মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

ঊনপঞ্চাশ বাতাস: মৌলিক গল্পের প্রীতিপূর্ণ চলচ্চিত্র, প্রতিটি জায়গায় নান্দনিকতার উন্মেষ

নুরুন্নবী নুর
  • প্রকাশ : রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২০
  • ২১০ Time View

নুরুন্নবী নুর: ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস (Incomplete Breath)’ হচ্ছে মৌলিক গল্পের একটি প্রীতিপূর্ণ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের প্রকারভেদের জায়গা থেকে বললে আংশিক সাইন্স ফিকশন নির্ভর সিনেমাও বলা যায়। চলচ্চিত্রে, পরিচালক একজন মায়েস্ত্রোর ভূমিকায় ছিলেন, যা ঊনপঞ্চাশ বাতাসকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে গেছেন। চলচ্চিত্র তখনই কালজয়ী হয়, যখন পরিচালক নিজেই চলচ্চিত্রের নানা উপাদানে সমৃদ্ধ থাকেন এবং তাঁর অর্জিত চলচ্চিত্রের জ্ঞানকে তাঁর সৃষ্টিতে প্রয়োগ করতে পারেন।

বাংলা ভাষায় নির্মিত ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ মুক্তি পায় ২৩ অক্টোবর ২০২০ সালে। যার রীল টাইম (দৈর্ঘ্য) হচ্ছে ১৬৫ মিনিট।

ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু:
ভালোবাসা এমন একটি বিষয়, যা বলে কয়ে হয় না। ভালোবাসা হয়ে যায়। আপন মানুষ, আপন মানুষকে খুঁজে নেয়। ফর্মালিটি দিয়ে জীবন গড়া হয় না। জীবনই, তার প্রিয় মানুষকে লোকের ভীড় থেকে আলাদা করে নেয়। সহজে একবার কাউকে ভালো লেগে গেলে, আর পিছনে ফিরে আসা যায় না। মৃত্যু অব্দি মানুষ, সে প্রাণের মানুষটিকে খুঁজে বেড়ায়। সারাজীবন মানুষ তার প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণে। পেয়ে গেলে তো ভালো, হারালে শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়, নতুন করে কিছু হয় না।

ঊনপঞ্চাশ বাতাস চলচ্চিত্রের সার সংক্ষেপ: অয়ন নামের ছেলেটি একটি ওষুধ কোম্পানীর সেলসম্যানের চাকরি করে। আয়ের বেশিরভাগ উপার্জন গরীব অসহায় মানুষের জন্য ব্যয় করে ফেলেন। নিজের জন্যও রাখেন না। সবার কাছে, তার চেহারাটি বেশ পরিচিত। একজন সাংবাদিকও, তার মহত্বের বিষয়ে নিয়ে ম্যাগাজিন চাপায়। সে ধীরে ধীরে পরিচিত মুখ হয়ে দাঁড়ায়। এসব অয়নের কাছে কোন মানে তৈরি করে না। সে নিজেকে সাধারণ একটা ছেলেই ভাবে। ভীড়ের মধ্যে অয়নকে আবিষ্কার করে নীরা। নীরা, একটি ভালো সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। সবেমাত্র মেডিক্যালে পড়াশোনা শুরু করেছে। অয়নের সাথে নীরার প্রায়ই দেখা হয় রাস্তার ভীড়ে। বিষয়টা নীরা খুব উপভোগ করে। আস্তে আস্তে অয়নকে নীরার ভালো লাগে। অয়নও নীরাকে ভালোবাসতে শুরু করে। এভাবে তাদের প্রেম চলতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অয়ন একটা বড় রোগ বহন করছে, চিকিৎসা নেয়নি। রোগটা এমন পর্যায়ে চলে গেছে, সেরে উঠার মতোন না। নীরা, বিষয়টা কোনভাবে মানতে পারছে না। নীরা জায়গায় অন্য মেয়ে হলে অয়নকে ছেড়ে চলে যেত। উল্টা অয়ন, নীরার থেকে দূরে চলে যেতে চাইলে, যেতে পারে না। এক পর্যায়ে নীরা, অয়ন মারা যাবে জেনেও বিয়ে করে। নীরা, অনেক চেষ্টা করেও অয়নকে বাঁচাতে পারেনি। বিয়ের কিছুদিন পর অয়ন, সে বড়রোগ অর্থাৎ মরণব্যাধি ক্যান্সারে মারা যায়। নীরা, এখন পুরোদমে ডাক্তার। অয়নকে সে বৈজ্ঞানিক উপায়ে জীবিত করে তুলবেন। সে চেষ্টায় সফলও হয়েছেন, কিন্তু সেটা কাল্পনিক। শেষ পর্যন্ত নীরা কল্পনাকে বাস্তবতায় রূপান্তর করতে চাইলেও, সেটা হয়ে উঠেনি। নীরা উল্টো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।

সাবটাইটেল: ঊনপঞ্চাশ বাতাস একটি বাংলাদেশী ঘরনায় তৈরি সাব-টাইটেলহীন সিনেমা। বাংলাদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের মাথায় রেখে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে।

চিত্রগ্রহণ: চলচ্চিত্রটিকে অন্যান্য চলচ্চিত্রের সাথে তুলনা করলে চিত্রগ্রহণের কথা আগে উঠে আসবে। চিত্রগ্রাহক হৃদয় সরকার, চিত্রগ্রহণটাকে সর্বোচ্চ নান্দনিকতা জায়গায় নিয়ে গেছেন। ড্রোন শটের কথা আগে বলতে হবে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জনবহুল জায়গাকে ড্রোন শটে নিয়ে এসেছেন। ক্লোজ মিড ও লং শটে প্রতিটি দৃশ্য এমনভাবে তিনি এনেছেন, এখনও চোখে ভাসে সদরঘাটের পুরো দৃশ্য। চোখে ভাসে সাংবাদিক মাহমুদের সিগারেট জ্বালানোর দৃশ্য। চোখে ভাসে জনবহুল স্থানের কম্পোজিট শটগুলো। স্বপ্নের দৃশ্যও বেশ চমৎকার। অসম্ভব রকম ভীড়ের মধ্যে থেকে শট নেয়া কষ্টকর হলেও, চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রাহক ভিড়টাকে চলচ্চিত্রের অংশ করে তুলেছেন। তাছাড়া নীরার কিছু ক্লোজ শট আমাকে খুব টেনেছে। রোমান্টিক দৃশ্যগুলোকে বেশ ভালোভাবে ক্যামেরার ভাষা দিয়ে তুলে এনেছেন।

সম্পাদনা: ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ চলচ্চিত্রের সম্পাদনার জায়গাও বেশ পাকাপোক্ত। ঘটনার সাথে ঘটনা জুড়ে দিয়ে দৃশ্যরূপ তৈরি করে একটা গল্প বলার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতোন শুধু চেয়ে থাকলাম। সম্পাদনা নৈপূণ্যে দর্শকের মনে একটা বোধ তৈরি করিয়ে দিয়েছে। বোধহয় নিখুঁত ও স্পষ্ট ম্যাচুয়ুড চিত্রনাট্যের কারণে সম্পাদনাও ভালো হয়েছে। বলা যায় সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, পরিচালকের ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রদর্শন যোগ্য করে তোলেছেন ঊনপঞ্চাশ বাতাস।

নন্দনতত্ত্ব: চলচ্চিত্রের প্রতিটি জায়গায় নান্দনিকতার উন্মেষ ঘটিয়েছেন পরিচালক। নান্দনিক কাজ বাংলাদেশ খুব অল্প হয়। সিনেমা বানাতে হবে, এমন চিন্তা নিয়ে সিনেমা বানায় বেশিরভাগ পরিচালক। চিন্তা করেন না, সৌন্দর্যবোধের কথা। ভাবেন না, নান্দনিকতার বিষয়। একটা পরিবার নিয়ে চলচ্চিত্র দেখা যাবে কিনা, তেমন চিন্তা কেউ করেন না। কিন্তু ঊনপঞ্চাশ বাতাস একটা পারিবারিক সিনেমা। পরিবারের সকলকে নিয়ে দেখার মতোন সিনেমা।

চিত্রনাট্য: ঊনপঞ্চাশ বাতাস একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চিত্রনাট্য। স্পষ্ট ও নিখুঁত চিত্রনাট্যের কারণে চলচ্চিত্রটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। সুন্দর ও ধারাবাহিক চিত্রনাট্যের কারণে সম্পাদনার কাজটাও বেশ গোছালো মনে হয়েছে। পরিচালক নিজেই গল্প ও চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন। কথায় আছে, চলচ্চিত্র তখনই মানসম্মত ও রুচিশীল হয়, যখন সে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও পরিচালক করে থাকেন। ঊনপঞ্চাশ বাতাসের চিত্রনাট্য করেছেন পরিচালক নিজেই। সে জন্য চলচ্চিত্রটি সবকিছু ছাড়িয়ে ভালো মৌলিক গল্পের শিল্পসমম্মত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।…

আবহসংগীত: ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ একটি মৌলিক চলচ্চিত্র। মৌলিকতা তিনি চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি জায়গায় প্রকাশ করতে চেয়েছেন। অসাধারণ আবহসংগীতের সংমিশ্রণ, চলচ্চিত্রটিকে নিয়ে গেছে অন্যমাত্রায়। সংগীতেও বেশ মুন্সিয়ানা ভাব দেখিয়েছেন। চলচ্চিত্রের সবকটি গানই ভালো হয়েছে। পরিচালক একটি গানে (মেঘমালা) কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি, নিজে সংগীত পরিচালনাও করেছেন এবং ইমতিয়াজ বর্ষণ সুর দিয়ে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন। প্রত্যেকটি গান চলচ্চিত্রের মূলসুরকে উপস্থাপন করে। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের এটা একটা বড়গুণ। গানের সাথে চলচ্চিত্রের একটা যোগসূত্র থাকেই। চলচ্চিত্রের গানের মধ্যে রয়েছে ‘যেখানে’, ‘প্রথম’ ‘এ শহর’, ‘চিবুক’ মেঘমালা, গানগুলো বেশ শ্রুতিমধুর। গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছেন এপার বাংলার, ওপার বাংলার শিল্পীবৃন্দ। তন্মধ্যে সোমলতা আচার্য্য চৌধুরী, বাবা সুমন, শাওরিন, সিধু রায় ও মাসুদ হাসান উজ্জল।

সংলাপ: চলচ্চিত্রের সংলাপগুলো বেশ ভালো হয়েছে। সাহিত্যগুণে ভরপুর সংলাপ। উঁচু মানের চিত্রনাট্যে সংলাপও বেশ উঁচুদরের হতে হয়। কিছু সংলাপ মনের মধ্যে একদম গেঁথে গেছে। তন্মধ্যে- ‘আমি অর্ধেকটা দম নিই, বাকিটা একসাথে নিব বলে’ ‘সে কিন্তু নিজের জন্য বাঁচে না, একটা বিলিয়ে দেয়া জীবন তার’, ‘সমস্ত অসহায় রোগী আমার আত্মীয়’, ‘সবকিছু নিয়ে নিউজ করতে নেই’ ‘অর্ধেকটা দম নিয়ে, আমি দিনের পর দিন বসে থাকি, নিশ্বাস চুরি হয়ে গেছে, মাটির কাছে নামতে নামতে, বাতাসের কাছে উবে যায়, বাকি নিশ্বাসটুকু আমার প্রাণের কাছে আছে’ ‘আমি শুধু হাঁটি, কিন্তু কোথাও পৌছায় না’ এতো অল্প লোকের ভিতর কথা বলা যায় নাকি’ প্রভৃতি সংলাপ আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

অভিনয়: ভালো অভিনয় চলচ্চিত্রকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। ঊনপঞ্চাশ বাতাসের ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটেছে। ইমতিয়াজ বর্ষণ ‘অয়ন’ চরিত্রে ও শার্লিন ফারজানা ‘নীরা’ চরিত্রে, এতটুকু উদীয়মান চলচ্চিত্র অভিনেতা মনে হয়নি। পার্শ্বচরিত্রগুলোও বেশ সঙ্গ দিয়েছেন। প্রত্যেক অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতা সত্যি অসাধারণ। প্রত্যেকটি চরিত্র, তাঁদের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। অন্যান্য অভিনেতাদের মধ্যে ইলোরা গহর, মানস বন্দোপাধ্যায়, ইনামুল হক, ফারিহা শামস সেওতিদের নাম না বললে নয়। তাঁদের উচ্চমার্গের অভিনয় চলচ্চিত্রটিকে শিল্পের অন্যতম জায়গায় নিয়ে গেছে।

চলচ্চিত্রের পোশাক ও প্রপস্: চলচ্চিত্র প্রত্যেকের পোশাক পরিকল্পনাও বেশ ভালো হয়েছে। নীরার একটু আধুনিক ঘরানার চরিত্রের পরিধেয় পোশাক বেশ ভালো হয়েছে। তাছাড়া অয়ন চরিত্রের পোশাকও চরিত্রের সাথে অনেকটা যায়। সব মিলিয়ে পরিচালকের চলচ্চিত্র ভাবনা সফল হয়েছে। সেটা পোশাক থেকে শুরু করে চরিত্র নির্বাচন। প্রপসের ব্যবহারও বেশ অর্থবহ।

শট ডিভিশন: ঊনপঞ্চাশ বাতাসের শট ডিভিশনও দারুণ হয়েছে। সুন্দর সাবলীল শট ডিভিশন, একটি অর্থহীন মুহূর্তকেও অধিক প্রাঞ্জল করে তোলে। চলচ্চিত্র কিছু স্থানের দৃশ্যায়ন করা হয়েছে, ছোট ছোট শটে। অথচ সে দৃশ্য যখন লং শটে নেয়া হচ্ছে, তখন ভালো লাগেনি। আমার কাছে চলচ্চিত্রের লংশ শট, ড্রোন শট ও ক্লোজ শটগুলো বেশ নান্দনিক মনে হয়েছে।

শিল্প নির্দেশনা: ঊনপঞ্চাশ বাতাস চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনাও দেখার মতোন। পরিচালক নিজেই শিল্প নির্দেশনা করেছেন। চলচ্চিত্রের নামকরণে শিল্পগুণ রয়েছে। মূল বাগধারা ছিল উনপঞ্চাশ বায়ু, কিন্তু পরিচালক করলেন উনপঞ্চাশ বাতাস। এরূপ পরিবর্তনেরও ব্যাখ্যাও রয়েছে, পরিচালকের। তাছাড়া অয়নের থাকার ঘরটিও অসাধারণ শিল্প নির্দেশনার ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়াও চলচ্চিত্রের প্রায় সবকটি জায়গায় ভালো শিল্প নির্দেশনা স্বাক্ষর বহন করে।

রেড অক্টোবরের ব্যানারে তৈরি ও প্রযোজক আসিফ হানিফের প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমা ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’। ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ চলচ্চিত্রের পরিচালনা, কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য, শিল্প নির্দেশনা ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন মাসুদ হাসান উজ্জ্বল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য- গত ১২ই নভেম্বর ২০২০ সুগন্ধা সিনেমা হলে প্রথম শো ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ দেখেছিলাম। ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস ফিল্মের রিভিউ’টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতি। লেখায় অন্যের দ্বিমত থাকতে পারে। শুধু আমার দেখা অনুভূতি নিয়ে লেখাটি সাজিয়েছি। লেখার ভুল তথ্য আসলে, প্রযোজনার সংস্থার অনুরোধে পরিবর্তন হতে পারে।

১৪ নভেম্বর, রোববার ২০২০
হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

Share This Post

আরও পড়ুন