এ যেন চট্টল নাট্যাঙ্গন আর থিয়েটার মঞ্চে নাটকের বরপুত্র।

তার সাথে পরিচয়টা মনে হচ্ছে মাত্র কয় দিনের! অথচ সময়টা ক্যালেন্ডারের পাতায় দুই দশক পেরিয়ে একুশের তারুণ্যে দীপ্ত উঠোনে রেখেছে পা। তৎকালীন নগরীর শীর্ষ স্থানীয় সংগঠন ‘অনুশীলন সাংস্কৃতিক সংসদ’ এর একেবারেই নবীন সারির সদস্য আমি। সাংস্কৃতিক সংগঠনের আনন্দভূইয়ে চলছে জীবনের জয়রথ। কিন্তু পারিবারিক সূত্রে যেন রক্তে মিশে আছে নাটক! তাই, নিজের অবচেতন মনে সুযোগ খুঁজছিলাম নাটকে নিজেকে প্রদর্শিত করার মহেন্দ্র ক্ষণের।

প্রবাদ আছে ‘যে খায় চিনি, যোগান চিন্তা মণি’; তা যেন একেবারেই হঠাৎ মিলে গেল আমার বেলায়। একদিন অনুশীলন’র সাংগঠনিক কাজ শেষ করে সংগঠনের সদস্যা প্রীতিকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার পৌরুষিক দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। তাকে পাথরঘাটা পাঁচবাড়ি পৌঁছে দিতে গিয়েই পেয়ে যায় আমি আমার হৃদমাঝারের নাট্য স্পন্দনের সুর। ঘরের দাওয়াই দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি নাটকের সংলাপ। আমি ফিরে যায় আমার প্রথম যৌবনের সময়ে। বার বার চোখে ভেসে উঠছিল উত্তর ঢেমশা অভিযান ক্লাব আর ঢেমশা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে সাজানো নাট্য মঞ্চ।

সেই থেকে শুরু হল ‘পদক্ষেপ নাট্য অঙ্গন’র মহড়া কক্ষে আমার নিত্য যাতায়াত। যত বারই ভুল করেছি সংলাপ উচ্চারণ, ক্যাচিং সংলাপ, মঞ্চে স্টেপিং কিংবা আলোকপাতের নির্দেশনা; তত বারই তিনি শিখিয়ে দিতেন দারুণ মমতায়, শাসনে আর সোহাগে। কিন্তু বিধিবাম ২০০৫ সালে অনুশীলন সাংস্কৃতিক সংসদ’র বর্ষপূর্তী অনুষ্ঠানে আমার সাংগঠনিক শিক্ষক দীপংকর দেবনাথ দাদার অনুরোধে জেএমসেন মিলনায়তনে রম্য নাটক ‘মেম্বারের বিয়ে’ মঞ্চায়ন করার লগু অপরাদে পদক্ষেপ’র দল প্রধানের রোষানলের শিকার হন পদক্ষেপ’র একনিষ্ঠ নাট্য কর্মী লালন দাশ।

আকস্মিক এ মানসিক বিপর্যয়ে একেবারে ভেঙে পড়েন তিনি। মঞ্চ আর নাট্য বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকটাই নিজেকে গুটিয়ে চলতে শুরু করলেন। নাওয়া খাওয়া ভুলে নিকোটিনই যেন নিত্য সঙ্গী হল তার। পাশে দাঁড়ান আরেক নাট্যপ্রাণ স্বপ্নবাজ যুবক টুটুল গাঙ্গুলি দাদা ভাই। একটা ভরসার জায়গা তৈরি হল। যুক্ত হল আরেক সংগ্রামী নারী প্রীতিকণা শীল। প্রীতির ডাকে সাড়া দিলাম আমিও। শুরু হল মুক্ত চিন্তার মাল্য বুনন। একে একে যুক্ত হল পদক্ষেপ’র নাট্য কর্মীদের মধ্যে কয়েকজন। তাদের মধ্যে সুধাম দা, রাজীব চৌধুরী, রুবেল দাশ, পলাশ মল্লিক, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, উজ্জ্বল দেবনাথ দাদা অন্যতম।

তৎকালীন পত্র-পল্লবীতে ঘেরা ডিসি হিল চত্বরের সবুজ ঘাষের গন্ধ গায়ে মেখে শুরু হল আলাপন। প্রকৃতির বুকে প্রকৃতির কয়জন সন্তান বসে যখন শুনছিলাম আমার নাট্য শিক্ষার গুরু, আমার নাট্য পাঠশালা, বীর চট্টলায় থিয়েটার নাটকের বাতিঘর লালন দাশ দাদার সাথে পদক্ষেপ’র দল প্রধানের নির্মমতার কাহীনি। যিনি কিনা ১৯৮৬ সালের ২৬ মার্চ থেকে মঞ্চ নাটক তথা পদক্ষেপ নাট্য অঙ্গন’র সাথে কাজ করে আসছে ক্লান্তিহীনভাবে। শুধুমাত্র রম্য নাটক করার অপরাধে তাকে অপরাধী করে হিংসাত্মকভাবে দল থেকে বহিস্কার করা হল। এ এক বুকে ছাই চাপা কষ্ট, এ যেন নিজের কাজে নিজেই পরাজয়ের ভীতি। তাইতো সে দিন দাদার চোখের নোনা জলের ছোঁয়ায় যখন আত্মনাদ করে উঠছিল সবুজ দূর্বা ঘাস, স্তব্ধতায় নিরব হয়ে পড়েছিল সব পত্র-পল্লবী। আর ঠিক তখনই কষ্টের আগুনের মাঝে জ্বলে উঠা এক স্ফূলিঙ্গের মতই গর্জে উঠেছিলাম আমরা কয়জন।

দীপ্ত শপথে অনড় হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম জন্ম হবে নতুন নাট্য সংগঠনের। যে নাট্য দলের জন্মে এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে চট্টলায়। যারা শুধু বুকে ধারণ করবে বারুদ। নাটকের প্রতিটি সংলাপ হবে ফলার মত, দলের প্রতিটি সদস্য হবে ধনুকের তীরের মত, যাদের অভিষ্ট লক্ষ্যই হবে দলকে সাফল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাইলফলক। যাদের শপথ মন্ত্রই ছিল ‘আমরা কারো প্রতিদন্ধী নই, আমরাই আমাদের প্রতিদন্ধী।’ শেষ বিকেলের সূর্য্য তখন সন্ধ্যার উঠোনে রাত্রির অথিতি। আমাদের নাট্য শিক্ষকের চোখের নোনা জলে ধূয়ে নিলাম আমরা নোংরা সময়কে। দল গঠনের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলাম আমি আর প্রীতি। টুটুলদা আর সুধামদা থাকলেন মাথার উপর ছায়া হয়ে। বাকিরা সবাই আমাদের নব্য নাট্য যুদ্ধের সারথি।

বিদ্রোহী কবির ভাষায় বলতেই হয় ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, যাহা চির কল্যাণ কর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ সত্যি তাই প্রীতিসহ সিদ্ধান্ত নিলাম, যে করেই হোক, আজকের মধ্যেই গঠন করা হবে নতুন নাট্যদল। যেই কথা, সেই কাজ চেরাগী থেকে সোজা পায়ে হেঁটে আমি, লালন দা আর প্রীতি চলে এলাম আমার ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, রেল বিট সংলগ্ন বাসায়। কারো মাঝে কোন জড়তা নেই, নেই কোন সংকোচের বালায়ও। আমার মা আর বড় বোন; যার কথা না বললেই নয়, পাপিয়া ভদ্র। যিনি ওই রাতে আমাদের অসংখ্য বার চা তৈরি করে দিয়েছিলেন, তিনিও আগন্তুক দুইজন মানুষকে দেখে একটু অবাক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমি সব খোলাসা করার পর উনারাও খুব আনন্দিত হলেন।

নাওয়া খাওয়া ভুলে আমরা তিনজন বসে গেলাম বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধান খুলে। চলছে নামের পর নাম সংযোজন। কিন্তু কোন যেন নামই যুৎসই হচ্ছিল না। অবশেষে এল আরধ্য সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রায় ৩০০ নাম খাতায় লেখা হয়ে গেছে। হটাৎ লালন দাশ (দাদাভাই) চিৎকার করে বলে উঠলেন ‘স্লোগান।’ ব্যাস, জন্ম হল এক নবজাতকের, যাত্রা শুরু হল এক সদ্যজাত শিশু নাট্য দলের। পূর্বাকাশে তখন নতুন দিনের আলো হামাগুড়ি দেয়ার বৃথা চেষ্টায় রত। ঘড়ির কাঁটা তখন ২৫ জুলাইয়ের আঙ্গিনায়। সেই থেকে ২৫ জুলাই আমাদের আত্মায়। ২৫ জুলাই আমাদের ঐতিহ্যে। ২৫ জুলাই আমাদের অস্থি, মর্জা আর অস্তিত্বে।

ওই দিনই ‘জাগাও বিবেক, বাজুক প্রাণের স্পন্দন- এ শ্লোগানকে বুকে ধারণ করে আমাদের নাট্য শিক্ষক লালন দাশের হাত ধরে সৃজনে এল ‘থিয়েটার স্লোগান।’ কেননা আমাদের মননে নাট্য মন্দির’র যাত্রা শুরু ১৯৮৬ এ।
তাই আমরা যারা সে দিন প্রসব বেদনা সয়ে দলের নব মুখ দেখেছি, আমাদের কাছে দলের জন্ম সাল ১৯৮৬ হয়েই থাকবে আমৃত্যু! প্রকৃত সত্য হল, থিয়েটার স্লোগান গ্রুপ থিয়েটার চর্চা ও নাট্য আন্দোলনের যাত্রা শুরু করে ১৯৮৬ সালের ২৬ মার্চ।

২৬ জুলােই থিয়েটার স্লোগান নব জন্মের তারুণ্যের ১৭ তে রেখেছে পা। ১৯৮৬ থেকে ২০২১ এ দীর্ঘ পথ চলায় যে লোকটির হাত ধরে থিয়েটার স্লোগান এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলেছে নাট্য প্রাণ কিছু মানুষ তার একমাত্র স্বীকৃতির উত্তরাধিকারী হলেন, বীর চট্টলায় থিয়েটার নাটকের বরপুত্র লালন দাশ। আজ থিয়েটার স্লোগান নিজেই একটি নাট্যস্কুল। একটি পাঠশালা। বীর প্রসবিনী চট্টলার বুকে লালন দাশ আমরা যারা নবীন নাট্য কর্মী, তিনি তাদের বাতিঘর। কেননা, লালন দাশ একাধারে একজন নাট্যাভিনেতা, নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক, মেকাপ আটিস্ট, লাইট-সেট-কস্টিউম ডিজাইনার। গত প্রায় দুই দশকে তার শাসনে-সোহাগে তৈরি হয়েছে অসংখ্য নাট্য কর্মী, নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক। তার লেখনীতে উঠে এসেছে সমাজের বাস্তবতা, অসঙ্গতি, দেশজ প্রেম আর দেশ ও গণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি এ পর্যন্ত ২৫টি নাটক রচনা করেছেন। এছাড়াও নাট্যরুপ অনুবাদ আর মৌলিক নাটক মিলে এ সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়েছে বহু আগে। পাশাপাশি তিনি নাটক লিখেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্র, আর বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেলের জন্য।

ইতিমধ্যে তার পরিচালনায় মাতৃভাষা দিবস নিয়ে নাটক ‘ভাষা’ দেশ বিদেশের অগণিত দর্শক শ্রোতার প্রশংসা কুড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বিন্দু মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন ও চারুনন্দন ক্রাফট অ্যান্ড বুটিকস্ এর প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও দায়িত্ব পালন করছেন থিয়েটার স্লোগান’র মুখপত্র চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র নাট্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নাট্যাচল’র। পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত একমাত্র বিনোদন ভিত্তিক আইপি চ্যানেল ‘বিনোদন বাংলা’র” জন্য রচনা করছেন একগুচ্ছ জীবনমূখী নাটক ও টেলিফিল্ম।

থিয়েটার স্লোগান’র তারুণ্য দীপ্ত এ জন্মদিনে আমি এবং আমরা অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা জানায় তাদের, যাদের ঋণ শোধের নয়। যাদের ত্যাগ, সহযোগীতা ও পরামর্শ ছাড়া থিয়েটার স্লোগান’র আজকের এ পূর্ণতা অর্জন সম্ভব ছিল না কখনো- তার মধ্যে নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী, ম. সাইফুল আলম, এডভোকেট দীপক চৌধুরী, শেখ শওকত ইকবাল, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ঝুনা চৌধুরী, দপ্তর সম্পাদক খোরশেদুল আলম, সূচরিত চৌধুরী টিংকু ও শাহ্ তামরাজুল আলম ভাই অন্যতম।

তবে থিয়েটার স্লোগান পরিবার যার স্নেহের ঋণে আমৃত্যু ঋণী হয়ে থাকবে তিনি হলেন, চট্টল থিয়েটারের প্রাণপুরুষ শেখ শওকত ইকবাল ভাই। যিনি না হলে আমাদের থিয়েটার চর্চ্চা আতুর ঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই ঘুরপাক খেত। তিনি তার দলের মহড়া কক্ষ শর্তহীনভাবে ব্যাবহারের অনুমতি দিয়ে থিয়েটার স্লোগান পরিবারের নাট্যচর্চচাকে বেগবান করেছেন। শুধু তাই নয়, তার নিরংকুশ সমর্থন, সাহস আর আমাদের মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকার দীপ্ত অঙ্গীকার, আমাদের জুগিয়েছে বজ্র কঠিন স্পর্ধা। আজকের এ দিনে আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

এছাড়া আরো যাদের সার্বিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ না করলে আজ অকৃতজ্ঞতাবোধের লজ্জা আর তাদের কাছে ঋণী থেকে যাব, তারা হলেন- এডভোকেট জয়নুল আবেদিন (বর্তমান জেলা পিপি, বান্দরবান), কবি ও গীতিকার মহসিনুল ইসলাম ভুইঁয়া, ডাক্তার কমল কৃষ্ণ প্রামাণিক (সহযোগী অধ্যাপক ইএনটি চমেক), ডাক্তার সুরমান আলী, লায়ন শিবু প্রসাদ ভদ্র (ফাউন্ডার চেয়ারম্যান ও চীফ এডভাইজার, টিএনএস ফাউন্ডেশন) এবং বিউটিশিয়ান ও ফ্যাশন ডিজাইনার অনন্যা অর্পিতা।

পরিশেষে থিয়েটার স্লোগান’র অগ্রজ, অনুজ ও বন্ধু প্রতীম সব সদস্য আর সহকর্মীদের জানায় আমার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। সব নাট্যকর্মী সদস্য তথা শ্লোগান পরিবার’র সব অভিভাবক, পরামর্শক, দাতা, শুভাকাঙ্ক্ষী, দর্শক-শ্রোতাসহ সবার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, পেশাগত উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সফলতা কামনা করছি।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, থিয়েটার স্লোগান।

Share This Post

আরও পড়ুন