বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৩২ পূর্বাহ্ন

একজন মহসিন সিদ্দিক লুলু ও ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ ঘোষণার প্রেক্ষাপট

মোস্তফা কামাল যাত্রা
  • প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ জুলাই, ২০২১
  • ২৯১ Time View

মোস্তফা কামাল যাত্রা: মহসিন সিদ্দিক লুলু একজন মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি হয়েও আমৃত্যু মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের সেবা, সুরক্ষা, পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণসহ একটি স্বতন্ত্র ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবিতে অগ্রণী সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মহসিন সিদ্দিক লুলু মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তিনি একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগী হিসেবে বছরের প্রায় তিন মাস গুরুতর অসুস্থ থাকতেন। কারণ সিজোফ্রেনিয়া রোগটি রোগীভেদে বিভিন্ন মেয়াদে অসুস্থ ব্যক্তিকে চরমস্তরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রাখে। তবে যখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতেন, তখন তিনি মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পারিবারিক কাউন্সিলিং, সামাজিক সচেতনতা, সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগসহ জাতীয় একটি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আইন প্রণয়নের পক্ষে নির্লিপ্তভাবে কাজ করতেন।

১৯৭৪ সাল থেকে তার নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অনিয়মিতভাবে আয়োজন হত ‘জাতীয় পাগল সম্মেলন।’ আত্মসম্মান ও মর্যাদাহানিকর শব্দ হিসাবে ‘পাগল শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে বলে বর্তমান সময়ে পাগলের পরিবর্তে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি হিসাবে ব্যবহৃত হয় এবং সব ক্ষেত্রে শব্দটি এভাবে ব্যবহারের উপরে গুরচত্বারোপ করা হচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে একশন অন ডিজএ্যাবিলিটি এন্ড ডেভলপমেন্টের (অউউ) পরামর্শক্রমে মহাসিন সিদ্দিক লুলু ঐ পাগল সম্মেলনটি ‘মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের জাতীয় সম্মেলন’ শিরোনামে উদযাপন করেছিল।

২০০৬ সালে সর্বশেষ ‘জাতীয় মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের সম্মেলন-২০০৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই ঐ আয়োজনের প্রধান উদ্যোক্তা মহসিন সিদ্দিক লুলু মারা যান। প্রশ্ন হল কেন অউউ এর মত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্রয়াত মহাসিন সিদ্দক লুলুর সেই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়েছিল? কারণ মনোসামাজিক প্রতিবন্ধীতার প্রাথমিক স্তর হল- মানসিক সমস্যা বা মনোরোগ। যা চিকিৎসাহীনতায় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে মনেসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিতে পরিণত করে। মূলত এই সম্মেলনে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই অংশগ্রহণ করত বেশি। আয়োজনটিকে পদ্ধতিগতভাবে উদযাপন করা এবং সেই আয়োজনের অধিপরামর্শমূলক প্রভাব নীতিনির্ধারক মহলে ফেলার লক্ষেই অউউ তা করেছিল সচেতনভাবে। তাই অউউ প্রতিবন্ধীতা ইস্যুতে কর্মরত প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিল।

সম্মেলনের মূল প্রসঙ্গ মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটে এবং ইতিবচকভাবে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়। সম্মেলনে যোগদানকারী ব্যক্তিদের বক্তব্য, চাহিদা, দাবির সপক্ষে যৌক্তিকতা ও প্রয়োজন গুরচত্বসহকারে সব স্তরে আলোচিত হতে থাকে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে অউউ মহসিন সিদ্দিক লুলুর চিন্তা ও অভিপ্সাকে সুসংগঠিত করেছিল।

একজন মানসিক রোগী হয়েও মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণে মহাসিন সিদ্দিক লুলুর সেই প্রচেষ্টা; একটি দৃষ্টান্তমূলক কাজ হিসেবে আজ প্রতিবন্ধিতা ইস্যুতে কর্মরত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে স্বীকৃত। ১৯৭৪ সাল থেকে অনিয়মিতভাবে আয়োজিত আলোচ্য সম্মেলন থেকে মূলত: তার নেতৃত্বে তার সহযোদ্ধা অপর মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিরা যে আওয়াজ তুলতেন; তা ছিল তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের সপক্ষে। ১৯১২ সালের ‘লুনাসি অ্যাক্ট’ অনুসরণে শত বছর পরও আমাদের দেশে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা দেয়া হয়। প্রকৃত পক্ষে ব্রিটিশ অমলে প্রণীত এই আইনটিতে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের এমনভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বাস্তবতার নিরিখে অমর্যাদাকর ও অমানবিক। এই প্রচলিত আইন আসলে ব্যবহার হয় অপরাধীদের সুরক্ষার জন্য। লুনাটিক আখ্যা দিয়ে গুরুতর অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি এই আইনের সমর্থন নিয়ে ছাড়া পেতেন। যে আইনের মাধ্যমে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি সুরক্ষা তো দূরের কথা, কোন ধরনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্টীয় সেবা পেতেন না। বরঞ্চ মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি হিসেবে ব্যক্তিগত ও পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে হতেন বঞ্চিত।

মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ‘মহসিন সিদ্দিক লুলু’ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সেক্টরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একত্রীকরণ, তাদের সংগঠিতকরণ, তাদের সমস্যা তাদের কণ্ঠে সব সাধারণের মাঝে উপস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তাসহ গুরুত্ব তুলে ধরে যে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিলেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক পরও আমরা অনুসরণ করছি ১৯১২ সালে ‘লুনাসি অ্যাক্ট’। আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে প্রণীত হয়নি কোন ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার ও সুরক্ষা আইন”। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে নেই কোন জনসচেতনতা। তাই মানসিক স্বাস্থ্য খাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, নীতিনির্ধারল পর্যায়ে এই নিয়ে ভাবনা চিন্তা এবং আর্থিক বরাদ্দ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টিতে একটি ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ থাকা জরুরি। ঘোষিত সেই দিবসকে কেন্দ্র করে নীতিনির্ধারক মহল মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে নানা প্রসঙ্গ যখন আলোচনা করবেন, দিবসকে কেন্দ্র করে মানসিক ইস্যুতে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের গুরুত্ব ও প্রয়োজন সম্পর্কে তখন জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে, যাকে ঘিরে মানসিক স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গিঁতে গবেষণা হবে, এতে করে মানসিক স্বাস্থ্য প্রসঙ্গটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করবে।

দেশে অনেক জাতীয় দিবস আছে, যা ঘটা করে পালন করা হয়। তা করা প্রয়োজন নেই এমন নয়; কিন্তু জন গুরুত্বপূর্ণ তথা ক্রস কাটিং ইস্যু ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ বিষয়ক কোন জাতীয় দিবস নেই, নেই কোন পরিকল্পনা ও নীতিমালা, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুটি গুরুত্বসহকারে উপলব্ধি ও বাস্তবতার নিরিখে একটি গণমুখী ও সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নের সুযোগ ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে দ্রুত সরকারিভাবে একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ঘোষণা করা সময়ের দাবি। সেটি হতে পারে ২৩ জুলাই।

২০০৮ সালে প্রতিবন্ধীতা ইস্যুতে জাতীয় পর্যায়ে কর্মরত নেটওয়ার্কিং প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম’র পক্ষ থেকে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দেশে একটি ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ থাকার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপস্থাপন করে; ২৩ জুলাইকে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ঘোষণার স্বপক্ষে একটি অনুরোধপত্র দেয়া হয়েছিল। পাঠক ইতিমধ্যে উল্লেখিত আলোকপাতের মাধ্যামে আপনারা অবগত হয়েছেন ২০০৭ সাল ২৩ জুলাই ‘মহসিন সিদ্দিক লুলু’ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে লুলুর যে আন্তরিকতা ও অবদান- তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই সর্ব সম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম।’ প্রস্তাবিত তারিখে অর্থাৎ ২৩ জুলাই দেশব্যাপী কর্মরত ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম’র সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বেসরকারিভাবে ২০০৮ সাল থেকে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হচ্ছে। শুধুমাত্র দিবস উদযাপনই নয়; দিবসটিকে সরকারিভাবে পালন ও সরকারিভাবে জাতীয় দিবস হিসাবে ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন স্মারকলিপি প্রদান, মিডিয়া ক্যাম্পেইনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি প্রতি বছর পালিত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ইউনাইট ফর সোস্যাল একশন (উৎস), প্রতিবন্ধী জনসংগঠনের নেটওর্য়াক ‘এলায়েন্স অব আরবান ডিপিও’স ইন চিটাগাং (এইউডিসি)’ এবং মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে কর্মরত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক ‘মেন্টাল হেলথ এডভোকেসি এসোসিয়েশন (মা)’ এই দাবিতে অধিপরামর্শমূলক কাজ করে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, উন্নয়নকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মিদের পক্ষ থেকে ২৩ জুলাই ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ পালনের জন্য বিগত অর্ধ যুগ ধরে অধিপরামর্শমূলক কাজ ও কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আয়োজিত সে সব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে ২৩ জুলাইকে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ
করেছেন।

এ বছরও দেশব্যাপী ২৩ জুলাই বেসরকারিভাবে নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য দিবস’ পালন করা হচ্ছে। আমাদের বিনীত প্রত্যাশ্যা সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ আলোচ্য এই গণ দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালনের ঘোষণা দেবেন, আর তা হবে মহসিন সিদ্দিক লুলুর মৃত্যু দিবস ২৩ জুলাই।

লেখক: মোস্তফা কামাল যাত্রা, মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা আন্দোলনের সংগঠক

 

Share This Post

আরও পড়ুন